← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

দুর্গা পূজা ২০২৬ — মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী, তারিখ, ইতিহাস ও সম্পূর্ণ গাইড

🎉 উৎসব  ·  ৩০ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার

১৭ থেকে ২১ অক্টোবর ২০২৬ দুর্গা পূজা। আকালবোধনের পুরাণ থেকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি, ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীর সিঁদুরখেলা — বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের তারিখ, ইতিহাস, রীতিনীতি ও আগমন-গমন সহ সম্পূর্ণ গাইড।

কাশফুল ফুটেছে, আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ, ভোরে শিউলির গন্ধ — বাঙালির ক্যালেন্ডারে এর একটাই মানে: মা আসছেন। এ বছর মহাষষ্ঠী ১৭ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার — আর বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর, বুধবার। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রকাশ্য শিল্প-উৎসব, ইউনেস্কো-স্বীকৃত বাঙালির শারদোৎসবের সম্পূর্ণ গাইড রইল এখানে — তারিখ, পুরাণ, ইতিহাস, প্রতিটি দিনের আচার আর এবারের দেবীর আগমন-গমন।

এক নজরে দুর্গা পূজা ২০২৬

আকালবোধন — শরতের পুজোর পৌরাণিক কাহিনি

শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গার আদি পূজা ছিল বসন্তকালে — যা আজও 'বাসন্তী পূজা' নামে টিকে আছে। তবে বাঙালির শারদীয়া পুজোর শিকড় কৃত্তিবাসী রামায়ণের সেই অমর কাহিনিতে: লঙ্কা-অভিযানের আগে রাবণবধের শক্তি চেয়ে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দেবীর বোধন করলেন। কিন্তু শরৎ যে দেবতাদের 'রাত্রিকাল' — অসময়! তাই এই পুজোর নাম অকালবোধন। কথিত আছে, দেবীকে তুষ্ট করতে রাম ১০৮টি নীলপদ্ম জোগাড়ে নেমেছিলেন; একটি কম পড়ায় নিজের পদ্ম-আঁখি উৎপাটনে উদ্যত হতেই দেবী আবির্ভূত হয়ে বর দেন। সেই থেকে শরতের দুর্গাপূজাই বাঙালির মহোৎসব।

মার্কণ্ডেয় পুরাণের 'দেবীমাহাত্ম্যম্‌' বা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে আছে মূল আখ্যান — মহিষাসুরের অত্যাচারে বিপর্যস্ত দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা দশপ্রহরণধারিণী দুর্গা; নয় রাত্রির যুদ্ধ শেষে মহিষাসুর বধ। তাই দেবী 'মহিষাসুরমর্দিনী', আর তাঁর বিজয়ের দিনটিই বিজয়া দশমী।

রাজবাড়ি থেকে প্যান্ডেল — চারশো বছরের ইতিহাস

বাংলায় বড় আকারে দুর্গাপূজার প্রাচীন নজির হিসেবে ইতিহাস স্মরণ করে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের পুজোকে (আনুমানিক ষোড়শ শতক) — কথিত আছে, সেকালের হিসেবে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে তিনি করেছিলেন 'মহাযজ্ঞতুল্য' পুজো। কলকাতার অন্যতম প্রাচীন পুজো সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের বড়িশার আটচালার পুজো (১৬১০ থেকে প্রচলিত বলে পরিবারের দাবি)। ১৭৫৭-র পলাশির পরে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবকৃষ্ণ দেবের জাঁকজমকের পুজো ইতিহাসে বিখ্যাত — বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানের সেই যুগ আজও কলকাতার ঐতিহ্য।

গণ-পুজোর জন্ম আরেক কাহিনিতে: কথিত আছে, ১৭৯০ নাগাদ হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বনেদি পুজোয় ঢুকতে না পেরে বারোজন বন্ধু চাঁদা তুলে নিজেরাই পুজো করলেন — 'বারো-ইয়ারি' থেকে এল বারোয়ারি শব্দটা। বিশ শতকের গোড়ায় জাতীয়তাবাদী জাগরণের হাওয়ায় কলকাতায় শুরু হলো সর্বজনীন পুজো — বাগবাজার-সহ উত্তর কলকাতার পুজোগুলি হয়ে উঠল স্বদেশি চেতনারও মঞ্চ। আর একুশ শতকে থিমের বিপ্লব: শিল্পী-ভাস্করদের হাতে প্যান্ডেল হয়ে উঠেছে ইনস্টলেশন আর্ট। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' স্বীকৃতি দেয় — উৎসব থেকে বিশ্ব-ঐতিহ্য।

দিনে দিনে পুজো — ষষ্ঠী থেকে দশমী

মহাষষ্ঠী (১৭ অক্টোবর): সন্ধ্যায় বেলতলায় দেবীর বোধন — ঘুম ভাঙানোর আবাহন; আমন্ত্রণ ও অধিবাস। ঢাকে কাঠি পড়ে, মণ্ডপে মণ্ডপে আলো জ্বলে ওঠে — পুজো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু। ষষ্ঠীর দিনের সম্পূর্ণ পঞ্জিকা দেখুন

মহাসপ্তমী (১৮ অক্টোবর): ভোরে কলাগাছ-সহ ন'টি উদ্ভিদের নবপত্রিকা (লোকমুখে 'কলাবউ') স্নান করিয়ে মণ্ডপে আনা হয় — বাংলার কৃষিসভ্যতার প্রাচীন শস্যদেবী-পূজার স্মারক। এরপর প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও মহাস্নানে শুরু মূল পূজা।

মহাষ্টমী (১৯ অক্টোবর): পুজোর হৃদয়। সকালে লক্ষ কণ্ঠে পুষ্পাঞ্জলি, বহু মণ্ডপে কুমারী পূজা — ছোট্ট কন্যাকে দেবীজ্ঞানে অর্চনা; বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে যে ঐতিহ্যের সূচনা করেছিলেন, তা আজও অগণিত ভক্ত টানে। আর অষ্টমী-নবমীর মিলনক্ষণে সন্ধিপূজা — ঠিক ৪৮ মিনিটের মহালগ্নে ১০৮ প্রদীপ আর ১০৮ পদ্মে দেবী চামুণ্ডার অর্চনা; পুরাণমতে এই সন্ধিক্ষণেই দেবী বধ করেছিলেন চণ্ড-মুণ্ড অসুরকে।

মহানবমী (২০ অক্টোবর): মহাযজ্ঞ ও বলিদানের (আজ অধিকাংশ জায়গায় প্রতীকী — চালকুমড়ো, আখ) দিন; নবমী নিশি যেন না পোহায় — এই আকুতির মধ্যেই মিশে থাকে বিদায়ের সুর।

বিজয়া দশমী (২১ অক্টোবর): দর্পণ-বিসর্জনের পর মেয়েরা মেতে ওঠেন সিঁদুরখেলায় — দেবীকে মিষ্টিমুখ করিয়ে, সিঁথি-কপাল রাঙিয়ে বিদায়। তারপর 'আসছে বছর আবার হবে' ধ্বনিতে গঙ্গার ঘাটে বিসর্জন, কোলাকুলি, বিজয়ার প্রণাম আর নাড়ু-নিমকি। উত্তর ভারতে এই দিনই দশেরা — রাবণবধের উৎসব। দশমীর পঞ্জিকা দেখুন এখানে

আগমন-গমন ২০২৬ — গজে আসছেন মা

পঞ্জিকার প্রাচীন রীতি অনুযায়ী সপ্তমী ও দশমীর বারে নির্ধারিত হয় দেবীর আগমন-গমনের বাহন। ২০২৬-এ সপ্তমী রবিবার — তাই দেবীর আগমন গজে অর্থাৎ হাতিতে, যার ফল 'শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা' — সমৃদ্ধির শুভবার্তা। দশমী বুধবার — গমন নৌকায়, ফল শস্য ও জলবৃদ্ধি, তবে কোথাও কোথাও প্লাবনের ইঙ্গিতও ধরা হয়। গজে আগমন পঞ্জিকামতে সবচেয়ে শুভ বাহন-যোগ — ২০২৬-এর পুজো তাই শুরু হচ্ছে শুভ ইঙ্গিতেই!

পুজোর প্রস্তুতি-পঞ্জি — রথের রশি থেকে চক্ষুদান

দুর্গাপূজা পাঁচ দিনের উৎসব হলেও তার প্রস্তুতি চলে প্রায় চার মাস — এবং প্রতিটি ধাপের নিজস্ব তিথি আছে। সূচনা সেই রথযাত্রার দিনেকাঠামো পূজায়; কুমোরটুলি ও বনেদি বাড়িতে পুরোনো কাঠামোয় নতুন খড় বাঁধা শুরু। তারপর ধাপে ধাপে — খড়ের ওপর এঁটেল মাটির প্রথম প্রলেপ (একমেটে), দ্বিতীয় প্রলেপ (দোমেটে), খড়িমাটির সাদা আস্তরণ, রং, আর শেষে মহালয়ার দিন চক্ষুদান — দেবীর ত্রিনয়ন আঁকা; প্রথা মেনে বহু শিল্পী এই পর্বটি সারেন উপবাসে, একাগ্র ধ্যানে। জন্মাষ্টমীর দিন অনেক বনেদি বাড়িতে হয় কাঠামো পূজার নিজস্ব পর্ব, আর দেবীপক্ষ পড়তেই ঠাকুরদালানে চণ্ডীপাঠের সুর। বারোয়ারি পুজোর প্রস্তুতির আধুনিক পঞ্জিও সমান্তরালে চলে — খুঁটিপুজো (আজকাল রথের দিনেই সারা হয় অনেক ক্লাবে), থিম-শিল্পীর নকশা, মাসব্যাপী মণ্ডপ নির্মাণ। অর্থাৎ আষাঢ়ের রথের রশিতে যে টান পড়ে, আশ্বিনের ঢাকে তারই সমাপ্তি — বাঙালির উৎসব-বর্ষপঞ্জি আসলে একটাই দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প।

বনেদি বাড়ির পুজো — ঠাকুরদালানের ইতিহাস-সফর

থিমের ভিড়ে আজও কলকাতার আসল 'হেরিটেজ ওয়াক' বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে। শোভাবাজার রাজবাড়ির (১৭৫৭) নাটমন্দিরে দাঁড়ালে আজও শোনা যায় ইতিহাসের পদধ্বনি; সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বড়িশার আটচালায় চারশো বছরের ধারাবাহিকতা; জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ির প্রতিমার গয়না একসময় আসত প্যারিস থেকে — লোকমুখে 'বিলিতি সাজের পুজো'; রানি রাসমণির জানবাজার বাড়িতে দেবী আজও পূজিতা সেই দালানে, যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি; আর ভবানীপুরের মল্লিকবাড়ি থেকে হাওড়ার আন্দুল রাজবাড়ি — প্রতিটি দালানের নিজস্ব রীতি: কোথাও কুমারী পূজা, কোথাও কামানের তোপে সন্ধিপূজার সংকেত, কোথাও প্রতিমা বিসর্জনে নীলকণ্ঠ পাখির স্মারক। গ্রামবাংলার রাজবাড়িগুলিও কম নয় — কৃষ্ণনগর, শোভারামপুর, নাটোর-ঘরানার স্মৃতিবাহী পুজো ছড়িয়ে দুই বাংলায়। পুজো-পরিক্রমায় একটি দিন বনেদি বাড়ির জন্য রাখুন — আলোর রোশনাই নয়, পাবেন ধূপ-ধুনো আর ইতিহাসের গন্ধ।

থিমের বিপ্লব — শিল্পের মহাপ্রদর্শনী

নব্বইয়ের দশক থেকে কলকাতার পুজোয় ঘটে গেছে নিঃশব্দ শিল্পবিপ্লব — থিম পুজো। প্যারিসের ল্যুভর থেকে গ্রামের টেরাকোটা, পরিবেশ-সচেতনতা থেকে প্রান্তিক মানুষের জীবনকথা — প্রতিটি মণ্ডপ এক-একটি ইনস্টলেশন আর্ট; ভাস্কর-চিত্রকর-আলোকশিল্পী-সংগীতকারের যৌথ প্রযোজনা। সনাতন দিন্দা, ভবতোষ সুতার-সহ একঝাঁক শিল্পীর হাতে পুজো-শিল্প আজ আন্তর্জাতিক গ্যালারির আলোচ্য; 'পুজো পুরস্কারের' প্রতিযোগিতা (শারদ সম্মান-ঘরানা) মানোন্নয়নের ইঞ্জিন। অর্থনীতির হিসাবও বিস্ময়কর — ব্রিটিশ কাউন্সিলের সমীক্ষা (২০১৯) পশ্চিমবঙ্গের পুজো-অর্থনীতির আয়তন মেপেছিল প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকা — রাজ্যের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ; লক্ষ লক্ষ শিল্পী-শ্রমিক-ব্যবসায়ীর বার্ষিক জীবিকা এই এক উৎসবে। ইউনেস্কো-স্বীকৃতির পরে রেড রোডে বিসর্জনের কার্নিভাল যুক্ত করেছে আরও এক আন্তর্জাতিক মাত্রা — বিশ্বের পর্যটন-মানচিত্রে অক্টোবরের কলকাতা এখন 'ফেস্টিভ্যাল ডেস্টিনেশন'।

প্রবাসের পুজো — মহাদেশে মহাদেশে মণ্ডপ

বাঙালি যেখানে, দুর্গা সেখানে! লন্ডনের ক্যামডেন থেকে নিউ জার্সি, টরন্টো থেকে সিডনি, দুবাই থেকে টোকিও — বিশ্বজুড়ে কয়েকশো প্রবাসী পুজোর নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে: উইকএন্ড-সুবিধায় তিথি একটু এদিক-ওদিক, ফাইবারের প্রতিমা (কুমোরটুলি থেকেই জাহাজে যায়!), পোটলাক ভোগ, আর প্রজন্মান্তরের শিকড়-সন্ধান — বিদেশে জন্মানো খুদেরা মণ্ডপেই শেখে অঞ্জলির মন্ত্র আর ধুনুচি নাচ। ইউরোপের প্রাচীনতমগুলির একটি লন্ডনের পুজো (১৯৬০-এর দশক); আমেরিকায় শতাধিক; আর বাংলাদেশের ঢাকেশ্বরী থেকে শাঁখারীবাজার — ওপার বাংলার পুজোও সমান জমজমাট। দূরত্ব যত বাড়ে, উমার টান তত গাঢ় হয় — প্রবাসের পুজো তারই প্রমাণ।

পুজোর বাংলা — মণ্ডপের বাইরেও

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মাচার নয় — এ বাঙালির অর্থনীতি, শিল্প আর আবেগের বার্ষিক মহাযজ্ঞ। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী থেকে ঢাকি, শোলাশিল্পী থেকে আলোকশিল্পী, পুজোসংখ্যার লেখক থেকে ফুচকাওয়ালা — লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে এই পাঁচ দিনে। পুজোর ঠিক তিন দিন পরেই কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা (২৪ অক্টোবর), আর তার পরে কালী পূজা-দীপাবলি — উৎসবের রেশ চলে কার্তিক জুড়ে। মনে রাখবেন, রথযাত্রার দিনই কিন্তু কাঠামো পূজায় এই মহোৎসবের সূচনা হয়ে গিয়েছিল — বাঙালির উৎসব-চক্র এমনই অবিচ্ছিন্ন!

পুজোর শব্দকোষ — মণ্ডপে যাওয়ার আগে ঝালিয়ে নিন

পুজোর আচার-শব্দগুলির মানে জানা থাকলে মণ্ডপ-অভিজ্ঞতা বদলে যায় — ছোট্ট অভিধান রইল। বোধন — শরতে 'অসময়ে' দেবীকে জাগানোর আবাহন; ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলগাছের তলায়। অধিবাস — মঙ্গলদ্রব্য ছুঁইয়ে দেবীকে বরণের প্রস্তুতি-আচার। নবপত্রিকা — ন'টি উদ্ভিদের সমষ্টি-দেবী (লোকমুখে কলাবউ); সপ্তমীর ভোরে স্নান। চক্ষুদান — প্রতিমার চোখ আঁকার পর্ব, প্রথায় মহালয়ার দিনেসন্ধিপূজা — অষ্টমী-নবমীর ৪৮ মিনিটের মহাসন্ধিক্ষণ; ১০৮ প্রদীপ-পদ্ম। কুমারী পূজা — কুমারী কন্যাকে দেবীজ্ঞানে অর্চনা। ধুনুচি নাচ — জ্বলন্ত ধুনো-ভরা মাটির ধুনুচি হাতে আরতি-নৃত্য। চালচিত্র — প্রতিমার পিছনের অর্ধচন্দ্রাকার পটচিত্র। একচালা/দোচালা — গোটা পরিবার এক চালির নিচে, না পৃথক কাঠামোয়। ডাকের সাজ/শোলার সাজ — রাংতা বা শোলার অলংকরণ (বিস্তারিত অজানা তথ্যে)। দর্পণ-বিসর্জন — আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব জলে ডুবিয়ে প্রতীকী বিদায়; এরপরই সিঁদুরখেলা। অপরাজিতা পূজা — দশমীতে অপরাজিতা লতার পূজা, বিজয়ের প্রতীক। বিজয়া — বিসর্জনোত্তর প্রণাম-কোলাকুলি-মিষ্টিমুখের পর্ব; 'শুভ বিজয়া' শুভেচ্ছার উৎস। আগমনি — দেবীর আগমন-সংগীতের ধারা। সপ্তমী-পুজোর 'ঘট' — প্রাণপ্রতিষ্ঠার আধার; ঘটই আসল দেবী, প্রতিমা দৃশ্যরূপ — এই তত্ত্বটুকু জানলে পুরোহিতের ব্যস্ততার অর্থ পরিষ্কার হবে! শব্দগুলি পকেটে নিয়ে এবার প্যান্ডেলে ঢুকুন — ঢাকির বোল থেকে পুরোহিতের মন্ত্র, সবই তখন গল্প বলবে।

পরিক্রমা-পরিকল্পনা — উত্তর, দক্ষিণ না জেলার পুজো?

পুজো-পরিক্রমার কৌশল নিয়ে বাঙালির তর্ক চিরন্তন — উত্তর আগে না দক্ষিণ? অভিজ্ঞদের সূত্রগুলি টুকে রাখুন। উত্তর কলকাতা মানে ঐতিহ্যের স্বাদ — বাগবাজার সর্বজনীনের সাবেক একচালা প্রতিমা, কুমোরটুলি পার্ক, আহিরীটোলা, শোভাবাজার-হাতিবাগান বেল্ট, সঙ্গে বনেদি বাড়ির দালান — হাঁটা-পথে ঘন সন্নিবেশ বলে এক সন্ধ্যায় অনেকগুলি কভার করা যায়; সেরা সময় চতুর্থী-পঞ্চমীর 'সফট লঞ্চ' পর্ব। দক্ষিণ কলকাতা থিম-শিল্পের রাজধানী — দেশপ্রিয় পার্ক, ত্রিধারা, বালিগঞ্জ কালচারাল, সুরুচি সংঘ, চেতলা অগ্রণী, নাকতলা উদয়ন — বিশাল আয়োজন, তবে দূরত্ব বেশি ও ভিড় ম্যারাথন-মাপের; মেট্রোই পরিত্রাতা (পুজোয় রাতভর বিশেষ পরিষেবা)। সল্টলেক-নিউটাউনের পুজোয় গাড়ি-বান্ধব প্রশস্তি, শ্রীভূমির জনসুনামি এড়াতে ভোরবেলা দর্শনের ওস্তাদি টোটকা! আর জেলার রত্নগুলি ভুললে চলবে না — চন্দননগরের আলো তো জগদ্ধাত্রীতে, কিন্তু দুর্গাপূজায় বারাসত-মধ্যমগ্রাম, চুঁচুড়া-শ্রীরামপুর, কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি-পুজো, বহরমপুর — প্রতিটির নিজস্ব চরিত্র। পরিক্রমার প্রযুক্তি-সহায়ও এখন মজবুত — পুজো-ম্যাপ অ্যাপ, ভিড়-মিটার, ভার্চুয়াল দর্শন; তবু প্রবীণদের পরামর্শই সেরা: আরামের জুতো, হালকা ব্যাগ, সঙ্গে জল — আর অষ্টমীর রাতে ভিআইপি রোডমুখো না হওয়ার প্রাচীন প্রবাদ! খাওয়া-পর্বও পরিক্রমার অর্ধেক আনন্দ — প্যান্ডেল-লাগোয়া ভোগের খিচুড়ি থেকে রাত তিনটের রোল-চাউমিন; পুজোর কলকাতায় ক্যালোরি গোনা বারণ, এ শহরের অলিখিত সংবিধান!

সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

দুর্গা পূজা ২০২৬ কবে?

২০২৬ সালে মহাষষ্ঠী ১৭ অক্টোবর (শনিবার), মহাসপ্তমী ১৮ অক্টোবর, মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর, মহানবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর (বুধবার)।

মহাষ্টমী ২০২৬ কবে?

মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার — এই দিনে পুষ্পাঞ্জলি, কুমারী পূজা এবং অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

২০২৬ সালে দেবীর আগমন ও গমন কীসে?

পঞ্জিকামতে ২০২৬-এ দেবীর আগমন গজে (হাতিতে) — ফল শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা; গমন নৌকায় — ফল শস্যবৃদ্ধি ও জলবৃদ্ধি।

অকালবোধন কী?

শরৎকাল দেবতাদের নিদ্রার সময় বলে এ সময়ের পূজাকে 'অকাল' বোধন বলে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুযায়ী রাবণবধের আগে শ্রীরামচন্দ্র শরতে দেবী দুর্গার বোধন করেছিলেন — সেই থেকেই বাঙালির শারদীয়া দুর্গোৎসব।

দুর্গা পূজা কবে ইউনেস্কো স্বীকৃতি পায়?

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো 'কলকাতার দুর্গাপূজা'কে মানবতার ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে — ভারতের প্রথম উৎসব হিসেবে।


প্রতি বছরের পুজোর তারিখ পাবেন দুর্গা পূজার পাতায়। পড়ুন মহালয়া ২০২৬দুর্গা পূজার অজানা তথ্যআশ্বিনকার্তিক মাসের ক্যালেন্ডার দেখুন এখানে।

প্রচ্ছদ ছবি: Pramanikshreya, উইকিমিডিয়া কমন্স — CC BY-SA 4.0

সম্পর্কিত পাতা

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার