← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

দুর্গা পূজার অজানা তথ্য — নিষিদ্ধপল্লির মাটি থেকে ডাকের সাজ, ১২টি চমকে দেওয়া কাহিনি

💡 অজানা তথ্য  ·  ২৯ জুন ২০২৬, সোমবার

কলাবউ কি সত্যিই গণেশের বউ? প্রতিমার মাটিতে কেন লাগে নিষিদ্ধপল্লির মাটি? 'ডাকের সাজ' নামের রহস্য কী? দুর্গা পূজার এমন ১২টি অজানা তথ্য ও লুকোনো ইতিহাস, যা পুজোপ্রেমীদেরও চমকে দেবে।

দুর্গা পূজা নিয়ে বাঙালি সব জানে — এমনটাই তো মনে হয়, তাই না? অথচ এই চারশো বছরের উৎসবের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন সব কাহিনি, যা শুনলে পুজোমণ্ডপের চেনা ছবিটাই বদলে যায়। কলাবউয়ের আসল পরিচয় থেকে জার্মানি-ফেরত রাংতার সাজ, নিষিদ্ধপল্লির মাটির রহস্য থেকে অসুরের পুজো — দুর্গা পূজা ২০২৬-এর আগে জেনে নিন উৎসবের ১২টি অজানা অধ্যায়। এ বছর পুজো ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী থেকে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী।

১. 'কলাবউ' মোটেই গণেশের বউ নয়

সপ্তমীর ভোরে লালপেড়ে শাড়ি জড়ানো যে কলাগাছটি স্নান করিয়ে গণেশের পাশে বসানো হয়, লোকমুখে তার নাম 'কলাবউ' — অনেকে ভাবেন তিনি গণেশের স্ত্রী! আসলে ইনি নবপত্রিকা — কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান — ন'টি উদ্ভিদের সমষ্টি, যা দেবীরই ন'টি রূপের প্রতীক। পণ্ডিতদের মতে এ হলো বাংলার প্রাচীন কৃষি-সভ্যতার শস্যদেবী পূজার স্মারক, যা পরে দুর্গাপূজায় মিশে গেছে। গণেশের পাশে স্থান পাওয়াটা নিছক মণ্ডপসজ্জার রীতি — সম্পর্কটা 'প্রতিবেশীর', দাম্পত্যের নয়!

২. প্রতিমার মাটিতে নিষিদ্ধপল্লির মাটি

প্রথা অনুযায়ী দুর্গা প্রতিমা গড়তে লাগে গঙ্গামাটি, গোময়, গোমূত্র — আর 'পুণ্যমাটি': নিষিদ্ধপল্লির দরজার মাটি। কুমোরটুলির শিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই রীতি মেনে আসছেন। ব্যাখ্যা নানা রকম — কেউ বলেন, যে সমাজ এই নারীদের ব্রাত্য করে রাখে, দেবী গড়ার মাটিতে তাঁদের অংশীদারি সেই সমাজেরই প্রায়শ্চিত্ত; কেউ বলেন পুরুষ তাঁর পুণ্য দোরগোড়ায় ফেলে আসে বলে সেই মাটি পুণ্যভূমি। যে ব্যাখ্যাই মানুন — মাতৃমূর্তির মধ্যে সমাজের সবচেয়ে উপেক্ষিতাদের ছোঁয়া রেখে দেওয়ার এই দর্শন দুর্গাপূজাকে করেছে সত্যিকারের সর্বজনীন।

৩. 'ডাকের সাজ' এসেছিল ডাকযোগে

প্রতিমার রুপোলি-সাদা জরির যে ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ, তার নাম 'ডাকের সাজ' কেন জানেন? উনিশ শতকে এই সাজের রাংতা ও জরি আসত জার্মানি থেকে, ডাকযোগে — 'ডাকে আসা সাজ' থেকেই ডাকের সাজ! পরে কৃষ্ণনগর-সহ বাংলার শিল্পীরাই এই শিল্প আয়ত্ত করেন। আজও বনেদি বাড়ির একচালা প্রতিমায় ডাকের সাজের আভিজাত্যই আলাদা।

৪. একচালা ভাঙলেন যিনি

সাবেক রীতিতে দুর্গা-লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ সবাই থাকতেন একটিই চালচিত্রের নিচে — একচালা প্রতিমা, যা যৌথ পরিবারের প্রতীক। বিশ শতকের গোড়ায় শিল্পী গোপেশ্বর পাল প্রথাভাঙা আলাদা মূর্তির যুগ আনেন — দেবীর পাঁচ সন্তান-সহ পৃথক চালার সেই বিপ্লবই আজকের থিম-শিল্পের পূর্বপুরুষ। আর প্রতিমার পিছনের অর্ধগোলাকার পটচিত্র — চালচিত্র — নিজেই বাংলার এক লুপ্তপ্রায় লোকশিল্প, যাতে আঁকা থাকে শিব-পার্বতী থেকে দশাবতারের কাহিনি।

৫. কুমোরটুলি এসেছিল কৃষ্ণনগর থেকে

কলকাতার প্রতিমাশিল্পের রাজধানী কুমোরটুলির শিকড় নদিয়ার কৃষ্ণনগরে — অষ্টাদশ শতকে গঙ্গা বেয়ে কাজের খোঁজে আসা কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরাই সুতানুটির কুমোরপাড়ায় থিতু হন। আজ সেই গলিতে তিনশোরও বেশি স্টুডিও; কুমোরটুলির প্রতিমা পাড়ি দেয় আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া — প্রবাসের পুজোর 'ফাইবারের দুর্গা'ও গড়া হয় এখানেই, বিমানে চড়ার উপযোগী হালকা ছাঁচে!

৬. ক্লাইভের সেলাম আর 'কোম্পানির পুজো'

পলাশির যুদ্ধজয়ের পরে ১৭৫৭-তেই শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবকৃষ্ণ দেব আয়োজন করলেন মহাসমারোহের দুর্গাপূজা — ইতিহাস বলে, সেখানে স্বয়ং রবার্ট ক্লাইভ এসেছিলেন এবং যুদ্ধজয়ের 'ধন্যবাদ' জানাতে দেবীকে অর্ঘ্যও পাঠান। ঠাকুরদালানে নাচঘর, বাঈনাচ, ইংরেজ অতিথি — সে যুগের 'কোম্পানি পুজো'র সেই জৌলুস নিয়ে আজ বিতর্ক যেমন আছে, তেমনি এও সত্যি যে ওই পর্বেই কলকাতার পুজো পেয়েছিল মহানাগরিক চরিত্র।

৭. বারোজন 'ইয়ারের' বারোয়ারি

বনেদি দালানের পুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল সীমিত। কথিত আছে, ১৭৯০ নাগাদ হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ক্ষুব্ধ বারোজন বন্ধু (ইয়ার) চাঁদা তুলে শুরু করলেন নিজেদের পুজো — 'বারো-ইয়ারি' থেকে জন্ম নিল 'বারোয়ারি' শব্দ ও ধারণা, যা আজ বাংলা অভিধানেরই অংশ। আর বিশ শতকের শুরুতে কলকাতার সর্বজনীন পুজোগুলি হয়ে উঠল স্বদেশি আন্দোলনের আখড়া — পুজোমণ্ডপে চলত লাঠিখেলা, দেশাত্মবোধক গান, বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক!

৮. দেবীর দশ অস্ত্র কার কার দান?

দশপ্রহরণধারিণীর প্রতিটি অস্ত্র এক-একজন দেবতার দান — শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, বরুণের শঙ্খ ও পাশ, অগ্নির শক্তি-বর্শা, পবনের ধনুর্বাণ, ইন্দ্রের বজ্র, যমের দণ্ড, বিশ্বকর্মার কুঠার ও অভেদ্য বর্ম, হিমালয়ের সিংহ-বাহন, আর কুবেরের অমৃতপাত্র। অর্থাৎ দুর্গা আসলে সমগ্র দেবশক্তির সম্মিলিত রূপ — একার লড়াই নয়, ঐক্যের জয়গাথা। সন্তানসম্ভারও প্রতীকী: লক্ষ্মী (ধন), সরস্বতী (বিদ্যা), কার্তিক (শক্তি), গণেশ (সিদ্ধি) — জীবনের চার পুরুষার্থ যেন মায়ের চারপাশে।

৯. যেখানে মহিষাসুরের পুজো হয়

চমকে যাবেন — ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের সীমানাজুড়ে বসবাসকারী অসুর জনজাতি দুর্গাপূজার দিনগুলিতে শোক পালন করেন; তাঁদের বিশ্বাসে মহিষাসুর ('হুদুড় দুর্গা') তাঁদের পূর্বপুরুষ-বীর। পুরুলিয়া-সহ নানা অঞ্চলে আদিবাসী সমাজের একাংশে দশমীতে 'দাসাই নাচের' শোকগাথা গাওয়া হয়। এক দেশ, এক উৎসব — অথচ কত বিপরীত আবেগের সহাবস্থান; এটাই ভারতের সাংস্কৃতিক বহুস্তর।

১০. সন্ধিপূজার ৪৮ মিনিট ও ১০৮ পদ্ম

অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট আর নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট — এই ৪৮ মিনিটের মহাসন্ধিক্ষণে হয় সন্ধিপূজা, যখন দেবী ধারণ করেন চামুণ্ডা রূপ। লাগে ১০৮টি প্রদীপ ও ১০৮টি নীলপদ্ম — রামচন্দ্রের অকালবোধনের সেই পদ্মেরই স্মৃতি। বহু রাজবাড়িতে সন্ধিক্ষণ ঘোষিত হতো কামান বা বন্দুকের তোপ দেগে — কোথাও কোথাও সে ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।

১১. দশমীর নীলকণ্ঠ পাখি

বনেদি বাড়ির বিসর্জনের এক মরমি প্রথা ছিল নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো — বিশ্বাস, শিবের প্রতিনিধি এই পাখি কৈলাসে আগে পৌঁছে খবর দেবে, উমা রওনা হয়েছেন। বন্যপ্রাণ আইনে পাখি ধরা নিষিদ্ধ হওয়ায় আজ ওড়ে মাটির বা কাগজের নীলকণ্ঠ — প্রথা বদলেছে, আবেগ বদলায়নি। আর বিসর্জনের পর কাঠামো জল থেকে তুলে পরের বছরের প্রতিমার ভিত গড়া হয় — মাটি গঙ্গায় মেশে, গঙ্গামাটিই ফেরে মণ্ডপে; দুর্গাপূজা আদতে 'রিসাইক্লিং'-এরও উৎসব!

১২. পুজোসংখ্যা — শারদীয়ার সাহিত্য-উৎসব

পৃথিবীর আর কোনো উৎসবে বোধহয় সাহিত্যের এমন মহাযজ্ঞ হয় না — পুজোসংখ্যা। শতবর্ষ পেরোনো এই ঐতিহ্যে শরতে প্রকাশিত হয় শত শত পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা; ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কাকাবাবুর মতো কালজয়ী চরিত্রদের বহু অভিযানের আত্মপ্রকাশ পুজোসংখ্যার পাতাতেই। মণ্ডপের ভিড়ের পাশে বালিশের পাশে পুজোসংখ্যা — বাঙালির শারদোৎসব মন আর মননের যুগলবন্দি।

১৩. সিঁদুরখেলার জন্মকথা

দশমীর সিঁদুরখেলা আজ দুর্গাপূজার সবচেয়ে ফটোজেনিক মুহূর্ত — অথচ এর ইতিহাস নিয়ে ধোঁয়াশা কম নয়। লোকপ্রচলিত মত, প্রায় দুশো-আড়াইশো বছর আগে বনেদি বাড়ির অন্দরমহল থেকে প্রথার শুরু — দেবীবরণের অধিকার ছিল সধবাদের, আর বরণ শেষে পরস্পরের সিঁথি রাঙিয়ে তাঁরা কামনা করতেন স্বামী-সংসারের মঙ্গল। সমাজতাত্ত্বিকেরা এতে দেখেন অন্দরমহলের নারীদের বছরে একদিনের নিজস্ব উৎসব-পরিসর — যেদিন ঠাকুরদালান শুধুই তাঁদের। আজ সিঁদুরখেলার গণ্ডি অনেক প্রসারিত — বহু মণ্ডপে বিধবা, রূপান্তরকামী, প্রান্তিক নারীদের সিঁদুরখেলায় স্বাগত জানানো হচ্ছে; প্রথার গণতন্ত্রায়ণও বাংলার পুজোরই চরিত্র।

১৪. ঢাক-ঢুনুচির শব্দ-স্থাপত্য

দুর্গাপূজার 'সাউন্ডট্র্যাক' ঢাক — আর ঢাকিরা বাংলার এক আস্ত শিল্পীগোষ্ঠী। মূলত দুই ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বর্ধমানের গ্রাম থেকে পুজোর মরসুমে হাজার হাজার ঢাকি পরিবার শহরে আসেন — শিয়ালদহ-হাওড়া স্টেশনে ষষ্ঠীর আগের 'ঢাকি হাট' নিজেই এক দ্রষ্টব্য; কমিটিগুলি সেখান থেকেই বায়না করে নিয়ে যায় দল। কাঁসর-ঘণ্টা-শাঁখ-ঢাকের সঙ্গে ধুনুচি নাচের যুগলবন্দি — ধোঁয়া আর তালের সেই সম্মোহন আরতিকে নিয়ে যায় পারফরম্যান্স-শিল্পের স্তরে। জানেন কি, ঢাকের বোল-ও 'ভাষা' — বোধনের বোল, আরতির বোল, বিসর্জনের করুণ বোল আলাদা; অভিজ্ঞ কান শুনেই বলে দেয় মণ্ডপে এখন কোন পর্ব চলছে!

১৫. কুমারী পূজা — দেবীত্বের সবচেয়ে মানবিক রূপ

অষ্টমীতে এক ছোট্ট কন্যাকে দেবীজ্ঞানে পূজা — তত্ত্বটি তন্ত্র-পুরাণে প্রাচীন, কিন্তু বাংলায় এর আধুনিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা স্বামী বিবেকানন্দের হাতে: ১৯০১ সালে বেলুড় মঠের পুজোয় তিনি নয়জন কুমারীর পূজা করেন — স্বামীজির জীবনকথায় সেই অধ্যায় পড়ুন। শাস্ত্রে এক থেকে ষোলো বছরের কন্যার বয়সভেদে আলাদা নাম — সন্ধ্যা, সরস্বতী, ত্রিধামূর্তি, কালিকা, সুভগা, উমা…; পূজার দর্শনটি গভীর — প্রতিটি কন্যাশিশুর মধ্যেই মাতৃশক্তির বীজ, নারীকে দেবী বলার আগে মানুষ বলে সম্মান করো। বেলুড় মঠের কুমারী পূজা দেখতে আজ লক্ষ ভক্তের ভিড় জমে; বহু বনেদি বাড়ি ও বারোয়ারিতেও প্রথা চালু।

১৬. বিসর্জন থেকে কার্নিভাল — গঙ্গাবক্ষের শেষ অধ্যায়

দশমীর বিসর্জনও কম নাটকীয় নয়। সাবেক নিয়মে প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে হয় দর্পণ-বিসর্জন — আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব জলে ডুবিয়ে প্রতীকী বিদায়; কারণ মৃন্ময়ী গেলেও চিন্ময়ী থেকে যান। বাবুঘাট-নিমতলা-বাজেকদমতলায় ক্রেন আর মানুষের কাঁধে চলে শোভাযাত্রার স্রোত; পরিবেশ-বিধি মেনে আজ প্রতিমার কাঠামো দ্রুত তুলে ফেলা হয়, ফুল-মালা যায় আলাদা ভাসানকুণ্ডে। ২০১৬ থেকে যুক্ত হয়েছে রেড রোডের পুজো কার্নিভাল — বাছাই সেরা প্রতিমার আলো-ঝলমল প্যারেড, বিদেশি অতিথি-পর্যটকে ঠাসা গ্যালারি; ইউনেস্কো-স্বীকৃতির উদ্‌যাপনে যা এখন কলকাতার বার্ষিক 'সিগনেচার ইভেন্ট'। বিসর্জনের পরের আচারটিও মধুর — বাড়ি ফিরে গুরুজনকে প্রণাম, ছোটদের কোলাকুলি, আর শত্রুতা ভুলে 'বিজয়া করা'; সঙ্গে নাড়ু-ঘুগনি-নিমকি। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও 'শুভ বিজয়া' মেসেজের নিচে সেই আদি বাংলার মিষ্টিমুখই হাসে।

১৭. পুরোনো কলকাতার 'পুজো পত্রিকা' ও ভাসান-গান

উনিশ শতকের কলকাতায় বিসর্জনের শোভাযাত্রায় গাওয়া হতো 'ভাসানের গান' — আগমনি-বিজয়ার সুরে বিদায়ের করুণ রস; হুতোম প্যাঁচার নকশায় সে যুগের পুজোর জীবন্ত বর্ণনা মেলে — বাবুদের বাঈজি-নাচ, সং, আতশবাজির সেই কলকাতা! আর বিশ শতকে জন্ম নিল আরেক অমর ঐতিহ্য — পুজোর গান: শারদ-অর্ঘ্য হিসেবে প্রকাশিত বেসিক রেকর্ড; হেমন্ত-সন্ধ্যা-মান্না-লতার কণ্ঠে পুজোর গানের সেই স্বর্ণযুগ (পঞ্চাশ-সত্তর দশক) বাংলা আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলির জন্মভূমি। পুজো মানে তাই নতুন জামার সঙ্গে 'নতুন গান'-ও ছিল; আজকের প্লে-লিস্ট প্রজন্ম সেই উত্তরাধিকারই বহন করছে — মাধ্যম বদলেছে, মেজাজ নয়।

১৮. শোলার সাজ — জলফুলের ভাস্কর্য

ডাকের সাজের পাশে বাংলার নিজস্ব আরেক প্রতিমা-অলংকরণ শোলার সাজ — জলাভূমির শোলা গাছের ধবধবে সাদা মজ্জা কেটে মালাকার শিল্পীদের হাতে তৈরি মুকুট, চাঁদমালা, কদম ফুল। মালাকারদের কুলকথায় স্বয়ং শিবের বিয়ের মুকুটের জন্যই বিধাতা জলে ভাসালেন শোলা আর সৃষ্টি হলো মালাকার শিল্পীর! বর্ধমানের বনকাপাসি, নদিয়া-মুর্শিদাবাদের শোলাশিল্পীদের কাজ আজ প্যারিসের প্রদর্শনী পর্যন্ত পৌঁছেছে; সাবেকিয়ানার পুজোয় 'শোলার সাজের প্রতিমা' আজও আভিজাত্যের শেষ কথা। প্লাস্টিক-থার্মোকলের যুগে জলাভূমি কমায় শোলার জোগান-সংকট এই শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ — প্রতিমার সাজ বাঁচাতে হলে বাঁচাতে হবে বিলও; দুর্গাপূজার পরিবেশ-পাঠ এখানেও।

১৯. পুজোর অর্থনীতি — এক উৎসবে এক রাজ্যের জীবিকা

সংখ্যার চোখে দুর্গাপূজা দেখলে চমকে উঠতে হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিল-আইআইটি খড়্গপুরের সমীক্ষা (২০১৯) পশ্চিমবঙ্গের পুজো-কেন্দ্রিক সৃজনশীল অর্থনীতির আয়তন মেপেছিল প্রায় ৩২,৭৭৭ কোটি টাকা — রাজ্য জিডিপির প্রায় ২.৫৮% — একটি ধর্মীয় উৎসবের এমন বিজ্ঞানসম্মত 'অডিট' পৃথিবীতেই প্রথম! এর শিকড় ছড়িয়ে দশ-বারোটি শিল্পে — প্রতিমা ও মণ্ডপশিল্প, আলো, ঢাক, ফুল (দশমীর পদ্মের দাম শুনলে মাথা ঘোরে — সন্ধিপূজার ১০৮ পদ্মের বাজার এক বিশাল সরবরাহ-শৃঙ্খল!), পুরোহিত্য, ভোগের বাজার, নতুন জামাকাপড়ের খুচরো-বিস্ফোরণ, বিজ্ঞাপন-মিডিয়া, পুজোসংখ্যা-প্রকাশনা, পরিবহণ-পর্যটন। কুমোরটুলি একাই বছরে কয়েকশো প্রতিমা রপ্তানি করে বিদেশে; আর 'পুজোর বোনাস' — বাংলার শ্রম-অর্থনীতির এই প্রতিষ্ঠানটিও উৎসব-অর্থনীতিরই ফসল। ইউনেস্কো-স্বীকৃতির নথিতেও এই জীবিকা-জালের কথা বিশেষ উল্লেখিত — দুর্গাপূজা 'জীবন্ত ঐতিহ্য', কারণ সে লক্ষ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে।

২০. মেয়ে-পুরোহিতের মণ্ডপ — প্রথার নবীনতম অধ্যায়

ইতিহাস গড়া থেমে নেই — ২০২১ সালে কলকাতার ৬৬ পল্লির পুজোয় নন্দিনী ভৌমিকের নেতৃত্বে চার নারী-পুরোহিতের দল দুর্গাপূজা সম্পন্ন করে নজির গড়েন; সংস্কৃত-শাস্ত্রে শিক্ষিত এই দলের মন্ত্রপাঠ-ব্যাখ্যায় মুগ্ধ হয়েছিল গোটা রাজ্য, পরের বছরগুলিতে আরও মণ্ডপে ছড়িয়েছে ধারা। মাতৃশক্তির পূজায় নারীর পৌরোহিত্য — যুক্তির দিক থেকে এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কী হয়! সঙ্গে জুড়ুন ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের নিজস্ব পুজো, থিমে প্রান্তিক জীবনের উদ্‌যাপন, প্রবীণ-আবাসিকদের মণ্ডপ-দর্শনের বিশেষ ব্যবস্থা — চারশো বছরের উৎসবটি প্রতি দশকে নিজেকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে। 'সর্বজনীন' শব্দটির অর্থ ক্রমেই আক্ষরিক হয়ে উঠছে — এটিই হয়তো দুর্গাপূজার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অজানা তথ্য!

সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

কলাবউ আসলে কী?

কলাবউ আসলে নবপত্রিকা — কলা-সহ ন'টি উদ্ভিদের সমষ্টি, যা দেবী দুর্গার ন'টি রূপের প্রতীক। এটি গণেশের স্ত্রী নয়; বাংলার প্রাচীন শস্যদেবী পূজার স্মারক হিসেবে সপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকা স্নান হয়।

দুর্গা প্রতিমায় নিষিদ্ধপল্লির মাটি কেন লাগে?

প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী প্রতিমার মাটিতে গঙ্গামাটির সঙ্গে নিষিদ্ধপল্লির দ্বারের 'পুণ্যমাটি' মেশানো হয় — সমাজের প্রান্তিক নারীদের দেবীগড়ায় অংশীদার করার এই রীতিকে সর্বজনীনতার প্রতীক বলে মানা হয়।

ডাকের সাজ কাকে বলে?

প্রতিমার রুপোলি রাংতা-জরির ঐতিহ্যবাহী অলংকরণকে ডাকের সাজ বলে। উনিশ শতকে এই সাজের উপকরণ জার্মানি থেকে ডাকযোগে আসত বলেই এমন নাম।

সন্ধিপূজা কখন হয়?

মহাষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও মহানবমীর প্রথম ২৪ মিনিট — মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা হয়; ১০৮ প্রদীপ ও ১০৮ পদ্মে দেবী চামুণ্ডার আরাধনা করা হয়। ২০২৬-এ মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর।

বারোয়ারি পুজো কথাটা কোথা থেকে এল?

কথিত আছে, আনুমানিক ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু (ইয়ার) মিলে চাঁদার পুজো শুরু করেন — সেই 'বারো-ইয়ারি' থেকেই 'বারোয়ারি' শব্দের জন্ম।


পুজোর সম্পূর্ণ সূচি ও ইতিহাস পড়ুন দুর্গা পূজা ২০২৬ গাইডে, আর মহালয়ার কাহিনি এখানে। প্রতিদিনের তিথি দেখুন পঞ্জিকা পাতায়

প্রচ্ছদ ছবি: Bernard Gagnon, উইকিমিডিয়া কমন্স — CC BY-SA 3.0

সম্পর্কিত পাতা

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার