← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

জগদ্ধাত্রী পূজা ২০২৬ — চন্দননগরের আলো, কৃষ্ণনগরের ইতিহাস ও দেবীর অজানা কাহিনি

🎉 উৎসব  ·  ২৬ জুন ২০২৬, শুক্রবার

১৯ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার জগদ্ধাত্রী পূজা। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কারাবাস থেকে জন্ম নেওয়া পূজা, চন্দননগরের বিশ্বখ্যাত আলোকসজ্জা আর হাতির উপরে সিংহবাহিনী দেবীর রহস্য — সম্পূর্ণ ইতিহাস ও অজানা তথ্য।

দুর্গা ফিরে গেছেন কৈলাসে, কালীর প্রদীপও নিভেছে — বাঙালির মন খারাপ হওয়ার ঠিক আগেই হুগলির গঙ্গাপাড়ে জ্বলে ওঠে আরেক আলোর সমুদ্র। জগদ্ধাত্রী পূজা — হেমন্তের দেবী, জগৎকে ধারণ করেন যিনি। এ বছর পূজা ১৯ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার (৩ অগ্রহায়ণ ১৪৩৩) — কার্তিক শুক্লা নবমীতে; আর চন্দননগরে উৎসব চলবে ষষ্ঠী থেকে দশমী, টানা পাঁচ দিন।

দুর্গাপূজায় যেমন কলকাতা, কালী পূজায় বারাসত — জগদ্ধাত্রীতে তেমনি চন্দননগর আর কৃষ্ণনগর। কিন্তু এই পূজার জন্মকাহিনিটিই এক ঐতিহাসিক নাটক — যার কেন্দ্রে নদিয়ার রাজা, নবাবের কারাগার, আর এক স্বপ্নাদেশ। সম্পূর্ণ কাহিনি রইল।

এক নজরে জগদ্ধাত্রী পূজা ২০২৬

রাজার কারাবাস থেকে দেবীর আবির্ভাব

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। বাংলার মসনদ টালমাটাল, আর নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় নবাবের রোষে বন্দি। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, কর বকেয়ার অভিযোগে নবাব তাঁকে আটক করেন; মুক্তি যখন মিলল, গঙ্গাবক্ষে বজরায় ফিরতে ফিরতে রাজা শুনলেন বিসর্জনের বাজনা — বুঝলেন, সে বছরের মতো দুর্গাপূজা শেষ, মায়ের মুখ দর্শনও হলো না। শোকার্ত রাজা সেই রাতেই স্বপ্ন দেখলেন — রক্তবর্ণা, চতুর্ভুজা, সিংহবাহিনী এক দেবী বলছেন: কার্তিক শুক্লা নবমীতে আমার পূজা করো, দুর্গাপূজারই ফল পাবে। সেই আদেশে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে শুরু হলো জগদ্ধাত্রী পূজা — এক দিনেই ষষ্ঠী থেকে নবমীর সম্পূর্ণ আরাধনা।

ঐতিহাসিকেরা কাহিনির খুঁটিনাটি নিয়ে তর্ক করেন — কোন নবাব, কোন সাল (মতভেদে ১৭৫০-এর দশক), কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক নেই যে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির হাত ধরেই বাংলায় এই পূজার প্রসার। কৃষ্ণচন্দ্রের সভাপণ্ডিতদের হাতে শাক্ত ঐতিহ্যের এই নবরূপায়ণ ঘটে — উপনিষদের 'জগদ্ধাত্রী' (জগতের ধাত্রী বা ধারণকর্ত্রী) নামটি পেল মূর্তি, মন্ত্র, পূজাপদ্ধতি।

চন্দননগর — আলোর তীর্থ

কৃষ্ণনগরে জন্ম হলেও জগদ্ধাত্রীর মহোৎসব-রূপ চন্দননগরের দান। কথিত আছে, কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ, ফরাসডাঙার (চন্দননগর) দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর হাত ধরে অষ্টাদশ শতকেই গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে পৌঁছয় এই পূজা। ফরাসি উপনিবেশের সেই শহরে জগদ্ধাত্রী ক্রমে হয়ে উঠলেন ঘরের মেয়ে — আজ চন্দননগর-ভদ্রেশ্বরে দেড়শোরও বেশি বারোয়ারি পূজা, যার বহুগুলির বয়স দুশো ছুঁইছুঁই।

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীর তিন বিশ্বখ্যাত বৈশিষ্ট্য — প্রতিমার উচ্চতা (কোথাও কোথাও ২০-২৫ ফুট!), সাবেক সোলা ও দশাবতারী সাজ, আর সর্বোপরি আলোকসজ্জা। চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের খ্যাতি আন্তর্জাতিক — টুনি বাল্বের নিখুঁত বিন্যাসে চলমান ছবি ফুটিয়ে তোলার এই শিল্প দুর্গাপূজা-সহ দেশের তাবৎ বড় উৎসবের আলো জোগায়; কথিত আছে, বিদেশের উৎসবেও পাড়ি দিয়েছে এই আলো। আর দশমীর রাতে আলোয় মোড়া লরিতে শতাধিক প্রতিমার যে শোভাযাত্রা বেরোয়, তা দেখতে গঙ্গার দু'পাড়ে জমে লক্ষ লক্ষ মানুষ — অনেকে একে তুলনা করেন রিওর কার্নিভালের সঙ্গে!

কৃষ্ণনগরের 'বুড়িমা' ও ঘেটুতলার ঐতিহ্য

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রীর মুকুটমণি চাষাপাড়ার 'বুড়িমা' — আড়াইশো বছরের প্রাচীন এই পূজার প্রতিমার গায়ে ওঠে কয়েক কেজি সোনার গয়না; বিশ্বাস, বুড়িমার কাছে মানত করলে খালি হাতে ফিরতে হয় না। রাজবাড়ির পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আরেক ঐতিহ্য — নবমীর দিন রাজবাড়ি থেকে বেরোনো 'মেম-সাহেব' ঢাকের বাদ্যি। আর কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মৃৎশিল্পীদের হাতে গড়া প্রতিমার সূক্ষ্মতা তো কিংবদন্তি — এই সেই ঘূর্ণি, যেখান থেকে কুমোরটুলির শিল্পীদের পূর্বপুরুষরাও গিয়েছিলেন।

দেবী জগদ্ধাত্রী — রূপ ও দর্শন

জগদ্ধাত্রীর মূর্তিতত্ত্ব গভীর অর্থবহ। দেবী রক্তবর্ণা — উদীয়মান সূর্যের রং; চতুর্ভুজা — শঙ্খ, চক্র, ধনুক, বাণ; সিংহবাহিনী — আর সিংহের পদতলে হাতির মাথা (করীন্দ্রাসুর)। পুরাণকথায়, দেবতারা মহিষাসুর-বিজয়ের পর অহংকারে মত্ত হলে ব্রহ্মশক্তি এক তৃণখণ্ড রাখলেন — অগ্নি পোড়াতে পারল না, বায়ু ওড়াতে পারল না; দেবতাদের দর্প চূর্ণ করে আবির্ভূতা হলেন জগদ্ধাত্রী। হস্তী এখানে দর্পের প্রতীক ('করী' = হাতি) — অহংকার দমন করেই যিনি জগৎ ধারণ করেন, তিনিই জগদ্ধাত্রী। শ্রীরামকৃষ্ণ এই তত্ত্ব ভালোবাসতেন — বলতেন, মন-মাতঙ্গকে বশ করাই জগদ্ধাত্রীর পূজা। উল্লেখ্য, তাঁর জীবনেও এই পূজার বিশেষ স্থান ছিল — সহধর্মিণী মা সারদার জন্মভিটে জয়রামবাটীতে জগদ্ধাত্রী পূজা আজও মহাসমারোহে হয়।

চন্দননগরের আলো — টুনি বাল্বের শিল্পবিপ্লব

চন্দননগরের আলোকশিল্পের ইতিহাস নিজেই এক নিবন্ধের দাবিদার। বিদ্যুৎ-পূর্ব যুগে উৎসবের রাত সাজত ডে-লাইট, হ্যাজাক আর মাটির প্রদীপে; পঞ্চাশ-ষাটের দশকে চন্দননগরের শিল্পীরা ছোট রঙিন টুনি বাল্বকে করে তুললেন তুলি — কাঠের ফ্রেমে হাজারো বাল্বের বিন্যাসে ফুটল ময়ূর, ফোয়ারা, শকুন্তলার কাহিনি! এই ঘরানার কিংবদন্তি পুরুষ শ্রীধর দাস — যাঁর হাতে আলো পেল 'চলমানতা': সিকোয়েন্সার সার্কিটে বাল্ব জ্বলা-নেভার ছন্দে সাইকেল চলে, ফুল ফোটে, মহাকাশচারী হাঁটেন চাঁদে! ফরাসডাঙার আলো পাড়ি দিয়েছে দিল্লির প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে বিদেশের উৎসবে; কলকাতার দুর্গাপূজার সিংহভাগ আলোকসজ্জার ঠিকানাও এই শহর। এলইডি-চিন-আমদানির চ্যালেঞ্জ সামলেও প্রায় হাজারখানেক পরিবারের জীবিকা আজও এই শিল্পে — জগদ্ধাত্রী পূজা তাঁদের বার্ষিক 'ফাইনাল পরীক্ষা', যেখানে প্রতিটি বারোয়ারি কমিটির ব্রিফ একটাই: গতবারের চেয়ে নতুন কিছু!

কীভাবে ঘুরবেন — চন্দননগর দর্শনের গাইড

জগদ্ধাত্রীর চন্দননগর ঘুরতে চাইলে ছোট্ট পরিকল্পনা কাজে দেবে। হাওড়া থেকে মেন লাইনের ট্রেনে চন্দননগর বা মানকুণ্ডু স্টেশন — পূজার দিনগুলিতে পূর্ব রেল বাড়তি লোকাল চালায়; সড়কপথে দিল্লি রোড বা জিটি রোড। দর্শন-পরিকল্পনায় দুটি ভাগ মনে রাখুন — মানকুণ্ডু-চন্দননগর স্টেশন-লাগোয়া অঞ্চলের বড় বাজেটের আলো-প্যান্ডেল, আর স্ট্র্যান্ড-লাগোয়া পুরোনো ফরাসি পাড়ায় ঐতিহ্যের পূজাগুলি; সন্ধ্যার জনজোয়ারের আগে দুপুর-বিকেলে হাঁটা শুরু করলে বেশি মণ্ডপ দেখা যায়। অবশ্য-দ্রষ্টব্য গঙ্গাপাড়ের স্ট্র্যান্ড — ফরাসি স্থাপত্যের সারি, দুপ্লে মিউজিয়াম (ফরাসি ইনস্টিটিউট), পাতাল-বাড়ি, আর আলোয় ভাসা ঘাট; সঙ্গে চন্দননগরের নিজস্ব মিষ্টি-তীর্থ — জলভরা তালশাঁস সন্দেশ (সূর্য মোদকের কিংবদন্তি) না খেয়ে ফেরা প্রায় অপরাধ! নবমীর রাতে ভিড় চরমে ওঠে; পরিবার নিয়ে গেলে সপ্তমী-অষ্টমী তুলনায় স্বস্তির। আর দশমীর রাতের শোভাযাত্রার রুট আগে থেকে জেনে স্ট্র্যান্ড বা জিটি রোডের ধারে জায়গা নিন — আলোর ট্যাবলোর সেই মিছিল জীবনে একবার দেখার মতো; ফেরার শেষ ট্রেনের সময়টুকু শুধু খেয়াল রাখবেন!

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি — যেখানে ইতিহাস আজও পূজা পায়

জগদ্ধাত্রীর জন্মভূমি কৃষ্ণনগরের অভিজ্ঞতা আবার সম্পূর্ণ অন্য স্বাদের। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়িতে আজও বংশধরেরা সাবেক নিয়মে পূজা করেন — রাজবেশে সজ্জিতা দেবী, ঐতিহ্যের বেত-বাঁশের কাঠামো, আর নবমীতে সেই বিখ্যাত রীতি: রাজবাড়ির সিংহদুয়ার পেরিয়ে মায়ের সামনে 'রাজরাজেশ্বরী' বন্দনা। শহরজুড়ে চষে বেড়ালে মিলবে ঘূর্ণির মৃৎশিল্পীপাড়া — যেখানকার মাটির পুতুল ইউরোপের প্রদর্শনীতে গেছে উনিশ শতকেই; কৃষ্ণনগরের সরভাজা-সরপুরিয়াও সমান ঐতিহাসিক! চাষাপাড়ার বুড়িমার নবমী-দর্শনের লাইন ভোররাত থেকে; বিসর্জনের দিন 'সাং'-এ (কাঁধে বাঁকে প্রতিমা বহন) জলঙ্গির ঘাটে যাওয়ার দৃশ্য কৃষ্ণনগরের নিজস্ব গর্ব — ক্রেন নয়, আজও মানুষের কাঁধই মায়ের বাহন। ইতিহাসপ্রেমীরা মনে রাখবেন — এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভাতেই ছিলেন ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ('অন্নদামঙ্গল') আর গোপাল ভাঁড়! রাজসভার সেই রসবোধ আর শিল্পমনস্কতাই যেন আজও শহরটির উৎসবে বেঁচে আছে।

অজানা তথ্য — জগদ্ধাত্রী নিয়ে যা কম জানা

পূজাপদ্ধতি ও উৎসব-সূচি — এক দিনে তিন পূজার রহস্য

জগদ্ধাত্রী পূজার আচার-কাঠামোটিও কৌতূহলোদ্দীপক। শাস্ত্রীয় মূল বিধান কার্তিক শুক্লা নবমীর এক দিনেই সপ্তমী-অষ্টমী-নবমীর পূজা — ভোরে সপ্তমীবিধি, মধ্যাহ্নে অষ্টমী, অপরাহ্ণে নবমী; কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি-সহ সাবেক পূজাগুলি আজও এই 'এক দিনের দুর্গাপূজা' রীতিই মানে — সঙ্গে হোম, চণ্ডীপাঠ, কুমারী পূজার আয়োজনও থাকে কোথাও কোথাও। দেবীর ভোগেও আভিজাত্য — খিচুড়ি-পোলাও, শাকভাজা থেকে লেডিকেনি; কৃষ্ণনগরের পূজায় রাজবাড়ির ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। চন্দননগর অবশ্য উৎসবকে প্রসারিত করেছে দুর্গাপূজার আদলে ষষ্ঠী থেকে দশমী — পাঁচ দিনের মহাপার্বণে; ২০২৬-এ সেই সূচি মোটামুটি ১৬ নভেম্বর (ষষ্ঠী) থেকে ২০ নভেম্বর (দশমীর শোভাযাত্রা) — মূল নবমী ১৯ নভেম্বর। আচারের আরেক বিশেষত্ব সন্ধ্যারতির জাঁক — চন্দননগরের মণ্ডপে ধুনুচি-আরতির সঙ্গে ঢাক-সানাইয়ের যুগলবন্দি দেখতেই ভিড় জমে; আর দশমীতে দেবীবরণ ও সিঁদুরখেলার পরে সেই বিখ্যাত আলোক-শোভাযাত্রা। প্রসাদ-সংস্কৃতিতেও অঞ্চলের স্বাক্ষর — ভোগের খিচুড়ির পাশাপাশি চন্দননগরের জলভরা, কৃষ্ণনগরের সরভাজা মিষ্টিমুখের অলিখিত নিয়ম! যাঁরা বাড়িতে সংক্ষিপ্ত পূজা করতে চান — ঘটস্থাপন, দেবীর ধ্যানমন্ত্র, পুষ্পাঞ্জলি ও আরতিতেই মূল বিধি সারা যায়; দিনক্ষণ-তিথির নিখুঁত হিসাব পাবেন পঞ্জিকা পাতায়, আর শুভ সময় মুহূর্ত ক্যালকুলেটরে। মনে রাখবেন — জগদ্ধাত্রীর মন্ত্র-ধ্যানে দেবী 'করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী' — অহংরূপী হস্তীর দমনকারিণী; পূজার দর্শনটুকু হৃদয়ে রাখলে আড়ম্বর ছোট হোক বড়, ফল সমান!

ফরাসডাঙার গল্প — যে উপনিবেশ উৎসবকে দিল অন্য মেজাজ

জগদ্ধাত্রী পূজার চন্দননগর-চরিত্র বুঝতে হলে শহরটির অনন্য ইতিহাস জানা চাই — কারণ এ শহর ব্রিটিশ ভারতের ভিতরে ছিল এক টুকরো ফ্রান্স! ১৬৭৩ নাগাদ ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স্থাপন থেকে শুরু; অষ্টাদশ শতকে গভর্নর দুপ্লের আমলে ফরাসডাঙা বাণিজ্যে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বী — গঙ্গার ঘাটে ভিড়ত ইউরোপের জাহাজ। পলাশি-পরবর্তী যুগে ব্রিটিশের ছায়ায় ম্লান হলেও শহরটি ফরাসি শাসনেই রয়ে গেল প্রায় পৌনে তিনশো বছর — ১৯৫০ সালে গণভোটে ভারতভুক্তি (পন্ডিচেরির চার বছর আগে!); ব্রিটিশ ভারতের রেলগাড়ি শহরের বুক চিরে গেলেও স্টেশনের গায়েই শুরু হতো 'বিদেশ'! এই দ্বৈত পরিচয়ের মধুর ফলগুলি আজও শহরের গর্ব — স্ট্র্যান্ডের ফরাসি স্থাপত্য, সেক্রেড হার্ট গির্জা, ফরাসি নামফলকের রাস্তা, দুপ্লে কলেজের (বর্তমান কানাইলাল বিদ্যামন্দিরের পূর্বসূরি-ভবন) স্মৃতি, আর নাগরিক আত্মপরিচয়ে এক ধরনের স্বতন্ত্র 'ফরাসডাঙা-গরিমা'। মজার কথা — ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়ও ছিল এই ফরাসি ছিটমহল; কানাইলাল দত্তের মতো অগ্নিযুগের শহিদ এ শহরেরই সন্তান, আর ব্রিটিশ পুলিশের তাড়া খাওয়া বহু বিপ্লবী গঙ্গা পেরিয়ে ফরাসি এলাকায় গা-ঢাকা দিতেন! ইতিহাসবিদদের মতে, উপনিবেশের এই ভিন্ন মেজাজই চন্দননগরের উৎসব-সংস্কৃতিতে দিয়েছে আলাদা নান্দনিকতা — আলোকসজ্জার শিল্পে ফরাসি 'সোঁ-এ-লুমিয়ের' ঐতিহ্যের দূর-প্রতিধ্বনি শোনেন কেউ কেউ; জগদ্ধাত্রীর শোভাযাত্রার কার্নিভাল-মেজাজেও ইউরোপীয় প্যারেডের ছোঁয়া খোঁজা যায়। সত্য-মিথ যা-ই হোক — গঙ্গাপাড়ের এই ছোট্ট শহর প্রমাণ, সংস্কৃতির মিশ্রণে উৎসব শুধু সমৃদ্ধই হয়; জগদ্ধাত্রীর আলো তাই একই সঙ্গে খাঁটি বাঙালি আর একটু ফরাসিও!

সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

জগদ্ধাত্রী পূজা ২০২৬ কবে?

২০২৬ সালে জগদ্ধাত্রী পূজার মূল নবমী তিথি ১৯ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার (৩ অগ্রহায়ণ ১৪৩৩)। চন্দননগরে উৎসব চলবে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত।

জগদ্ধাত্রী পূজা কোথায় সবচেয়ে বিখ্যাত?

হুগলির চন্দননগর ও ভদ্রেশ্বর — বিশাল প্রতিমা, ঐতিহ্যবাহী সাজ ও বিশ্বখ্যাত আলোকসজ্জার জন্য; এবং নদিয়ার কৃষ্ণনগর — রাজবাড়ির পূজা ও চাষাপাড়ার 'বুড়িমা'র জন্য।

জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন কে করেন?

প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে স্বপ্নাদেশ পেয়ে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে এই পূজার সূচনা করেন; তাঁর দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর মাধ্যমে পূজা ছড়ায় চন্দননগরে।

দেবী জগদ্ধাত্রীর বাহনের নিচে হাতি কেন?

হাতি (করীন্দ্রাসুর) দর্প বা অহংকারের প্রতীক — দেবতাদের অহংকার চূর্ণ করে আবির্ভূতা দেবীর সিংহ সেই দর্পকে দমন করে আছে; অর্থাৎ অহং-জয়ই জগদ্ধাত্রী-তত্ত্বের মর্মকথা।

চন্দননগরের শোভাযাত্রা কবে হয়?

দশমীর রাতে — আলোয় সাজানো শতাধিক লরিতে প্রতিমা নিয়ে রাতভর শোভাযাত্রার পর গঙ্গায় বিসর্জন; ২০২৬-এ এই শোভাযাত্রা হবে নভেম্বরের ২০ তারিখ নাগাদ।


প্রতি বছরের তারিখ দেখুন জগদ্ধাত্রী পূজার পাতায়। পড়ুন কালী পূজা ২০২৬নবান্ন উৎসবের কাহিনিঅগ্রহায়ণ মাসের ক্যালেন্ডার এখানে

প্রচ্ছদ ছবি: Sourabh.biswas003, উইকিমিডিয়া কমন্স — CC BY-SA 4.0

সম্পর্কিত পাতা

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার