🏛️ ইতিহাস · ১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার
পূর্ব বর্ধমানের কালনায় ভাগীরথীর তীরে দুই বৃত্তে সাজানো ১০৮টি শিব মন্দির — বাংলার পোড়ামাটির স্থাপত্যের এক বিরল বিস্ময়। উনিশ শতকের গোড়ায় বর্ধমান রাজবংশের হাতে গড়ে ওঠা এই "নবকৈলাস"-এর ইতিহাস, স্থাপত্যরহস্য ও ভ্রমণ-তথ্য।
পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা শহরে, ভাগীরথী নদীর তীরে দাঁড়ালে চোখে পড়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য — মাটির রঙের শতাধিক চূড়া সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, যেন একসঙ্গে শতাধিক মন্দির কথা বলছে আকাশের সঙ্গে। এই দৃশ্যই বাংলার স্থাপত্য-ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময় — ১০৮টি শিব মন্দিরের সুবিন্যস্ত বৃত্ত, স্থানীয়ভাবে যা পরিচিত নবকৈলাস নামে। কৈলাস যেহেতু শিবের আবাস, একসঙ্গে এত শিবলিঙ্গের সমাহার এলাকাটিকে যেন এক নতুন কৈলাসেই পরিণত করেছে।
কলকাতা থেকে মাত্র ৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও কালনার এই মন্দির-বিস্ময় আজও বাংলার অনেক মানুষের কাছেই অপরিচিত। অথচ স্থাপত্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় প্রতীকতত্ত্ব — তিন দিক থেকেই এই মন্দির-সমষ্টি ভারতের অন্যতম অনন্য নিদর্শন।
কালনা শহর (স্থানীয়ভাবে অম্বিকা কালনা নামেও পরিচিত) পূর্ব বর্ধমান জেলার একটি প্রাচীন নদীবন্দর শহর, ভাগীরথী-হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। মন্দির-সমষ্টিটি কালনা রাজবাড়ি চত্বরের অংশ — একই প্রাঙ্গণে আছে বর্ধমান রাজবংশের আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্দির, যার মধ্যে ২৫ চূড়াবিশিষ্ট প্রতাপেশ্বর মন্দিরও অন্যতম, যা নিজেই এক স্থাপত্য-বিস্ময়। কলকাতা থেকে সড়কপথে বা হাওড়া-কাটোয়া রেললাইনে কালনা স্টেশনে নেমে সহজেই পৌঁছনো যায় এই মন্দির-চত্বরে।
১০৮ শিব মন্দিরের নির্মাণ-কৃতিত্ব বর্ধমান রাজবংশের। জনশ্রুতি ও স্থানীয় ইতিহাস অনুসারে, উনিশ শতকের প্রথমদিকে, আনুমানিক ১৮০৯ সালে, বর্ধমানের মহারাজা তেজচাঁদ বাহাদুর এই মন্দির-সমষ্টি নির্মাণ করান। বর্ধমান রাজপরিবার বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার-রাজবংশ ছিল, আর ধর্মীয় স্থাপত্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অসংখ্য নিদর্শন আজও ছড়িয়ে আছে বর্ধমান, কালনা ও সংলগ্ন অঞ্চলে। কালনার এই মন্দির-চত্বর সেই দীর্ঘ পৃষ্ঠপোষকতারই সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাশ।
এই মন্দির-সমষ্টির প্রকৃত বিস্ময় লুকিয়ে তার নকশায়। ১০৮টি মন্দির সাজানো হয়েছে দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তে — বাইরের বৃত্তে ৭৪টি এবং ভিতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির, মোট ১০৮টি। প্রতিটি মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছে একটি করে শিবলিঙ্গ। এই বৃত্তাকার বিন্যাস ভারতীয় মন্দির-স্থাপত্যে অত্যন্ত বিরল — বেশিরভাগ বহু-মন্দির চত্বর সরলরৈখিক সারিতে বা চতুষ্কোণ বিন্যাসে গড়া হয়, কিন্তু কালনার এই "মন্দির-বলয়" তার বৃত্তাকার জ্যামিতির জন্যই আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছে ইট ও চুন-সুরকির গাঁথনিতে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী আটচালা রীতিতে — খড়ের কুঁড়েঘরের ঢালু ছাউনির আদলে তৈরি বাংলার নিজস্ব মন্দির-স্থাপত্য, যা রাজস্থান বা দক্ষিণ ভারতের পাথর-খোদাই মন্দিরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার। প্রতিটি মন্দিরের চূড়া ছোট হলেও সম্মিলিতভাবে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা ভারতের বিরলতম স্থাপত্য-দৃশ্যগুলির একটি।
একটি চমকপ্রদ প্রথাগত বিন্যাসও এখানে লক্ষণীয় — মন্দিরগুলি এমনভাবে সজ্জিত যে পাশাপাশি দুটি মন্দির কখনও একই "দলের" নয়; ঘুরে ঘুরে দর্শনের সময় পূজারি ও দর্শনার্থীরা পরপর দুই ভিন্ন ঘরানার শিবলিঙ্গের সামনে উপস্থিত হন। এই পর্যায়ক্রমিক বিন্যাস নিছক নান্দনিকতা নয় — তন্ত্র ও শৈবধর্মের প্রতীকী দ্বৈততারও ইঙ্গিতবাহী বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
হিন্দু ধর্মে ১০৮ সংখ্যাটির গভীর তাৎপর্য আছে — জপমালায় ১০৮টি পুঁতি, উপনিষদের সংখ্যাও ঐতিহ্যগতভাবে ১০৮ বলে গণ্য, আর জ্যোতিষশাস্ত্রে ১২ রাশি ও ৯ গ্রহের গুণফলও ১০৮। শৈবধর্মে এই সংখ্যাকে মহাজাগতিক পূর্ণতার প্রতীক ধরা হয়। কালনার মন্দির-নির্মাতারা সচেতনভাবেই এই সংখ্যাতাত্ত্বিক পূর্ণতাকে বেছে নিয়েছিলেন বলে মনে করা হয় — একসঙ্গে ১০৮ শিবের আরাধনা অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কল্যাণ কামনা।
কৈলাস পর্বত শিবের ধ্যানভূমি ও চিরন্তন আবাস। একই স্থানে ১০৮টি শিবলিঙ্গের সমাহার দেখে ভক্তদের কাছে জায়গাটি যেন পৃথিবীতেই এক নতুন কৈলাসের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে — সেই থেকেই লোকমুখে নাম "নবকৈলাস"। বহু ভক্তের কাছে তাই কালনা দর্শন মানেই এক প্রতীকী কৈলাস-যাত্রা, যা দূরের হিমালয় ভ্রমণের বিকল্প হিসেবেও দেখা হয়।
১০৮ শিব মন্দিরের পাশাপাশি কালনা রাজবাড়ি চত্বরে আছে আরও কিছু অসামান্য স্থাপত্য-নিদর্শন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতাপেশ্বর মন্দির — পঁচিশটি চূড়াবিশিষ্ট এক বিরল রীতির শিব মন্দির, যার টেরাকোটা অলংকরণ রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি ও দৈনন্দিন জনজীবনের দৃশ্যে সমৃদ্ধ। আছে লালজি মন্দির ও কৃষ্ণচন্দ্রজি মন্দিরের মতো আরও কিছু স্থাপনা। সব মিলিয়ে কালনা রাজবাড়ি চত্বর বাংলার টেরাকোটা মন্দির-স্থাপত্যের এক সংগ্রহশালা, যেখানে একই সফরে দেখা যায় বাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যের একাধিক ঘরানা।
কালনার ১০৮ শিব মন্দির আজ ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI) ও রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। তবে বাংলার অনেক ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মতোই আর্দ্র জলবায়ু, নদীর নিকটবর্তী অবস্থান এবং সময়ের প্রভাবে ইট-সুরকির গাঁথনি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। স্থানীয় পর্যটন উদ্যোগ ও ঐতিহ্য-সংরক্ষণ সংগঠনগুলির প্রচেষ্টায় সংস্কারকাজ চলে মাঝেমধ্যেই, কিন্তু এই বিরল স্থাপত্য-সম্পদ রক্ষায় আরও ব্যাপক ও ধারাবাহিক উদ্যোগের প্রয়োজন — ঠিক যেমন প্রয়োজন বাংলার অন্যান্য প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণেও।
কলকাতা থেকে কালনা যাওয়া তুলনামূলক সহজ — হাওড়া থেকে কাটোয়াগামী ট্রেনে কালনা স্টেশনে নেমে টোটো বা রিকশায় মিনিট দশেকেই রাজবাড়ি চত্বর। সড়কপথে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়িতেও পৌঁছনো যায়। ভোরের নরম আলোয় বা বিকেলের সোনালি রোদে মন্দির-বলয়ের ছবি সবচেয়ে সুন্দর ফোটে — ফটোগ্রাফি-প্রেমীদের কাছে এটি রীতিমতো তীর্থস্থান। কাছেই আছে ভাগীরথীর ঘাট, যেখানে বসে নদীর শান্ত স্রোত দেখাও এক আলাদা অভিজ্ঞতা।
কালনার এই বিস্ময়কর স্থাপত্য বুঝতে হলে জানা দরকার বর্ধমান রাজবংশের ইতিহাসও। সপ্তদশ শতকে পাঞ্জাব থেকে আসা এক ব্যবসায়ী পরিবার থেকে উত্থিত এই রাজবংশ মুঘল আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত বাংলার অন্যতম শক্তিশালী ও ধনী জমিদার-ঘরানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ধমান রাজরা কেবল রাজস্ব আদায়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি — শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় স্থাপত্যে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল সুবিস্তৃত। বর্ধমান শহরের কার্জন গেট, রাজবাড়ির প্রাসাদ-স্থাপত্য থেকে শুরু করে কালনা, নবদ্বীপ ও সংলগ্ন অঞ্চলের অসংখ্য মন্দির — সবই এই রাজবংশের ধর্মীয়-স্থাপত্য পৃষ্ঠপোষকতার সাক্ষ্য বহন করে। মহারাজা তেজচাঁদ বাহাদুরের আমলে এই পৃষ্ঠপোষকতা পৌঁছয় তার শিখরে, আর কালনার ১০৮ শিব মন্দির হয়ে ওঠে সেই ঐশ্বর্য ও ধর্মভক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান স্মারক।
বাংলায় শৈবধর্মের শিকড় সুপ্রাচীন — শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারার পাশাপাশি শিবপূজাও বাংলার আধ্যাত্মিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরাণে দেবী পার্বতীর স্বামী হিসেবে শিব শুধু ধ্বংসের দেবতা নন — তিনি যোগী, তপস্বী ও গৃহীর যুগলরূপ, আর তাঁর কৈলাস-বাস মানেই শান্তি ও ধ্যানের প্রতীক। বাংলার লোকজীবনে শিব প্রায়ই আসেন অত্যন্ত মানবিক রূপে — গাঁজাখোর, উদাসীন অথচ স্নেহময় দেবতা হিসেবে, যাঁকে নিয়ে অসংখ্য লোকগান ও ছড়া প্রচলিত। কালনার ১০৮ মন্দির তাই নিছক একটি রাজকীয় স্থাপত্য-প্রকল্প নয় — বাংলার সেই গভীর, ঘরোয়া শৈব-সংস্কৃতিরই এক মহিমান্বিত রূপ, যেখানে ভক্তি প্রকাশ পেয়েছে শিল্প ও সংখ্যাতত্ত্বের মেলবন্ধনে।
ভারতে একাধিক স্থানে বহু-মন্দির স্থাপত্যের নজির আছে — ওড়িশার ভুবনেশ্বর, মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো বা তামিলনাড়ুর মন্দির-নগরীগুলি বিখ্যাত তাদের সংখ্যাধিক্য ও পাথর-খোদাইয়ের সূক্ষ্মতার জন্য। কিন্তু কালনার এই ১০৮ মন্দির-সমষ্টি আলাদা তিনটি কারণে — প্রথমত, এটি সম্পূর্ণ ইট-সুরকির বাংলা টেরাকোটা রীতিতে গড়া, পাথরে নয়; দ্বিতীয়ত, একই দেবতার (শিব) ১০৮টি প্রতিমূর্তি একই চত্বরে, যা অন্য কোথাও এত বিশুদ্ধ সাংখ্যিক পূর্ণতায় দেখা যায় না; তৃতীয়ত, এর বৃত্তাকার জ্যামিতি ভারতীয় মন্দির-স্থাপত্যে প্রায় অনন্য। এই তিন বৈশিষ্ট্যই কালনাকে বাংলার তথা ভারতের ধর্মীয় স্থাপত্যের মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় করে তুলেছে।
পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা শহরে, ভাগীরথী নদীর তীরে কালনা রাজবাড়ি চত্বরে এই ১০৮টি শিব মন্দির অবস্থিত। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮২ কিলোমিটার।
জনশ্রুতি ও স্থানীয় ইতিহাস অনুসারে, বর্ধমান রাজবংশের মহারাজা তেজচাঁদ বাহাদুর উনিশ শতকের প্রথমদিকে, আনুমানিক ১৮০৯ সালে এই মন্দির-সমষ্টি নির্মাণ করান।
১০৮টি মন্দির দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তে বিন্যস্ত — বাইরের বৃত্তে ৭৪টি এবং ভিতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির, প্রতিটিতে একটি করে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত।
কৈলাস পর্বত শিবের চিরন্তন আবাস বলে মানা হয়। একই স্থানে ১০৮টি শিবলিঙ্গের সমাহার ভক্তদের কাছে যেন পৃথিবীতেই এক নতুন কৈলাসের প্রতিরূপ — সেই থেকেই এই নাম।
১০৮ শিব মন্দির ছাড়াও এই চত্বরে আছে পঁচিশ চূড়াবিশিষ্ট প্রতাপেশ্বর মন্দির, লালজি মন্দির ও কৃষ্ণচন্দ্রজি মন্দিরের মতো আরও কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা।
বাংলার আরও প্রাচীন ইতিহাস পড়ুন চন্দ্রকেতুগড়ের নিবন্ধে ও বাংলা সনের ইতিহাসে। মহা শিবরাত্রির তারিখ ও তাৎপর্য দেখুন এই পাতায়।