🏛️ ইতিহাস · ৮ জুলাই ২০২৬, বুধবার
কলকাতার প্রায় ২,০০০ বছর আগে গঙ্গা বদ্বীপ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা চন্দ্রকেতুগড়। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়-চতুর্থ শতক থেকে মৌর্য, শুঙ্গ, কুষাণ ও গুপ্ত যুগে এর বিকাশ ঘটে, যা বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও বাণিজ্যের মূল্যবান দলিল।
কলকাতার ইতিহাসের কথা উঠলেই অধিকাংশ মানুষের মনে আসে ১৬৯০ সালে জব চার্নকের আগমন, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি্র বাণিজ্যকেন্দ্র এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা আধুনিক মহানগরের ছবি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, কলকাতা প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই হাজার বছর আগেই গঙ্গা বদ্বীপ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা—চন্দ্রকেতুগড়।
আজকের উত্তর ২৪ পরগনার বেরাচাঁপা এলাকার কাছে অবস্থিত এই প্রত্নস্থল বহু দশক ধরে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং গবেষকদের কাছে এক রহস্যময় অধ্যায়। খননকার্যে এখানে মিলেছে অসাধারণ টেরাকোটা শিল্প, মুদ্রা, সিলমোহর, অলংকার, মৃৎপাত্র এবং দুর্গপ্রাচীরের নিদর্শন, যা প্রমাণ করে যে একসময় এটি ছিল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্র।
তবুও আশ্চর্যের বিষয়, চন্দ্রকেতুগড়ের নাম আজও সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা।
চন্দ্রকেতুগড় পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দেগঙ্গা ব্লকের বেরাচাঁপা অঞ্চলে অবস্থিত। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৫–৪০ কিলোমিটার।
বর্তমানে চারদিকে গ্রাম, কৃষিজমি এবং ছোট ছোট বসতি থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, একসময় এখান দিয়ে প্রবাহিত হত বিদ্যাধরী নদী। সেই নদীপথ ব্যবহার করেই দূরদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালিত হত।
"চন্দ্রকেতুগড়" নামটি নিয়ে নানা লোককথা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এখানে একসময় রাজা চন্দ্রকেতু নামে একজন শাসক ছিলেন এবং তাঁর নাম থেকেই এলাকার নামকরণ।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা রাজা চন্দ্রকেতুর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, নামটি স্থানীয় লোককথা থেকে জনপ্রিয় হয়েছে, কিন্তু প্রত্নস্থলের প্রকৃত ইতিহাস আরও প্রাচীন এবং জটিল।
অর্থাৎ, রাজা চন্দ্রকেতুর কাহিনি লোকবিশ্বাসের অংশ হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের সঙ্গে তাকে সরাসরি যুক্ত করা যায় না।
এটাই সম্ভবত চন্দ্রকেতুগড়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এখানে মানববসতির সূচনা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২,৩০০–২,৫০০ বছর আগে।
পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল ধারাবাহিকভাবে বসতিপূর্ণ ছিল। মৌর্য, শুঙ্গ, কুষাণ এবং গুপ্ত যুগ পর্যন্ত এখানে মানুষের বসবাস এবং বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, কলকাতা একটি শহর হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে মূলত সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে।
অর্থাৎ, চন্দ্রকেতুগড়ের ইতিহাস কলকাতার তুলনায় প্রায় দুই সহস্রাব্দ পুরোনো।
স্থানীয় মানুষ বহু বছর ধরেই চাষের জমি থেকে পুরনো ইট, মূর্তি ও মৃৎপাত্র খুঁজে পেতেন।
বিশ শতকের শুরুতে গবেষকদের নজরে আসে এই অঞ্চল।
পরবর্তীতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক পর্যায়ে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালনা করে।
খননের ফলে যে বিপুল পরিমাণ প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়, তা দেখে গবেষকরা বুঝতে পারেন যে এটি কোনও সাধারণ গ্রাম নয়; বরং সুপরিকল্পিত একটি নগরসভ্যতার অংশ।
চন্দ্রকেতুগড়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার অসাধারণ প্রত্নসম্পদ।
এখানে পাওয়া টেরাকোটা ফলকগুলি ভারতের প্রাচীন শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এসব ফলকে দেখা যায়—
এই শিল্পকর্মগুলির সূক্ষ্মতা দেখে গবেষকেরা বিস্মিত হয়েছেন।
এখানে বহু ধরনের মুদ্রা পাওয়া গেছে।
যেমন—
এসব মুদ্রা থেকে বোঝা যায় যে এখানে নিয়মিত বাণিজ্য চলত এবং অর্থনীতি ছিল যথেষ্ট উন্নত।
চন্দ্রকেতুগড়ে পাওয়া বিভিন্ন সিল ও সিলমোহরে প্রাণী, জাহাজ, প্রতীক এবং ব্রাহ্মী লিপির চিহ্ন দেখা যায়।
এগুলো সম্ভবত ব্যবসায়িক নথি, পণ্য পরিবহন কিংবা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হত।
খননকার্যে উদ্ধার হয়েছে—
এগুলো প্রমাণ করে যে এখানকার বাসিন্দারা কেবল কৃষিনির্ভর ছিলেন না; তাঁরা বিলাসবহুল সামগ্রীও ব্যবহার করতেন।
বিভিন্ন আকারের রান্নার পাত্র, সংরক্ষণ পাত্র, প্রদীপ এবং সূক্ষ্ম অলংকরণযুক্ত মাটির বাসন উদ্ধার হয়েছে।
এসব থেকে সে সময়কার দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস এবং কারুশিল্প সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে বিশাল ইটের তৈরি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার চিহ্নও পেয়েছেন।
এটি প্রমাণ করে যে নগরটি পরিকল্পিতভাবে নির্মিত ছিল এবং বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থাও ছিল।
চন্দ্রকেতুগড়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির একটি হল এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব।
বিদ্যাধরী নদী হয়ে এই অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ফলে এখান থেকে পণ্য পৌঁছে যেত ভারতের অন্যান্য অঞ্চল এবং বিদেশেও।
গবেষকদের মতে, এখানে উৎপাদিত বা বাণিজ্যিকভাবে লেনদেন হওয়া পণ্যের মধ্যে ছিল—
কিছু প্রত্নবস্তু এবং শিল্পরীতির মিল থেকে ধারণা করা হয়, প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গেও পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। তবে রোমের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যের প্রশ্নে গবেষকদের মধ্যে এখনও আলোচনা চলমান, তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করা যায় না।
চন্দ্রকেতুগড়কে শুধুমাত্র একটি প্রাচীন বসতি বললে ভুল হবে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা একটি নগরকেন্দ্র। খননকার্যে উদ্ধার হওয়া ইটের প্রাচীর, রাস্তার চিহ্ন, নিকাশির ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন স্থাপত্যের ভিত্তি থেকে বোঝা যায় যে এখানে নগর পরিকল্পনার একটি সুস্পষ্ট ধারণা ছিল।
অনুমান করা হয়, শহরটির চারপাশে প্রতিরক্ষামূলক প্রাচীর বা দুর্গবেষ্টনী ছিল। নদীপথের সঙ্গে সংযোগ থাকায় বাণিজ্য ও যাতায়াত সহজ ছিল। নগরের বিভিন্ন অংশে সম্ভবত আবাসিক এলাকা, বাজার, কারুশিল্পের কেন্দ্র এবং ধর্মীয় স্থাপনা পৃথকভাবে বিন্যস্ত ছিল।
যদিও পুরো শহরটি এখনও খনন করা সম্ভব হয়নি, তবুও যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে এটি ছিল একটি সংগঠিত নগরসমাজ।
প্রত্নবস্তু আমাদের শুধু রাজা বা যুদ্ধের ইতিহাস জানায় না; এগুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ছবিও তুলে ধরে।
চন্দ্রকেতুগড়ে পাওয়া রান্নার পাত্র, প্রদীপ, অলংকার, খেলনা এবং গৃহস্থালির সামগ্রী থেকে ধারণা করা যায় যে এখানকার মানুষ ছিল দক্ষ কারিগর, ব্যবসায়ী, কৃষক ও নাবিক।
শিশুদের জন্য তৈরি মাটির খেলনা, পশুপাখির ক্ষুদ্র মূর্তি এবং চাকাযুক্ত খেলনা নির্দেশ করে যে শিশুদের বিনোদনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হত।
অন্যদিকে, সূক্ষ্ম অলংকার ও প্রসাধন সামগ্রী প্রমাণ করে যে সমাজে রুচিবোধ ও শিল্পচর্চা ছিল উন্নত।
চন্দ্রকেতুগড়ের টেরাকোটা ফলকগুলি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জগতে বিশেষভাবে সমাদৃত।
এসব ফলকে ফুটে উঠেছে—
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো নারীমূর্তিগুলি। তাদের পোশাক, গয়না, চুলের বিন্যাস এবং মুখাবয়বের সূক্ষ্ম শিল্পকৌশল থেকে সে সময়কার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রুচির পরিচয় মেলে।
প্রতিটি টেরাকোটা ফলক যেন দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো সমাজের একটি স্থিরচিত্র।
চন্দ্রকেতুগড়ে উদ্ধার হওয়া প্রত্নবস্তু থেকে বোঝা যায় যে এখানে একাধিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ধারা সহাবস্থান করত।
বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতীক, যক্ষ-যক্ষিণীর মূর্তি, উর্বরতার প্রতীক এবং লোকবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত নানা শিল্পকর্ম পাওয়া গেছে।
পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় প্রভাবও এই অঞ্চলে পৌঁছেছিল বলে গবেষকদের ধারণা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—চন্দ্রকেতুগড় ছিল সংস্কৃতির আদান-প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
চন্দ্রকেতুগড়ের শিল্পকর্মে নারীর উপস্থিতি অত্যন্ত লক্ষণীয়।
অনেক টেরাকোটা ফলকে দেখা যায়—
এসব শিল্পকর্ম শুধুমাত্র সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; এগুলো সমাজে নারীর সাংস্কৃতিক ভূমিকারও ইঙ্গিত বহন করে।
চন্দ্রকেতুগড়ের কারিগররা যে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বস্তু থেকে।
এখানে তৈরি হত—
এইসব সামগ্রী শুধু স্থানীয় ব্যবহারের জন্য নয়, বাণিজ্যের জন্যও উৎপাদিত হত বলে ধারণা করা হয়।
বর্তমান চন্দ্রকেতুগড়ের আশপাশে নদীর প্রবাহ আগের মতো নেই। কিন্তু প্রাচীনকালে বিদ্যাধরী নদী ছিল এই অঞ্চলের প্রাণরেখা।
নদীপথের মাধ্যমে—
নদীকেন্দ্রিক এই অর্থনীতিই সম্ভবত চন্দ্রকেতুগড়কে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল।
এটাই চন্দ্রকেতুগড়ের সবচেয়ে বড় রহস্য।
আজও কোনও একক কারণ নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে গবেষকরা কয়েকটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
১. নদীর গতিপথ পরিবর্তন
বিদ্যাধরী নদীর প্রবাহ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হলে বন্দর হিসেবে এলাকার গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
২. পলি জমে নৌপথ অচল হওয়া
বদ্বীপ অঞ্চলে নদীতে পলি জমা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে বড় নৌযান চলাচল ব্যাহত হলে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. রাজনৈতিক পরিবর্তন
রাজবংশের পরিবর্তন, প্রশাসনিক কেন্দ্রের স্থানান্তর বা নতুন বাণিজ্যকেন্দ্রের উত্থানও একটি কারণ হতে পারে।
৪. অর্থনৈতিক পরিবর্তন
বাণিজ্যপথ বদলে গেলে ধীরে ধীরে শহরের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
বন্যা, নদীভাঙন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। তবে এ বিষয়ে এখনও পর্যাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চন্দ্রকেতুগড় নিয়ে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত।
কথিত আছে এখানে গুপ্তধন লুকিয়ে আছে।
কথিত আছে রাজা চন্দ্রকেতুর বিশাল দুর্গ এখনও মাটির নিচে রয়েছে।
আবার প্রচলিত মতে এখানে অলৌকিক ঘটনা ঘটত।
কিন্তু প্রত্নতত্ত্বের দৃষ্টিতে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ইতিহাসবিদরা লিখিত নথি, প্রত্নবস্তু, স্তরবিন্যাস এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাই লোককথা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও, সেগুলোকে ইতিহাসের সমতুল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।
চন্দ্রকেতুগড়ের একটি বড় অংশ এখনও সম্পূর্ণভাবে খনন করা হয়নি।
এর ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা—
ভবিষ্যতের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হয়তো এসব প্রশ্নের আরও স্পষ্ট উত্তর দেবে।
আজ চন্দ্রকেতুগড়ে গেলে প্রথম দেখায় হয়তো মনে হবে এটি পশ্চিমবঙ্গের আর পাঁচটি সাধারণ গ্রামের মতোই। চারদিকে সবুজ মাঠ, কাঁচা-পাকা রাস্তা, পুকুর, কৃষিজমি এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কিন্তু এই মাটির নিচেই লুকিয়ে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস।
খননকার্যে উদ্ধার হওয়া বহু প্রত্নবস্তু বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তর-এর সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে। কলকাতার Indian Museum-সহ বিভিন্ন সংগ্রহশালায় চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত টেরাকোটা ফলক, মুদ্রা, অলংকার ও অন্যান্য নিদর্শন প্রদর্শিত হয়।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এখনও এই প্রত্নস্থল তার প্রাপ্য গুরুত্ব পায়নি। গবেষণা, সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতার আরও বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।
ভারতের প্রাচীন ইতিহাসে পাটলিপুত্র, তক্ষশিলা বা উজ্জয়িনীর নাম অনেকেই জানেন। কিন্তু চন্দ্রকেতুগড়ের গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। স্বামী বিবেকানন্দ-এর মতো ব্যক্তিত্বের জন্মভূমি এই বাংলার ইতিহাস কেবল আধুনিক যুগেই সীমাবদ্ধ নয়, তার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।
এর প্রধান কারণগুলি হলো—
চন্দ্রকেতুগড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাংলার ইতিহাস কেবল মধ্যযুগ বা ঔপনিবেশিক যুগে সীমাবদ্ধ নয়; তার শিকড় আরও বহু শতাব্দী গভীরে প্রোথিত।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর কখনও ফিরিয়ে আনা যায় না।
অবৈধ খনন, জমি দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে। চন্দ্রকেতুগড়ও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।
সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন—
ইতিহাস সংরক্ষণ মানে শুধু অতীতকে রক্ষা করা নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের একটি অমূল্য ভাণ্ডার সংরক্ষণ করা।
আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন, তাহলে একদিনের ভ্রমণেই চন্দ্রকেতুগড় ঘুরে দেখা সম্ভব।
অবস্থান: বেরাচাঁপা, দেগঙ্গা, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ।
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৩৫–৪০ কিলোমিটার।
যাতায়াত: কলকাতা থেকে সড়কপথে ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্যাক্সি বা বাসে পৌঁছানো যায়। কাছাকাছি রেলস্টেশন থেকে স্থানীয় পরিবহণও পাওয়া যায়।
ভ্রমণের আগে স্থানীয় পরিস্থিতি এবং দর্শনের সুযোগ সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া ভালো, কারণ প্রত্নস্থলের প্রবেশব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
চন্দ্রকেতুগড় আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—একসময়ের সমৃদ্ধ নগরও সময়, প্রকৃতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে হারিয়ে যেতে পারে।
যে শহরে একদিন শিল্পী কাজ করতেন, ব্যবসায়ীরা দূরদেশে পণ্য পাঠাতেন, নদীপথে নৌকা ভিড়ত এবং মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল চারদিক, আজ সেখানে নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতা ইতিহাসকে মুছে দেয়নি। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রতিটি টেরাকোটা ফলক, প্রতিটি মুদ্রা এবং প্রতিটি ইট আমাদের অতীতের গল্প শোনায়।
চন্দ্রকেতুগড় শুধুমাত্র একটি প্রত্নস্থল নয়; এটি বাংলার প্রাচীন সভ্যতার এক জীবন্ত দলিল।
কলকাতা প্রতিষ্ঠার বহু শতাব্দী আগে এখানে গড়ে উঠেছিল একটি সমৃদ্ধ নগর, যেখানে শিল্প, বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং নগরজীবনের বিকাশ ঘটেছিল। যদিও সময়ের স্রোতে সেই শহর হারিয়ে গেছে, তার নিদর্শন আজও আমাদের অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
চন্দ্রকেতুগড়ের ইতিহাস যত বেশি গবেষণা হবে, ততই পরিষ্কার হবে যে বাংলার সভ্যতার ইতিহাস আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক প্রাচীন, সমৃদ্ধ এবং বিশ্বসংযুক্ত ছিল।
হয়তো ভবিষ্যতের কোনো নতুন খননকার্য আবারও উন্মোচন করবে এমন কোনো তথ্য, যা বদলে দিতে পারে বাংলার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণা।
চন্দ্রকেতুগড় পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দেগঙ্গা ব্লকের বেরাচাঁপা অঞ্চলে অবস্থিত।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, এখানে বসতির সূচনা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে, অর্থাৎ প্রায় ২,৩০০–২,৫০০ বছর আগে।
স্থানীয় লোককথায় তাঁর উল্লেখ থাকলেও, বর্তমান প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ তাঁর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিশ্চিত করে না।
টেরাকোটা ফলক, মুদ্রা, সিলমোহর, অলংকার, মৃৎপাত্র, দুর্গপ্রাচীরের অংশ, খেলনা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে।
এটি বাংলার প্রাচীন নগরসভ্যতা, বাণিজ্য, শিল্পকলা এবং সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।