← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু — মহানিষ্ক্রমণ থেকে আজাদ হিন্দ, অসমাপ্ত এক মহাকাব্য

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ২২ জুন ২০২৬, সোমবার

আইসিএস ছেড়ে দেশের ডাকে, এলগিন রোডের মহানিষ্ক্রমণ থেকে সাবমেরিনে মহাসাগর পাড়ি, আজাদ হিন্দ ফৌজের 'দিল্লি চলো' — নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সম্পূর্ণ জীবনকথা, তাইহোকু-রহস্য ও অজানা তথ্য।

"তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব!" — ১৯৪৪ সালে বর্মার জনসভায় উচ্চারিত এই একটি বাক্য আজও ভারতবাসীর রক্তে আগুন জ্বালায়। বক্তা — নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু; বাঙালির চির-আবেগ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অধ্যায়ের নায়ক, আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি তাঁর জন্মজয়ন্তী পালিত হয় পরাক্রম দিবস হিসেবে — ২০২৭-এ দিনটি শনিবার, ৯ মাঘ ১৪৩৩

আইসিএস-এর সোনার চাকরি ছুঁড়ে ফেলা থেকে ব্রিটিশ নজরবন্দি এড়িয়ে কাবুল-বার্লিন-টোকিও, সাবমেরিনে মহাসাগর পেরোনো থেকে ষাট হাজার সৈনিকের ফৌজ — সুভাষচন্দ্রের জীবন কোনো থ্রিলারের চেয়ে কম নয়। সম্পূর্ণ কাহিনি রইল।

এক নজরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

কটকের সুভাষ — মেধা আর বিদ্রোহের যুগলবন্দি

১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি কটকে জন্ম, চোদ্দো ভাইবোনের নবম সুভাষ ছোট থেকেই দুই বিপরীত টানে বড় — একদিকে প্রখর মেধা, অন্যদিকে অসহ্য অন্যায়-অসহিষ্ণুতা। স্বামী বিবেকানন্দের রচনা কিশোর বয়সেই তাঁর জীবনের দিক ঠিক করে দিল — সেবা আর শক্তির মন্ত্র। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন ভারতীয়দের প্রতি অপমানজনক আচরণের অভিযোগে অধ্যাপক ওটেনকে ঘিরে ছাত্র-বিক্ষোভের জেরে বহিষ্কৃত হলেন — মেধাবী ছাত্রের 'দাগি' খাতা! পরে স্কটিশ চার্চ থেকে দর্শনে স্নাতক, তারপর কেমব্রিজ — এবং ১৯২০-তে আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান। কিন্তু জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্ত তখনও শুকোয়নি — ১৯২১-এ চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশে ফিরলেন তেইশ বছরের যুবক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আইসিএস ছেড়ে আসা হাতে-গোনা ভারতীয়দের একজন তিনি।

দেশবন্ধুর শিষ্য থেকে কংগ্রেসের সভাপতি

কলকাতায় ফিরে সুভাষ পেলেন রাজনৈতিক গুরু — দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। কলকাতা কর্পোরেশনের মুখ্য নির্বাহী, 'ফরওয়ার্ড' পত্রিকার সম্পাদনা, বেঙ্গল কংগ্রেসের সংগঠন — দক্ষতায় দ্রুত উঠলেন জাতীয় স্তরে; আর সমান তালে চলল কারাবাস — জীবনে এগারো বার জেলে গেছেন তিনি, মান্দালয়ের নির্জন কারাগারেও। ১৯৩০-এ জেলে বসেই নির্বাচিত হলেন কলকাতার মেয়র।

১৯৩৮-এ হরিপুরা কংগ্রেসে সর্বসম্মত সভাপতি; পরের বছর ত্রিপুরিতে গান্ধীজি-সমর্থিত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে পুনর্নির্বাচিত — গান্ধীজি বললেন, "পট্টভির পরাজয় আমার পরাজয়।" কিন্তু শীর্ষনেতৃত্বের অসহযোগে কাজ অসম্ভব হয়ে উঠল; সভাপতিত্ব ছেড়ে ১৯৩৯-এর মে মাসে গড়লেন ফরওয়ার্ড ব্লক। ইতিহাসের মজা — গান্ধী-সুভাষ মতপার্থক্য ছিল পথ নিয়ে, শ্রদ্ধায় নয়; 'জাতির জনক' সম্বোধনটি প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন সুভাষই, আজাদ হিন্দ রেডিওর ভাষণে, আর গান্ধীজি তাঁকে বলতেন 'দেশপ্রেমিকদের রাজপুত্র'।

মহানিষ্ক্রমণ — ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পলায়ন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতেই সুভাষের হিসেব পরিষ্কার — ব্রিটেনের বিপদই ভারতের সুযোগ। হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনের জেরে গ্রেপ্তার, অনশনে মুক্তি, তারপর এলগিন রোডের বাড়িতে কড়া নজরবন্দি। ১৯৪১-এর ১৬-১৭ জানুয়ারির মাঝরাতে ঘটল সেই কিংবদন্তি — দাড়িওয়ালা 'মহম্মদ জিয়াউদ্দিন' বেশে সুভাষ উঠলেন ভাইপো শিশির বসুর চালানো ওয়ান্ডারার গাড়িতে; গোমো স্টেশন, কালকা মেল, পেশোয়ার, তারপর পাঠান পথপ্রদর্শকের সঙ্গে পায়ে হেঁটে দুর্গম সীমান্ত পেরিয়ে কাবুল — সেখান থেকে ইতালীয় কূটনীতিক 'অরল্যান্দো মাৎসোত্তা'র পাসপোর্টে মস্কো হয়ে বার্লিন! ব্রিটিশ গোয়েন্দারা টের পেল সপ্তাহখানেক পরে — পাখি তখন হাজার মাইল দূরে।

বার্লিনে গড়লেন ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার ও যুদ্ধবন্দি ভারতীয় সেনাদের নিয়ে ইন্ডিয়ান লিজিয়ন; চালু হলো আজাদ হিন্দ রেডিও। এখানেই ভারতীয় সৈনিকরা তাঁকে প্রথম ডাকলেন — 'নেতাজি'; আর তাঁর সহকর্মী আবিদ হাসানের হাতে জন্ম নিল অমর অভিবাদন — 'জয় হিন্দ'। ১৯৪৩-এর ফেব্রুয়ারিতে ঘটল যুদ্ধ-ইতিহাসের অনন্য ঘটনা: জার্মান ইউ-বোটে আটলান্টিক-ভারত মহাসাগর পাড়ি, মাদাগাস্কারের কাছে উত্তাল সমুদ্রে ডিঙিতে করে জাপানি সাবমেরিনে স্থানান্তর — দুই নৌবাহিনীর সাবমেরিন-বদলের একমাত্র বেসামরিক যাত্রী সম্ভবত তিনিই।

আজাদ হিন্দ — সরকার, সেনা, স্বপ্ন

১৯৪৩-এর জুলাইয়ে সিঙ্গাপুরে রাসবিহারী বসু তুলে দিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের (আইএনএ) নেতৃত্ব। নেতাজির জাদুস্পর্শে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় সমাজ উজাড় করে দিল সম্পদ ও সন্তান — গড়ে উঠল প্রায় ষাট হাজারের বাহিনী, আর নারী-সেনানীর ঝাঁসির রানি রেজিমেন্ট — ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথনের নেতৃত্বে, এশিয়ার প্রথম নিয়মিত নারী পদাতিক বাহিনীগুলির একটি। ১৯৪৩-এর ২১ অক্টোবর ঘোষিত হলো আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ — স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার; স্বীকৃতি দিল জাপান-জার্মানি-সহ ন'টি দেশ। জাপান আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এই সরকারের হাতে দিলে নেতাজি নাম রাখলেন শহিদ ও স্বরাজ দ্বীপ; ১৯৪৩-এর ৩০ ডিসেম্বর পোর্ট ব্লেয়ারে ওড়ালেন তেরঙা।

১৯৪৪-এ 'দিল্লি চলো' — ইম্ফল-কোহিমা অভিযানে মণিপুরের মৈরাংয়ে ভারতের মাটিতে উড়ল আইএনএ-র পতাকা। কিন্তু বর্ষা, রসদ-সংকট আর জাপানের পরাজয়ের স্রোতে অভিযান ভাঙল। যুদ্ধ শেষে দিল্লির লালকেল্লায় আইএনএ অফিসারদের বিচার শুরু হতেই ঘটল অভাবনীয় — গোটা ভারত গর্জে উঠল 'লালকেল্লা ভেঙে দাও' ধ্বনিতে, ফুঁসে উঠল নৌবাহিনী (১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ)। বহু ঐতিহাসিকের মতে, ব্রিটিশের ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্তে আইএনএ-র এই পরোক্ষ ধাক্কা ছিল নির্ণায়ক — স্বাধীনতার সেই শেষ অঙ্কের কথা পড়ুন এখানে

তাইহোকু ১৯৪৫ — অসমাপ্ত রহস্য

সরকারি ভাষ্যে, ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকু বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়। কিন্তু ভারতবাসীর বড় অংশ তা কোনোদিন মানেনি — দেহ কেউ দেখেনি, ছবি নেই, আর সাক্ষ্যে অসংগতি অনেক। স্বাধীন ভারতে তিন-তিনটি তদন্ত — শাহনওয়াজ কমিটি (১৯৫৬) ও খোসলা কমিশন (১৯৭০) দুর্ঘটনা-তত্ত্ব মানলেও মুখার্জি কমিশন (২০০৫) জানায়, সেদিন তাইহোকুতে ওই দুর্ঘটনার প্রমাণ মেলেনি — যদিও সরকার সে রিপোর্ট গ্রহণ করেনি। গুমনামি বাবা থেকে সন্ন্যাসী-তত্ত্ব — জল্পনার শেষ নেই; ২০১৫-১৬ থেকে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার শত শত গোপন ফাইল প্রকাশ করেছে, তবু শেষ পাতাটি আজও অলিখিত। রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত চিতাভস্ম ঘিরে বিতর্কও অমীমাংসিত। হয়তো এই অসমাপ্তিই নেতাজি-মিথের অমরত্বের রসায়ন — বাঙালির মনে তিনি কখনো 'মারা যাননি', ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

নেতাজি-জীবনপঞ্জি — এক নজরে

আজাদ হিন্দ সরকার — একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের রূপরেখা

ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে 'আজাদ হিন্দ ফৌজ' যতটা জায়গা পায়, তার সরকার-কাঠামো ততটা পায় না — অথচ সেটিই নেতাজির রাষ্ট্রনায়ক-প্রতিভার আসল দলিল। ১৯৪৩-এর ২১ অক্টোবর ঘোষিত আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দের ছিল নিজস্ব মন্ত্রিসভা (রাষ্ট্রপ্রধান, যুদ্ধ, অর্থ, প্রচার, নারীকল্যাণ দপ্তর — শেষটির দায়িত্বে ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী), নিজস্ব ঘোষণাপত্র, জাতীয় সংগীত ('শুভ সুখ চ্যান' — জন গণ মনের হিন্দুস্তানি রূপ), অভিবাদন 'জয় হিন্দ', এমনকি আজাদ হিন্দ ব্যাংক ও ডাকটিকিটের পরিকল্পনা। প্রবাসী ভারতীয়দের থেকে কর ও অনুদান সংগ্রহের ব্যবস্থা ছিল রীতিমতো রাজস্ব-দপ্তরের ধাঁচে — রেঙ্গুনের ব্যবসায়ী হাবিব সাহেবের মতো কেউ কেউ সর্বস্ব দান করেছিলেন; নেতাজি চালু করেছিলেন 'সেবক-ই-হিন্দ' পদক। সরকারের নারীনীতিও যুগান্তকারী — ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে রাইফেল কাঁধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় ঘরের মেয়েরা; চল্লিশের দশকের প্রেক্ষিতে যা প্রায় অকল্পনীয়। জাপানি সহায়তা নিলেও নীতিগত প্রশ্নে নেতাজির স্বাতন্ত্র্য ঐতিহাসিকদের নজর কেড়েছে — আন্দামানে জাপানি প্রশাসনের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের নথিও আছে। সব মিলিয়ে আজাদ হিন্দ সরকার ছিল স্বাধীন ভারতের 'ফুল ড্রেস রিহার্সাল' — মন্ত্রিসভা থেকে মুদ্রা, সবই প্রস্তুত; ইতিহাস শুধু সময়টা দেয়নি।

নেতাজি-চর্চা আজ — ফাইল, মিউজিয়াম, স্মৃতির লড়াই

নেতাজিকে ঘিরে বাঙালির আবেগ আজও গবেষণা আর তীর্থযাত্রার চেহারায় জীবন্ত। কলকাতার এলগিন রোডের নেতাজি ভবন — যেখান থেকে মহানিষ্ক্রমণ — আজ নেতাজি রিসার্চ বুরোর সংগ্রহশালা; সেই ঐতিহাসিক ওয়ান্ডারার গাড়িটিও সংরক্ষিত সেখানে। লালকেল্লায় আইএনএ-বিচারের কক্ষে গড়ে উঠেছে নেতাজি সংগ্রহালয় (২০১৯); মণিপুরের মৈরাংয়ে আইএনএ স্মারক, আন্দামানে সেলুলার জেল-সংলগ্ন স্মৃতিক্ষেত্র, কটকের জানকীনাথ ভবনে জন্মভিটে-সংগ্রহশালা — নেতাজি-তীর্থের তালিকা দীর্ঘ। ২০১৫-য় পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৬৪টি ও ২০১৬ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার শত শত গোপন ফাইল প্রকাশ করেছে (netajipapers অনলাইন আর্কাইভে যার বড় অংশ পাঠযোগ্য) — গবেষকদের হাতে এসেছে নতুন উপাদান, যদিও অন্তর্ধান-প্রশ্নের সর্বসম্মত উত্তর মেলেনি। রেনকোজি মন্দিরের ভস্মের ডিএনএ-পরীক্ষার দাবি আজও ওঠে; পরিবারের সদস্যরাও বিভক্ত। তবে এক জায়গায় সব পক্ষ একমত — পাঠ্যবই নেতাজিকে যতটা দিয়েছে, প্রাপ্য তার বেশি; সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পরাক্রম দিবস, ইন্ডিয়া গেটের মূর্তি, প্রজাতন্ত্র দিবসে আইএনএ-প্রবীণদের সম্মাননা — রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাল্লা ভারী হচ্ছে। আর বাঙালির ঘরে? সেখানে নেতাজি কোনোদিন 'ইতিহাস' হননি — ছিলেন, আছেন, বর্তমান।

অজানা তথ্য — নেতাজি সম্পর্কে যা কম জানা

নেতাজির কলম ও চিন্তা — সৈনিকের আড়ালের দার্শনিক

অস্ত্র হাতে বিপ্লবীর ছবিটি এত উজ্জ্বল যে চিন্তক-নেতাজি প্রায়ই আড়ালে থেকে যান — অথচ তাঁর লেখালেখি ও রাষ্ট্রভাবনা স্বাধীন ভারতের নীল-নকশার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ইউরোপ-নির্বাসনে লেখা 'দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল' (১৯৩৫; ব্রিটিশ ভারতে নিষিদ্ধ!) ভারতীয় রাজনীতির প্রথম সারির আত্মবিশ্লেষণ — রোমাঁ রোলাঁর মতো ইউরোপীয় মনীষীরা যার প্রশংসা করেছিলেন; অসমাপ্ত আত্মজীবনী 'অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম'-এ কেমব্রিজের তরুণের আত্ম-অনুসন্ধান, আর ভাই শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে পত্রাবলি ইতিহাসের অমূল্য আকর (নেতাজি রিসার্চ বুরোর 'নেতাজি কালেক্টেড ওয়ার্কস' বারো খণ্ডে সংকলিত)। চিন্তায় তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সমন্বয়ী — হরিপুরা ভাষণে পরিকল্পিত শিল্পায়ন, ভূমিসংস্কার, জন্মনিয়ন্ত্রণ, নারীর সমানাধিকারের যে রূপরেখা দেন, স্বাধীন ভারতের পরিকল্পনা কমিশন-যুগ তারই উত্তরসূরি; ধর্মনিরপেক্ষতায় ছিলেন আপসহীন — আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু-মুসলিম-শিখ ভাগাভাগির বদলে অভিন্ন 'জয় হিন্দ', সেনা-ইউনিটে সাম্প্রদায়িক রান্নাঘর ভেঙে এক হাঁড়ি — চল্লিশের দশকের প্রেক্ষিতে বিপ্লবাত্মক পরীক্ষা। ভাষা-প্রশ্নে তাঁর সূত্রও কৌতূহলোদ্দীপক — সহজবোধ্য হিন্দুস্তানি (রোমান হরফের প্রস্তাবসহ!) সংযোগের ভাষা, কিন্তু মাতৃভাষার পূর্ণ মর্যাদা। আর আধ্যাত্মিকতা? বিবেকানন্দ-রামকৃষ্ণ ছিলেন তাঁর আজীবনের ধ্রুবতারা — কিশোর বয়সে সন্ন্যাসের টানে গৃহত্যাগের চেষ্টা, আর জীবনভর গীতা-সঙ্গী; 'দেশবন্ধুর' শিষ্যের কাছে রাজনীতি ছিল আসলে সাধনারই আরেক নাম। এই দার্শনিক গভীরতাই বোঝায় — 'দিল্লি চলো' শুধু সামরিক স্লোগান ছিল না; ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক, সাম্যভিত্তিক ভারতের স্বপ্নের মার্চ-পাস্ট।

সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম কবে?

১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি, ওড়িশার কটকে। দিনটি এখন পরাক্রম দিবস হিসেবে পালিত হয়; ২০২৭-এ নেতাজি জন্মজয়ন্তী পড়েছে ২৩ জানুয়ারি, শনিবার (৯ মাঘ ১৪৩৩)।

নেতাজি আইসিএস ছাড়লেন কেন?

১৯২০-তে আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ হয়েও ১৯২১-এ পদত্যাগ করেন — ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করে পরাধীন দেশের সেবা সম্ভব নয়, এই বিশ্বাসে। দেশে ফিরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন।

আজাদ হিন্দ ফৌজ কী?

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় যুদ্ধবন্দি ও প্রবাসীদের নিয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনী (আইএনএ), যার সর্বাধিনায়কত্ব ১৯৪৩-এ নেতাজি গ্রহণ করেন। ওই বছরের ২১ অক্টোবর তিনি সিঙ্গাপুরে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকারও প্রতিষ্ঠা করেন।

'তোমরা আমাকে রক্ত দাও' — কথাটি নেতাজি কোথায় বলেছিলেন?

১৯৪৪ সালের ৪ জুলাই বর্মার (মিয়ানমার) জনসভায় আজাদ হিন্দ ফৌজের সমাবেশে নেতাজি এই ঐতিহাসিক আহ্বান জানান — "তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।"

নেতাজির মৃত্যু-রহস্য কী?

সরকারি ভাষ্যে ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু; কিন্তু মুখার্জি কমিশন (২০০৫) ওই দুর্ঘটনার পক্ষে প্রমাণ পায়নি বলে জানায়। ফাইল প্রকাশের পরেও রহস্যের সর্বসম্মত মীমাংসা হয়নি।


নেতাজি জন্মজয়ন্তীর প্রতি বছরের তারিখ এই পাতায়। পড়ুন স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাসক্ষুদিরাম বসুর কাহিনিমাঘ মাসের ক্যালেন্ডার এখানে

প্রচ্ছদ ছবি: নেতাজি রিসার্চ বুরো, উইকিমিডিয়া কমন্স — পাবলিক ডোমেন

সম্পর্কিত পাতা

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার