🎉 উৎসব · ১৩ জুলাই ২০২৬, সোমবার
শীতলা পূজা বাংলার এক প্রাচীন ও অপরিহার্য লোকায়ত উৎসব, যা একসময় বসন্ত রোগের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে প্রতিটি বাঙালি পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দেবীর আরাধনার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আচার বাংলার নিজস্বতায় ভরা এবং এটি স্বাস্থ্য সুরক্ষার এক প্রাচীন বিশ্বাসকে বহন করে।
শীতলা পূজা একসময় বাংলার প্রতিটি বাঙালি পরিবারের জন্য ছিল এক অপরিহার্য আরাধনা। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে যখন বসন্ত রোগের (যেমন বসন্ত, হাম) প্রকোপ বাড়ত, তখন এই দেবীর আরাধনা করা হতো রোগমুক্তির আশায় এবং পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা কামনায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনুপস্থিতিতে, মা শীতলার পূজা ছিল রোগ প্রতিরোধ ও আরোগ্যের এক মনস্তাত্ত্বিক অবলম্বন, যা বাঙালির লোকায়ত বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
শীতলা দেবী বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেবী। তিনি রোগমুক্তির দেবী হিসেবে পূজিতা হন, বিশেষত বসন্ত, হাম, পক্স, জ্বর এবং অন্যান্য চর্মরোগের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে তাঁর পরিচিতি। "শীতলা" শব্দের অর্থ হল "যিনি শীতল করেন" বা "শীতলতা দান করেন"। এই নামটি দেবীর মূল উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে – রোগাক্রান্ত দেহে জ্বরের উচ্চ তাপ প্রশমিত করে শীতলতা প্রদান করা।
শীতলা দেবীর রূপ কল্পনায় তিনি সাধারণত একটি কলস এবং একটি ঝাড়ু হাতে একটি গাধার পিঠে আরোহণ করে থাকেন। কলসে থাকে শীতল জল বা অমৃত, যা রোগ নিরাময়ের প্রতীক। ঝাড়ু হল রোগ জীবাণু এবং অশুচি দূর করার প্রতীক। অনেক সময় তাঁর হাতে নিম পাতাও দেখা যায়, যা তার রোগ নিরাময়ের ক্ষমতার আরেকটি প্রতীক, কারণ নিম পাতা প্রাচীনকাল থেকেই জীবাণুনাশক হিসেবে পরিচিত। দেবীর এই রূপটি কেবল তাঁর রোগ নিরাময়ের ক্ষমতাই নয়, বরং রোগ প্রতিরোধের বার্তাও বহন করে। একসময় যখন বসন্ত রোগ মহামারীর আকার ধারণ করত, তখন এই দেবীর আরাধনা ছিল মানুষের কাছে একমাত্র ভরসা। তিনি কেবল রোগ সারিয়ে তোলেন না, বরং রোগ যাতে না হয়, তার জন্যও তাঁর শরণাপন্ন হওয়া হয়।
শীতলা পূজার ইতিহাস বাংলার লোকসংস্কৃতির গভীরে নিহিত। এটি বৈদিক বা পৌরাণিক দেব-দেবী পূজার মতো সুসংগঠিত না হলেও, এর শিকড় প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার জনজীবনে বিস্তৃত। কথিত আছে, আর্যদের আগমনের পূর্বে এই অঞ্চলে যে আদিবাসী সংস্কৃতি ছিল, সেখানেই প্রকৃতি ও রোগ-শোকের শক্তির পূজা প্রচলিত ছিল। শীতলা দেবী সেই প্রাচীন লোকবিশ্বাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রাচীনকালে চিকিৎসা ব্যবস্থার যখন তেমন উন্নতি হয়নি, তখন মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিকে দেব-দেবী রূপে কল্পনা করে তাদের কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করত। বসন্ত রোগ ছিল এক মারাত্মক ব্যাধি, যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিত। এই রোগের হাত থেকে বাঁচতে এবং এর প্রকোপ কমানোর জন্য শীতলা দেবীর ধারণা জন্ম নেয়। বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে এবং লোককথায় শীতলা দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা তাঁর প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। ষোড়শ শতকের কবি কৃষ্ণরাম দাসের 'শীতলামঙ্গল' কাব্য শীতলা দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করে। এটি প্রমাণ করে যে অন্তত কয়েক শতাব্দী ধরে এই দেবী বাংলায় পূজিত হয়ে আসছেন। এই পূজা শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সার্বজনীন বিশ্বাস হিসেবে প্রচলিত ছিল। আজও গ্রামীণ বাংলার অনেক স্থানে শীতলা দেবীর থান বা মন্দির দেখা যায়, যা তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে। এই প্রাচীন ঐতিহ্য বাংলার সামাজিক জীবনে স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভক্তির এক গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।
শীতলা দেবীকে নিয়ে প্রচলিত পুরাণ এবং লোককথাগুলি তাঁর রোগ মুক্তির দেবীর পরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করে। যদিও শীতলা দেবীর সুনির্দিষ্ট বৈদিক বা পৌরাণিক উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন, তবে তাঁর মহিমা নিয়ে অসংখ্য লোককথা ও কাহিনি প্রচলিত আছে।
একটি প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, একবার মহাদেব মানবজাতির উপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের বসন্ত রোগ দ্বারা আক্রান্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন মহাদেবের শরীর থেকে 'জ্বরাসুর' নামক এক দৈত্যের জন্ম হয়, যে মানবজাতিকে রোগাক্রান্ত করতে শুরু করে। এই সময়, দেবী শীতলা আবির্ভূত হন এবং জ্বরাসুরকে পরাজিত করে মানবজাতিকে রোগমুক্ত করেন। এই কাহিনিতে শীতলা দেবী রোগ নিরাময়কারী এবং ধ্বংসকারী উভয় রূপেই প্রকাশিত হন।
আরেকটি লোককথা অনুযায়ী, দেবী দুর্গার এক রূপ হলেন শীতলা। তিনি যখন মহিষাসুরকে বধ করার জন্য আবির্ভূত হন, তখন তাঁর শরীর থেকে যে উত্তাপ নির্গত হয়, তা বসন্ত রোগের সৃষ্টি করে। পরে তিনি নিজেই সেই রোগের নিরাময় করেন এবং 'শীতলা' নামে পরিচিত হন।
অনেক সময় শীতলা দেবীকে 'একান্ন পীঠ' এর সঙ্গেও যুক্ত করা হয়, যেখানে দেবীর ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে কিছু স্থানে তাঁর বিশেষ মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। তবে তাঁর প্রধান পরিচয় লোকদেবতা হিসেবেই। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দেবীকে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প প্রচলিত আছে, যা মূলত তাঁর রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা, ক্রোধ এবং করুণার দিকগুলি তুলে ধরে। এই সব কাহিনিতে দেবীর হাতে ঝাড়ু, কলস ও নিম পাতার ব্যবহার বারবার উল্লেখ করা হয়, যা তাঁর নিরাময়কারী সত্তার প্রতীক। এই লোককথাগুলিই একসময় সাধারণ মানুষের মনে শীতলা দেবীর প্রতি গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস জাগিয়ে তুলত এবং তাঁকে রোগ মুক্তির একমাত্র আশ্রয় হিসেবে দেখত।
শীতলা পূজা বাংলার এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত লোকায়ত উৎসব। এর আঞ্চলিকতা এবং পারিবারিক প্রথাগুলি এটিকে অন্যান্য পূজার থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। বাংলার বিভিন্ন জেলায় এবং এমনকি একই জেলার বিভিন্ন গ্রামেও শীতলা পূজার তিথি, আচার ও রীতিতে ভিন্নতা দেখা যায়।
সাধারণত চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী বা অষ্টমীতে, অথবা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী বা অষ্টমীতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথিগুলি 'শীতলা সপ্তমী' বা 'শীতলা অষ্টমী' নামে পরিচিত। অনেক পরিবারে বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে এই পূজা হয়, আবার কিছু পরিবারে বসন্ত রোগের প্রকোপ দেখা দিলেই এই পূজার আয়োজন করা হয়।
শীতলা পূজা মূলত মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত হয়। বাড়ির মহিলারা এই পূজার প্রধান কার্যাদি সম্পন্ন করেন। সকালে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে দেবীর পূজা করা হয়। এই পূজায় কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না, বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাই পূজার মন্ত্র পাঠ করেন এবং আচার পালন করেন। এটি পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত।
পূজার উপকরণও বেশ সরল। দেবীর মূর্তির বদলে অনেক সময় শুধুমাত্র একটি ঘটে শীতল জল, নিম পাতা এবং ফুল দিয়ে পূজা করা হয়। এই পূজায় কোনো পশুবলি বা উচ্চস্বরে মন্ত্র পাঠের রীতি নেই। বরং শান্ত ও ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে দেবীর আরাধনা করা হয়। বাংলার গ্রামেগঞ্জে এখনো মাটির শীতলা মন্দির বা 'শীতলা থান' দেখা যায়, যেখানে স্থানীয়রা একত্রিত হয়ে দেবীর পূজা করেন। শহরাঞ্চলে অনেক বাড়িতেই দেবীর ছোট মূর্তি বা ছবি রেখে পূজা করা হয়। এই আঞ্চলিকতা এবং পারিবারিক প্রথাগুলি শীতলা পূজাকে বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে, যা যুগ যুগ ধরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পারিবারিক মঙ্গল কামনার প্রতীক হয়ে রয়েছে।
শীতলা পূজার আচার ও সংস্কৃতি বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠেছে, যা অন্যান্য পূজার থেকে এটিকে আলাদা করে তোলে। এই পূজার মূল ধারণা হল শীতলতা এবং পবিত্রতা।
অগ্নিবিহীন পূজা ও শীতল ভোগ: শীতলা পূজার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে অগ্নি ব্যবহার করা হয় না। দেবীকে যে নৈবেদ্য বা ভোগ নিবেদন করা হয়, তা সম্পূর্ণ শীতল। সাধারণত আগের দিন রাতে রান্না করা খাবার, যেমন পান্তা ভাত, দই, চিঁড়ে, নারকেল, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি দেবীকে নিবেদন করা হয়। এই শীতল ভোগকে 'বাসি ভোগ' বা 'ঠান্ডা ভোগ' বলা হয়। এই প্রথা বসন্ত রোগের সময় শরীরকে শীতল রাখার গুরুত্বকে বোঝায়, কারণ বসন্ত রোগে জ্বর ও দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
নিম পাতার ব্যবহার: নিম পাতা শীতলা পূজার একটি অপরিহার্য উপকরণ। দেবীর মূর্তিতে বা ঘটে নিম পাতা রাখা হয় এবং পূজার সময় নিম ডাল দিয়ে জল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। নিম তার ঔষধি গুণাগুণের জন্য পরিচিত; এটি জীবাণুনাশক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। একসময় বসন্ত রোগীদের পাশে নিম পাতা রাখা হতো এবং নিম জল দিয়ে তাদের শরীর মুছে দেওয়া হতো। পূজায় নিম পাতার ব্যবহার এই প্রাচীন বিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: শীতলা পূজার সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বসন্ত রোগ ছোঁয়াচে হওয়ায়, এই রোগের সময় পরিচ্ছন্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি। পূজার আগে বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং পূজারিরা স্নান করে শুচি বস্ত্র পরিধান করেন। এটি রোগ প্রতিরোধের জন্য পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
জল ও শান্তি: পূজায় শীতল জল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দেবীর ঘটে শীতল জল রাখা হয় এবং পূজার পর সেই জল ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই জলকে 'শীতল জল' বা 'শান্তি জল' বলা হয়, যা রোগ নিরাময় এবং মনকে শান্ত করার প্রতীক। এই পূজার সামগ্রিক পরিবেশ থাকে শান্ত ও ভক্তিপূর্ণ, যেখানে রোগমুক্তির জন্য দেবীর কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করা হয়। এই আচারগুলি কেবল ধর্মীয় প্রথা নয়, বরং প্রাচীনকালে স্বাস্থ্যবিধি এবং মনস্তাত্ত্বিক শান্তির এক অনন্য সমন্বয় ছিল।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগে শীতলা পূজার প্রয়োজনীয়তা হয়তো কমেছে, কিন্তু একসময় এর মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা ছিল অপরিসীম। যখন বসন্ত, হাম বা কলেরা (যা ওলাবিবির সাথে সম্পর্কিত) এর মতো রোগগুলো মহামারীর আকার ধারণ করত, তখন মানুষের হাতে কোনো কার্যকর চিকিৎসা ছিল না। এই অবস্থায় মানুষ সম্পূর্ণরূপে অসহায় বোধ করত। শীতলা পূজা সেই অসহায়ত্বের মাঝে এক মানসিক আশ্রয়স্থল তৈরি করত।
আশা ও সান্ত্বনা: রোগাক্রান্ত পরিবারে যখন সবাই দিশেহারা, তখন শীতলা দেবীর আরাধনা তাদের মনে আশা জাগাত। এই বিশ্বাস যে একজন দেবী আছেন যিনি রোগ নিরাময় করতে পারেন, তা মানুষকে মানসিক শক্তি যোগাত। পূজার মাধ্যমে রোগ মুক্তির প্রার্থনা করে তারা এক ধরনের সান্ত্বনা খুঁজে পেত।
সামাজিক সংহতি: শীতলা পূজা প্রায়শই সম্মিলিতভাবে পালিত হতো, বিশেষ করে গ্রামের শীতলা থানে। এই সম্মিলিত আরাধনা সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি ও ঐক্য গড়ে তুলত। একসঙ্গে প্রার্থনা এবং আচার পালনের মাধ্যমে মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন পেত, যা মহামারীর কঠিন সময়ে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ: রোগের উপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, পূজার মাধ্যমে তারা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ অনুভব করত। পূজার আচার পালন, নৈবেদ্য নিবেদন এবং দেবীর কাছে প্রার্থনা করে তারা মনে করত যে তারা রোগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু একটা করছে। এটি তাদের মানসিক চাপ কমাতে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি যোগাতে সাহায্য করত।
স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রথাগত রূপ: যদিও এটি সরাসরি বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ছিল না, তবে পূজার কিছু আচার, যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিম পাতার ব্যবহার এবং শীতল খাবার গ্রহণ, পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করত। এই প্রথাগুলি মানুষকে পরিচ্ছন্ন থাকতে এবং রোগের সময় কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করত, যা একসময় অজ্ঞতার মাঝেও এক ধরনের সচেতনতা তৈরি করত। এভাবে শীতলা পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং এটি ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক ঢাল, যা মানুষকে ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি যোগাত।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির কারণে বসন্ত ও হামের মতো রোগগুলো এখন আর মহামারীর আকার ধারণ করে না। টিকাকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগগুলো প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। তবুও, বাংলার অনেক পরিবারে শীতলা পূজার ঐতিহ্য আজও অটুট আছে। আধুনিক সমাজে এই পূজার প্রাসঙ্গিকতা ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং লোকায়ত মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ: শীতলা পূজা বাংলার এক প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, লোকাচার এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারি। এটি একটি প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে লোকসংস্কৃতির ধারাকে প্রবাহিত করে।
পারিবারিক বন্ধন: অনেক পরিবারে এটি একটি বার্ষিক প্রথা হিসেবে পালিত হয়, যেখানে পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন। এটি পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করে এবং শিশুদের মধ্যে ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে। উৎসবের আমেজ পারিবারিক জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে।
প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা: শীতলা দেবীকে প্রকৃতির অংশ হিসেবেও দেখা হয়, যিনি রোগ ও আরোগ্য উভয়ই নিয়ন্ত্রণ করেন। এই পূজা প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক স্মারক হিসেবে কাজ করে। নিম পাতা ও শীতল জলের ব্যবহার প্রাকৃতিক নিরাময় পদ্ধতির প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসকে তুলে ধরে।
মনস্তাত্ত্বিক শান্তি: যদিও রোগের প্রকোপ কমেছে, তবুও অজানা রোগ বা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দুশ্চিন্তা মানুষের মনে থেকেই যায়। শীতলা পূজা এখনও অনেক মানুষের মনে মানসিক শান্তি এবং সুরক্ষার অনুভূতি প্রদান করে। এটি একটি বিশ্বাস, যা কঠিন সময়ে মানুষকে ভরসা যোগায়।
লোকায়ত জ্ঞানের প্রতি স্বীকৃতি: শীতলা পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করতেন। এটি লোকায়ত জ্ঞান এবং প্রাচীন স্বাস্থ্যচর্চার প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতি।
অতএব, যদিও শীতলা পূজার কার্যকারিতা আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে বিবেচিত নাও হতে পারে, তবুও এর সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব আধুনিক সমাজেও অনস্বীকার্য। এটি বাংলার ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং পারিবারিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত প্রতীক।
শীতলা পূজা মূলত বসন্ত, হাম, জ্বর এবং অন্যান্য চর্মরোগের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে এবং পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা কামনায় করা হয়। প্রাচীনকালে যখন চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত ছিল না, তখন এই পূজা ছিল রোগমুক্তির একমাত্র ভরসা।
শীতলা দেবীর হাতে সাধারণত একটি ঝাড়ু (রোগ তাড়ানোর প্রতীক), একটি কলস (শীতল জল বা আরোগ্যবাহী অমৃত) এবং কখনো কখনো নিম পাতা দেখা যায়। তিনি একটি গাধার পিঠে আরোহণ করে থাকেন।
শীতলা পূজা সাধারণত গ্রীষ্মকালে, বিশেষ করে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। অনেক অঞ্চলে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে এই পূজা পালিত হয়, যা 'শীতলা সপ্তমী' নামে পরিচিত।
শীতলা পূজার প্রধান নৈবেদ্য হলো শীতল ভোগ বা বাসি ভোগ। এতে আগের দিন রান্না করা পান্তা ভাত, দই, চিঁড়ে, নারকেল, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি দেবীকে নিবেদন করা হয়। এই পূজায় কোনো গরম বা অগ্নিতে প্রস্তুত খাবার দেওয়া হয় না।
শীতলা পূজায় অগ্নি ব্যবহার না করার কারণ হলো দেবীর শীতল প্রকৃতির সাথে এর সম্পর্ক। বসন্ত রোগে শরীর উচ্চ তাপমাত্রায় ভোগে, তাই দেবীকে শীতল ভোগ নিবেদন করে এবং অগ্নি পরিহার করে রোগীকে শীতলতা প্রদানের প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়।
শীতলা পূজা বাংলার এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও লোকায়ত ঐতিহ্যের অংশ। এই প্রাচীন আরাধনা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পারিবারিক বন্ধনের এক জীবন্ত দলিল। আরও জানতে ভিজিট করুন: পঞ্জিকা এবং আজকের বাংলা তারিখ।