🌟 ব্যক্তিত্ব · ২০ জুন ২০২৬, শনিবার
মাইলফলক দেখে ইংরেজি সংখ্যা শেখা গ্রামের ছেলেটি বদলে দিয়েছিলেন বাংলার সমাজ, ভাষা আর শিক্ষা। বর্ণপরিচয় থেকে বিধবা বিবাহ আইন, দয়ার সাগরের অদম্য জীবনকথা ও অজানা তথ্য — ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মদিনে বিশেষ নিবন্ধ।
মধুসূদন দত্ত তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন — এই মানুষটির আছে প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি, আর বাঙালি মায়ের হৃদয়। বাংলা তাঁকে চেনে দুটি নামে — 'বিদ্যাসাগর' আর 'দয়ার সাগর'; দুটিই উপাধি, দুটিই আক্ষরিক সত্য। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — যাঁর হাতে বাংলা শিশু আজও প্রথম অক্ষর চেনে, যাঁর জেদে সমাজ প্রথম বিধবার চোখের জল মুছল। এ বছর তাঁর ২০৬তম জন্মদিন ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার (৯ আশ্বিন ১৪৩৩)।
দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক গ্রাম্য বালক কীভাবে হয়ে উঠলেন উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের মেরুদণ্ড — সম্পূর্ণ কাহিনি রইল।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভগবতী দেবীর ঘরে জন্ম ঈশ্বরচন্দ্রের। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী — বাবার মাসিক আয় দশ টাকারও কম। আট বছর বয়সে বাবার হাত ধরে হেঁটে কলকাতা যাত্রা; প্রচলিত কাহিনি, পথের ধারের মাইলফলক দেখে দেখেই ছেলেটি ইংরেজি সংখ্যা শিখে ফেলেছিল — প্রতিভার এমন বিজ্ঞাপন বাংলার লোকস্মৃতি আজও ভোলেনি। কলকাতায় রাস্তার গ্যাসবাতির নিচে পড়া, নিজের হাতে রান্না, ছারপোকা-ভরা মেসবাড়ি — কষ্টের তালিকা দীর্ঘ; কিন্তু সংস্কৃত কলেজের বারো বছরে (ব্যাকরণ, কাব্য, অলংকার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়) প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম। ১৮৩৯-এ আইন পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিতে মিলল সেই উপাধি, যা আসল নামকেই ঢেকে দিল — 'বিদ্যাসাগর'।
মায়ের প্রতি তাঁর ভক্তি কিংবদন্তি — প্রচলিত কাহিনি, ভাইয়ের বিয়েতে মায়ের ডাক পেয়ে ছুটি না মেলায় চাকরির পরোয়া না করে রওনা, আর খেয়া না পেয়ে উত্তাল দামোদর সাঁতরে পার! ঘটনার ঐতিহাসিকতা নিয়ে তর্ক চলে, কিন্তু চরিত্রটি চেনাতে এর চেয়ে ভালো গল্প হয় না — যে মানুষ স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতরে মায়ের কাছে যায়, সে সমাজ-স্রোতের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে জানে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত, পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ — চাকরিজীবনের প্রতিটি ধাপে বিদ্যাসাগর ভেঙেছেন দেয়াল। সংস্কৃত কলেজের দরজা অব্রাহ্মণ ছাত্রদের জন্য খুলে দেওয়া তাঁরই সিদ্ধান্ত — সেকালে যা প্রায় বিপ্লব। ইউরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে সংস্কৃত শাস্ত্রের মেলবন্ধনে গড়লেন নতুন পাঠ্যক্রম।
আর ১৮৫৫-য় প্রকাশ করলেন সেই ছোট্ট বইটি, যা সম্ভবত বাংলা ভাষার সর্বাধিক মুদ্রিত গ্রন্থ — 'বর্ণপরিচয়'। স্বরে অ, স্বরে আ — দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি শিশুর প্রথম পাঠ; গোপাল-রাখালের সেই নীতিগল্পসহ। শুধু প্রাইমার নয় — বর্ণমালাকেই তিনি যুক্তিবদ্ধ পুনর্বিন্যাস দিলেন। তাঁর 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস' বাংলা গদ্যে আনল ছন্দ, যতিচিহ্ন, বাক্যের স্থাপত্য — রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী। রবীন্দ্রনাথের সেই মূল্যায়নের কথা পড়ুন এখানে।
উনিশ শতকের বাংলায় বালবিধবার জীবন ছিল মৃত্যুর চেয়েও নির্মম — আট-দশ বছরের মেয়ে স্বামী হারিয়ে আজীবন একাদশীর উপবাস, সাদা থান, সামাজিক মৃত্যু। বিদ্যাসাগর নামলেন শাস্ত্র হাতে — পরাশর সংহিতা থেকে দেখালেন, বিধবার পুনর্বিবাহে শাস্ত্রের সম্মতি আছে। ১৮৫৫-র তাঁর পুস্তিকা বাংলার ঘরে ঘরে আগুন জ্বালল — পক্ষে-বিপক্ষে ছাপা হলো শত শত পুস্তিকা, রক্ষণশীলরা দিলেন প্রাণনাশের হুমকি। হাজারো সইয়ের আবেদন গেল সরকারের কাছে; আর ১৮৫৬-র ২৬ জুলাই পাশ হলো হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন।
ওই বছরেরই ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম আইনি বিধবা বিবাহ — শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে কালীমতী দেবীর; খরচের সিংহভাগ বিদ্যাসাগরের পকেট থেকে। কথার মানুষ ছিলেন না — নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের বিয়ে দিলেন এক বিধবার সঙ্গেই। বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও চালালেন আজীবন অভিযান। সমাজ তাঁকে একঘরে করতে চেয়েছে, পথে অপমান করেছে — টলাতে পারেনি এক চুলও। বলতেন — লোকে কী বলবে ভেবে যদি কাজ বন্ধ রাখতাম, কিছুই করা হতো না।
নারীমুক্তির পথ যে শিক্ষা — বিদ্যাসাগর তা বুঝেছিলেন সবার আগে। বেথুন সাহেবের হিন্দু ফিমেল স্কুল প্রতিষ্ঠায় (১৮৪৯) তিনি ছিলেন প্রধান সহায় ও সম্পাদক; পরে স্কুল-পরিদর্শকের দায়িত্বে মাত্র কয়েক মাসে দক্ষিণবঙ্গে খুললেন পঁয়ত্রিশটিরও বেশি বালিকা বিদ্যালয় — অনেকগুলি নিজের খরচে চালিয়েছেন বছরের পর বছর। আর তাঁর মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (আজকের বিদ্যাসাগর কলেজ) ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ ভারতীয় পরিচালনা ও অর্থায়নে চলা কলেজ — প্রমাণ করল, উচ্চশিক্ষায় সাহেবের দাক্ষিণ্য অপরিহার্য নয়।
জীবনের শেষ প্রায় দুই দশক এই মহানাগরিক কাটালেন আশ্চর্য এক ঠিকানায় — বিহার-বাংলা সীমান্তের (অধুনা ঝাড়খণ্ড) কার্মাটাঁড়ে, সাঁওতাল জনপদে। কলকাতার 'সভ্য সমাজে' বীতশ্রদ্ধ মানুষটি সাঁওতালদের মধ্যে খুঁজে পেলেন অকৃত্রিম সততা; খুললেন স্কুল, রাতের ক্লাস, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা — নিজের হাতে। ১৮৯১-এর ২৯ জুলাই কলকাতায় প্রয়াণ; শোনা যায়, শবযাত্রায় নেমেছিল এমন জনস্রোত, যা শহর আগে কম দেখেছে।
বিদ্যাসাগরের কলম চলেছে তিন ভিন্ন ময়দানে, তিনটিতেই ইতিহাস গড়ে। শিক্ষামূলক — 'বর্ণপরিচয়' (দুই ভাগ), 'কথামালা' (ঈশপের নীতিগল্প), 'বোধোদয়', 'চরিতাবলী', 'আখ্যানমঞ্জরী' — প্রজন্মের পর প্রজন্মের নৈতিক-ভাষিক ভিত এই বইগুলিই; 'কথামালা'র সেই কচ্ছপ-খরগোশ আজও বাঙালির প্রথম গল্পসঙ্গী। সাহিত্য-অনুবাদ — 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', কালিদাসের 'শকুন্তলা', ভবভূতির 'সীতার বনবাস', শেক্সপিয়র-অবলম্বনে 'ভ্রান্তিবিলাস' — সংস্কৃত-ইংরেজি দুই ভাণ্ডার থেকেই বাংলা গদ্যে রত্ন-আমদানি; যতিচিহ্নের সুশৃঙ্খল প্রয়োগ আর বাক্যের ছন্দে তিনিই আধুনিক বাংলা গদ্যের প্রথম স্থপতি — রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বাংলা ভাষার প্রথম শিল্পী। সংস্কার-সাহিত্য — 'বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব' (দুই খণ্ড) ও 'বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না' — শাস্ত্রীয় প্রমাণ, ক্ষুরধার যুক্তি আর দরদি গদ্যের এই পুস্তিকাগুলি বাংলা মননশীল গদ্যেরও পথিকৃৎ। ছদ্মনামী রচনাও কম যায় না — 'কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য' নামে লেখা ব্যঙ্গে তিনি প্রতিপক্ষকে যে ভাষায় বিঁধেছেন, তাতে প্রমাণ — দয়ার সাগরের রসবোধও ছিল সাগরপ্রমাণ!
দুশো বছর পরেও বিদ্যাসাগর-চর্চার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু কমেনি — বরং বেড়েছে। যে-কোনো বাংলা মাধ্যম শিশুর প্রথম বই আজও তাঁর উত্তরাধিকার; কলকাতার বিদ্যাসাগর সেতু (দ্বিতীয় হুগলি সেতু) থেকে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (মেদিনীপুর), কলেজ স্ট্রিটের বিদ্যাসাগর কলেজ — নামের ভূগোলও বিস্তৃত। নারীশিক্ষা ও নারী-অধিকারের প্রতিটি আধুনিক পদক্ষেপের পূর্বসূরি তিনি — কন্যাশ্রী-যুগের বাংলার প্রতিটি স্কুলগামিনী মেয়ের ব্যাগে অদৃশ্য স্বাক্ষরটি বিদ্যাসাগরেরই। ২০১৯-এ কলকাতায় তাঁর মূর্তি-ভাঙচুরের ঘটনায় গোটা বাংলা যেভাবে গর্জে উঠেছিল, তা-ই প্রমাণ — এই নামটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের কতটা গভীরে। আর তাঁর জীবনের সবচেয়ে আধুনিক শিক্ষাটি বোধহয় এই — সংস্কার মানে শুধু আইন নয়, নিজের জীবনে তার প্রয়োগ; পুত্রের বিধবা-বিবাহ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন 'চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম'-এর বাংলা সংস্করণ। নবজাগরণের প্রতিষ্ঠান-ইতিহাস থেকে রবীন্দ্র-মূল্যায়ন — সবখানে তাঁর ছায়া; মধুসূদনের সেই তিন উপমার শেষটিই বোধহয় স্থায়ীতম — বাঙালি মায়ের হৃদয়; যত দিন বাংলা ভাষায় মমতা শব্দটি থাকবে, তত দিন বিদ্যাসাগরও থাকবেন।
বিদ্যাসাগরের মাপ বুঝতে সবচেয়ে ভালো আয়না তাঁর সমকালীনদের চোখ। ১৮৮২ সালের সেই বিখ্যাত সাক্ষাৎ — বাদুড়বাগানের বাড়িতে বিদ্যাসাগরের কাছে এলেন স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস; 'কথামৃতে' অমর সেই সংলাপ। ঠাকুর রসিকতা করে বললেন — এতদিন খাল-বিল দেখেছি, এবার সাগর দেখছি! বিদ্যাসাগরের বিনয়ী জবাব — তা নোনা জলই দেখলেন! ঠাকুরের উত্তর আরও গভীর — না গো, তুমি ক্ষীরসমুদ্র; বিদ্যার সঙ্গে যাঁর দয়া আছে, তিনি নোনা নন। ঈশ্বর-প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের সংশয়ী নীরবতাও ঠাকুর ছুঁয়েছিলেন স্নেহে — বলেছিলেন, তোমার কাজই তোমার পূজা। ধর্মসাধক ও মানবসেবকের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা উনিশ শতকের বাংলার শ্রেষ্ঠ দৃশ্যগুলির একটি। মাইকেল মধুসূদনের মূল্যায়ন তো প্রবাদ হয়ে গেছে — ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি, বাঙালি মায়ের হৃদয়; ঋণে ডোবা কবিকে ভার্সাই থেকে উদ্ধারের সেই কাহিনি বাঙালি কখনো ভুলবে না। আর রবীন্দ্রনাথ — 'বিদ্যাসাগরচরিত' প্রবন্ধে লিখলেন সেই ক্ষুরধার পঙ্ক্তি: বিদ্যাসাগরের প্রধান গৌরব তাঁর দয়া নয়, বিদ্যাও নয় — 'তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব'; কবির আক্ষেপ-মেশানো বিস্ময় — চল্লিশ কোটি (মতান্তরে সাড়ে সাত কোটি) বাঙালির মধ্যে ঈশ্বর কী করে একটি 'পুরো মানুষ' গড়লেন! বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও কম যাননি — সমকালীন ইংরেজ শিক্ষাকর্তাদের রিপোর্টে বারবার তাঁর অদম্য জেদ ও প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতি, সংঘাতের নথিও অবশ্য সমান — সাহেবের চেয়ারে পা তুলে বসার সেই কিংবদন্তি-প্রতিশোধের গল্প (হাফ-সত্য হোক বা পুরো!) বাঙালির আত্মমর্যাদার লোককথা হয়ে আছে। এত চোখের এত মূল্যায়নের যোগফল একটাই — উনিশ শতকের বাংলা যদি একটি মেরুদণ্ড পেয়ে থাকে, তার নাম ঈশ্বরচন্দ্র।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে। ২০২৬-এ তাঁর ২০৬তম জন্মজয়ন্তী পড়েছে ২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার।
সংস্কৃত কলেজের ছাত্র থাকাকালীন অসাধারণ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিতে ১৮৩৯ সালে তিনি 'বিদ্যাসাগর' উপাধি পান — যা পরে তাঁর নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।
বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রীয় যুক্তি ও নিরলস আন্দোলনের ফলে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাশ হয়; ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম আইনি বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।
১৮৫৫ সালে। প্রায় ১৭০ বছর ধরে এই প্রাইমার দিয়েই বাঙালি শিশুর অক্ষর-শিক্ষা শুরু হয়ে আসছে।
ঝাড়খণ্ডের কার্মাটাঁড়ে, সাঁওতাল জনপদে — সেখানে স্কুল ও দাতব্য চিকিৎসা চালিয়ে জীবনের শেষ প্রায় দুই দশক কাটান তিনি। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতায় তাঁর প্রয়াণ হয়।
নবজাগরণের আরও অধ্যায় — হিন্দু কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা পাতায়। পড়ুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দের জীবনকথা।
প্রচ্ছদ ছবি: Sufe, উইকিমিডিয়া কমন্স — CC BY-SA 4.0