🏛️ ইতিহাস · ১৭ জুন ২০২৬, বুধবার
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার। ভাষা আন্দোলনের সম্পূর্ণ ইতিহাস, শহিদ মিনারের জন্মকথা আর একুশ কীভাবে হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…" — পৃথিবীর খুব কম জাতির এমন গান আছে, যা গাইতে গাইতে আজও কোটি মানুষের চোখ ভিজে যায়। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালিই সেই জাতি, যারা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য বুকের রক্ত দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি — ৮ ফাল্গুন — ঢাকার রাজপথে ঝরেছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্ত; আর সেই রক্তের দামেই আজ ২১ ফেব্রুয়ারি সারা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ২০২৭-এ দিনটি পড়েছে রবিবার।
ভাষার জন্য শহাদাত — কীভাবে ঘটল ইতিহাসের এই অনন্য অধ্যায়? সম্পূর্ণ কাহিনি রইল।
দেশভাগে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের দুই ডানার মাঝে দূরত্ব হাজার মাইলের; আর মনের দূরত্ব আরও বেশি। রাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা — অথচ করাচির শাসকদের ঘোষণা: রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু, যা মাতৃভাষা মাত্র কয়েক শতাংশের! ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরে করাচির শিক্ষা সম্মেলনে উর্দু-একমাত্র নীতির প্রস্তাব উঠতেই ঢাকায় প্রতিবাদ শুরু; জন্ম নিল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাঁড়িয়ে দাবি তুললেন — বাংলাও হোক রাষ্ট্রের ভাষা; প্রস্তাব নাকচ হলো, কিন্তু ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক দাবিটি লেখা হয়ে গেল (এই মানুষটিকে ১৯৭১-এ পাকবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করবে)।
১৯৪৮-এর মার্চে ঢাকায় এসে খোদ মহম্মদ আলি জিন্না রেসকোর্স ও কার্জন হলের ভাষণে ঘোষণা করলেন — "উর্দু, এবং একমাত্র উর্দুই" হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। আর ইতিহাস সাক্ষী রইল অভূতপূর্ব দৃশ্যের — ছাত্রদের একাংশ মুখের ওপর প্রতিবাদ করে উঠল: "না, না!" কায়েদে আজমের মুখের ওপর 'না' — মাতৃভাষার প্রশ্নে বাঙালি সেদিনই জানিয়ে দিয়েছিল, এখানে আপস নেই।
১৯৫২-র ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ফের উর্দু-নীতি ঘোষণা করতেই আন্দোলন ফুঁসে উঠল; ডাক এল ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশজোড়া হরতালের। আতঙ্কিত সরকার ঢাকায় জারি করল ১৪৪ ধারা — জমায়েত নিষিদ্ধ। ২১ তারিখ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত — ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে; দশজন করে ছোট ছোট দলে রাষ্ট্রভাষার স্লোগানে এগোলেন ছাত্রছাত্রীরা। চলল লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, গ্রেপ্তার; আর বিকেলে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণের জমায়েতে পুলিশ চালাল গুলি।
শহিদ হলেন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম — ছাত্র, কেরানি, দিনমজুরের ছেলে; পরদিন শহিদ শফিউর রহমান-সহ আরও কয়েকজন। বরকত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র — মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের সন্তান; মাতৃভাষার শহিদের জন্মভিটে এই বাংলায়। ক্ষোভে ফেটে পড়ল গোটা পূর্ব বাংলা — অফিস-আদালত-রেল স্তব্ধ; জনতার মিছিলে গুলি চলল আরও।
আর ঘটল সেই অবিশ্বাস্য কীর্তি — ২৩ ফেব্রুয়ারির রাতারাতি, শহিদের রক্তভেজা জায়গায় মেডিক্যালের ছাত্ররা ইট-সিমেন্টে গড়ে তুললেন প্রথম শহিদ মিনার — বরকতের বাবার(মতান্তরে শহিদ-স্বজনের) হাতে উদ্বোধনের পরপরই যা গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ। ভাঙল বটে — কিন্তু ততদিনে মিনার উঠে গেছে কোটি হৃদয়ে। আজকের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার (শিল্পী হামিদুর রাহমানের নকশায়) সেই স্মৃতির মহাস্থাপত্য — মা যেন সন্তানদের নিয়ে দাঁড়িয়ে।
রক্ত বৃথা যায়নি। আন্দোলনের অদম্য চাপে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা স্বীকৃতি পেল পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। কিন্তু একুশ ততদিনে শুধু ভাষার দাবি নয় — বাঙালির আত্মপরিচয়ের জাগরণমন্ত্র। একুশের পথ বেয়েই এল ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ — ন'মাসের রক্তসমুদ্র পেরিয়ে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। ইতিহাসবিদরা তাই একবাক্যে বলেন — বাংলাদেশের জন্মের বীজ পোঁতা হয়েছিল বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে। ভাষার নামে দেশ — বাংলাদেশ — পৃথিবীতে সে অর্থে একটিই।
একুশের সংস্কৃতিও অনন্য — আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' (সুর: প্রথমে আবদুল লতিফ, পরে আলতাফ মাহমুদের অমর সুর), প্রভাতফেরির খালি পায়ের মিছিল, ফুলে ফুলে ঢাকা মিনার-বেদি, একুশে বইমেলা — শোক এখানে সৃষ্টির উৎসব।
১৯৯৮-এ কানাডা-প্রবাসী দুই বাঙালি — রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম — রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবকে চিঠি লিখলেন: একুশে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস করা হোক। বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলন সর্বসম্মতিতে ঘোষণা করল — ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস; পালন শুরু ২০০০ থেকে। ঢাকার রাজপথের রক্ত আজ পৃথিবীর সাত হাজার ভাষার অধিকার-সনদ — ইউনেস্কোর হিসাবে যার প্রায় অর্ধেকই বিপন্ন। একুশ তাই কেবল স্মৃতি নয়, সতর্কঘণ্টাও।
'ভাষা শহিদ' শব্দবন্ধের আড়ালের মানুষগুলিকে চেনা জরুরি — কারণ তাঁরা কেউই 'পেশাদার বিপ্লবী' ছিলেন না; ছিলেন আটপৌরে বাঙালি। আবুল বরকত — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমএ ছাত্র, মুর্শিদাবাদের ভরতপুর থেকে পড়তে-যাওয়া শান্ত ছেলেটি; মেডিক্যাল হোস্টেল-প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ। রফিকউদ্দিন আহমদ — মানিকগঞ্জের বাদামতলীর ছাপাখানা-মালিকের পুত্র; মাথায় গুলি — ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ বলে ধরা হয় তাঁকেই; বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, পকেটে ছিল পাত্রীর জন্য কেনা নাকছাবির স্মৃতিকথাও প্রচলিত। আবদুল জব্বার — ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের যুবক, অসুস্থ শাশুড়িকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করাতে এসে মিছিলের পাশে — গুলি তাঁকেও চেনেনি। আবদুস সালাম — ফেনীর যুবক, সরকারি দপ্তরের পিয়ন; গুলিবিদ্ধ হয়ে দেড় মাস যন্ত্রণার পর মৃত্যু। শফিউর রহমান — হুগলির কোন্নগরে জন্ম (আরেক শহিদের শিকড়ও এপার বাংলায়!), হাইকোর্টের কর্মী; ২২ ফেব্রুয়ারির মিছিলে শহিদ। এঁদের সঙ্গে অহিউল্লাহ নামের কিশোর-সহ আরও নাম আছে, যাঁদের পূর্ণ তালিকা আজও গবেষণার বিষয়। সাধারণের এই রক্তেই একুশের অসাধারণত্ব — ভাষার প্রশ্নে সেদিন ছাত্র-কেরানি-দোকানি সবাই এক মিছিলে।
একুশে ফেব্রুয়ারি সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র শোকদিবস, যার প্রধান স্মারক একটি বইমেলা! ঢাকার অমর একুশে গ্রন্থমেলা — বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মাসজুড়ে (১৯৭২-এ চিত্তরঞ্জন সাহার এক চাদরে-বই-বিছানো সূচনা থেকে আজ লক্ষ মানুষের মহোৎসব) — ভাষার শহিদদের স্মরণ হয় বইয়ের মধ্য দিয়ে; এর চেয়ে যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য আর কী হয়! একুশের ভোরের প্রভাতফেরি — খালি পায়ে, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গাইতে গাইতে শহিদ মিনারে ফুল — সম্মিলিত আবেগের এমন শৃঙ্খলা বিশ্বে তুলনাহীন; আলপনায় ঢেকে যায় ঢাকার রাজপথ, কালো ব্যাজে-সাদা-কালো পোশাকে শোকের নান্দনিকতা। বাংলা একাডেমি, একুশে পদক, ভাষা-গবেষণা — রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গোটা কাঠামো একুশেরই সন্তান। এপার বাংলাতেও একুশ এখন বড় সাংস্কৃতিক দিন — কলকাতা-শিলচর-ত্রিপুরায় প্রভাতফেরি ও ভাষা-শহিদ স্মরণ; পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তে দুই বাংলার মিলিত একুশ-উদ্যাপন হয়ে উঠেছে আবেগের বার্ষিক তীর্থ — কাঁটাতারের দু'পাশে এক মঞ্চ, এক গান। ভাষার প্রশ্নে বিভক্ত বাঙালির এই একদিনের মিলনই একুশের শ্রেষ্ঠ জয়।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা শিল্প-সাহিত্যে যে ফসল ফলিয়েছে, তা নিজেই এক সাহিত্য-আন্দোলন। সূচনা রক্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় — গুলির খবর পৌঁছনো মাত্র চট্টগ্রামে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' — রাতারাতি ছাপা, রাতারাতি নিষিদ্ধ, তবু মুখে মুখে বাহিত। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' প্রথমে আবদুল লতিফের সুরে, পরে আলতাফ মাহমুদের অমর সুরে হয়ে উঠল বাঙালির চিরকালীন এলিজি — স্রষ্টা আলতাফ নিজে ১৯৭১-এ পাকবাহিনীর হাতে নিখোঁজ শহিদ; গানটির প্রতিটি চরণে তাই দ্বিগুণ রক্তের দাগ। জহির রায়হানের উপন্যাস 'আরেক ফাল্গুন' একুশের প্রথম বড় কথাসাহিত্য, আর তাঁরই কালজয়ী চলচ্চিত্র 'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০) — স্বৈরশাসনের রূপকে এক পরিবারের গল্পে একুশের গান জুড়ে যে সাহস দেখিয়েছিলেন, তা বাংলা রাজনৈতিক সিনেমার মাইলফলক; জহিরও একাত্তরে নিখোঁজ — একুশের শিল্পীদের তালিকাটি নিজেই এক শহিদ মিনার। শামসুর রাহমানের 'বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা', আল মাহমুদের 'একুশের কবিতা', হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত নিষিদ্ধ সংকলন, মুর্তজা বশীরদের ছাপচিত্র, আমিনুল ইসলামের ক্যানভাস, শহিদ মিনারের স্থাপত্য-নন্দন — মাধ্যমের পর মাধ্যমে একুশ প্রসারিত। ওপার-এপার ভাগও এখানে অচল — কলকাতার কবি-শিল্পীরাও একুশ নিয়ে লিখেছেন নিরন্তর, আর 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' আজ যে-কোনো বাংলাভাষী জমায়েতের সমবেত সংগীত — টরন্টো থেকে ত্রিপুরা। ভাষার জন্য রক্তদান যেমন ইতিহাসে অনন্য, রক্ত থেকে এত শিল্পের জন্মও তেমনি — একুশ প্রমাণ, বুলেট বর্ণমালাকে হারাতে পারে না; বরং প্রতিটি গুলি এক-একটি নতুন অক্ষর হয়ে ফেরে।
১৯৪৭-৫২ সালে পূর্ব বাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন — যার চূড়ান্ত পর্বে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্র-যুবকরা শহিদ হন।
১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ হন আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ ও আবদুল জব্বার; ২২ ফেব্রুয়ারি শফিউর রহমান-সহ আরও কয়েকজন। তাঁরাই ইতিহাসের প্রথম ভাষা শহিদ হিসেবে স্মরণীয়।
আন্দোলনের চাপে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কানাডা-প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে; ২০০০ সাল থেকে তা বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের নকশা শিল্পী হামিদুর রাহমানের (ভাস্কর নভেরা আহমেদের সহযোগিতার কথাও স্মরণীয়) — মা ও সন্তানদের প্রতীকী স্থাপত্য। ১৯৫২-র প্রথম অস্থায়ী মিনারটি ছাত্ররা রাতারাতি গড়েছিলেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের পরের অধ্যায় — মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও বিজয় দিবস। পড়ুন বাংলা সনের ইতিহাস ও বঙ্গভঙ্গের কাহিনি।
প্রচ্ছদ ছবি: Biswarup Ganguly, উইকিমিডিয়া কমন্স — CC BY 3.0