🌟 ব্যক্তিত্ব · ১৭ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার
বাংলা সাহিত্যাকাশে হাসির রাজা ও 'ননসেন্স' ধারার রূপকার সুকুমার রায়ের জীবন, অনন্য সৃষ্টিশীলতা, 'সন্দেশ' পত্রিকার সোনালী দিন এবং কালজয়ী অবদানের এক বিস্তৃত ও আবেগঘনা ইতিহাস।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যা উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপার শৈশব, বাঁধভাঙা আনন্দ আর কল্পনার এক জাদুকরী জগৎ। সেই নক্ষত্রমণ্ডলীর মাঝে একেবারে আলাদা উজ্জ্বলতায় ভাস্বর হয়ে আছেন সুকুমার রায় (১৮৮৭ – ১৯২৩)। তিনি শুধু বাংলা ছড়া বা শিশুসাহিত্যের লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন 'ননসেন্স সাহিত্য' (Nonsense Literature)-এর একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট, প্রচ্ছদশিল্পী, চিত্রগ্রাহক, মুদ্রণবিদ এবং প্রগতিশীল চিন্তাবিদ।
বিশ্বসাহিত্যে লুইস ক্যারল বা এডওয়ার্ড লিয়ার যেভাবে ননসেন্স ধারার ভিত গড়েছিলেন, সুকুমার রায় বাংলা ভাষায় সেই ধারায় এনেছিলেন এক অনন্য স্বদেশী গন্ধ ও বাঙালি জীবনের চিরন্তন আমেজ। 'আবোল তাবোল', 'হজবরল', 'পাগলা দাশু', 'খাই-খাই', 'চলচিত্তচঞ্চরী' কিংবা 'লক্ষ্মণের শক্তিশেল'-এর মাধ্যমে তিনি যে অনাবিল হাস্যরসের সৃষ্টি করেছেন, তার সমতুল্য সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। মাত্র ৩৫ বছরের এক স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবনে তিনি বাঙালির মনোজগতে যে ছাপ রেখে গেছেন, তা একশো বছর পার হয়েও আজও ততটাই তাজা, ততটাই প্রাসঙ্গিক।
সুকুমার রায়ের জন্ম ৩০শে অক্টোবর, ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে (১৪ই কার্তিক, ১২৯৪ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বিখ্যাত রায় পরিবারে। পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী, বেহালাবাদক, সুরকার এবং ভারতের আধুনিক মুদ্রণ শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রখ্যাত সংস্কারক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা।
রায়পরিবারের পরিবেশটিই ছিল শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র। কিশোর বয়স থেকেই সুকুমার পরিবেশের এই সাংস্কৃতিক আবহ লাভ করেছিলেন। পিতৃদেব উপেন্দ্রকিশোর স্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক মুদ্রণ সংস্থা 'ইউ. রায় অ্যান্ড সনস' (U. Ray & Sons)। বাড়ি ভরতি ছিল দেশ-বিদেশের বই, ক্যামেরা, ছবি আঁকার সরঞ্জাম এবং নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি।
কলকাতার ১৩ নম্বর গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়িতে শৈশব থেকেই সুকুমার রায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফু্ল্লচন্দ্র রায়ের মতো মহীরূহদের নিয়মিত যাতায়াত। এই পরিবেশই সুকুমারের মধ্যে রোপণ করে দিয়েছিল সূক্ষ্ম রসিকতা, প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বীজ।
সুকুমার রায়ের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি কলকাতার সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। এরপর প্রবেশ করেন মর্যাদাপূর্ণ প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯০৬ সালে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে ডাবল অনার্সসহ বি.এসসি পাস করেন সুকুমার। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগে কোনো ভাঁটা পড়েনি;
১৯১১ সালে মুদ্রণ প্রযুক্তি (Photolithography and Photo-engraving) এবং আলোকচিত্রে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ড গমন করেন। লন্ডনের কাউন্টি কাউন্সিল স্কুল অফ ফটোএনগ্রেভিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফিতে ভর্তি হয়ে তিনি আধুনিক মুদ্রণ পদ্ধতির সূক্ষ্মতম কৌশলগুলি আয়ত্ত করেন। সেখানেও তাঁর প্রতিভা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কেমব্রিজ ওয়েলচ চার্চে রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে তিনি প্রবাসীদের মুগ্ধ করেছিলেন।
১৯১৩ সালে ইংল্যান্ডের 'রয়েল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি'-র ফেলোশিপ (FRPS) লাভ করেন সুকুমার রায়। তৎকালীন সময়ে কোনো ভারতীয়ের জন্য এই অর্জন ছিল অত্যন্ত বিরল সম্মান। বিলেতের শিক্ষা শেষ করে ১৯১৩ সালের শেষের দিকে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পিতার ছাপাখানার কাজ আধুনিকীকরণ করার দায়িত্ব নেন।
বিলাত থেকে ফিরে এসে সুকুমার রায় গঠন করেন এক অদ্ভুত ও অনন্য ক্লাব, যার নাম ছিল 'মণ্ডে ক্লাব' (Monday Club)। সোমবার করে এই ক্লাবের বৈঠক বসত বলে এমন নাম। কিন্তু সুকুমারের রসিক মন এটিকে বলত 'মণ্ডে ক্লাব' (অর্থাৎ মন ঢেলে আড্ডা দেওয়ার ক্লাব)।
এই ক্লাবের নিয়মকানুন ও সংবিধানেও ছড়িয়ে থাকত সুকুমারের উদ্ভাবনী হাস্যরস। ক্লাবের সভ্যদের মধ্যে ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, প্রভাতচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, সীতানাথ তত্ত্বভূষণ, অতুলপ্রসাদ সেন, এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মাঝে মাঝে এখানে এসে আড্ডায় যোগ দিতেন। ক্লাবের কার্ডে সুকুমার লিখেছিলেন নানা মজার ছড়া:
"আজকে রাতে সভার মাঝে আসবে যারা আসবে ধেয়ে,
নতুন কৌতুক দেখবে তারা নতুন গান শুনবে চেয়ে..."
এই ক্লাবটি ছিল কেবল আড্ডার জায়গা নয়; তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নতুন নতুন চিন্তা, রসাত্মক উন্মেষ এবং সাহিত্য চর্চার এক উর্বর ক্ষেত্র।
১৯১৩ সালের মে মাসে (বৈশাখ ১৩২০ বঙ্গাব্দ) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছোটদের জন্য প্রকাশ করেন কালজয়ী পত্রিকা 'সন্দেশ'। পত্রিকার নামকরণেই ছিল মিষ্টি ও বার্তার সুন্দর মিলবন্ধন। কিন্তু ১৯১৫ সালে মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোর অকালে প্রয়াত হলে সন্দেশ পত্রিকার ওপর গভীর অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ে।
সেই সংকটময় মুহূর্তে সন্দেশ-এর হাল ধরেন তরুণ সুকুমার রায় এবং তাঁর কনিষ্ঠ ভাই সুবিনয় রায়। সুকুমার সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদক, প্রধান লেখক, চিত্রশিল্পী এবং ছাপাখানার ব্যবস্থাপকের ভূমিকা এক হাতে সামলাতে শুরু করেন। সুকুমারের ছোঁয়ায় সন্দেশ পত্রিকা কেবল একটি শিশুপত্রিকা রইল না, তা হয়ে উঠল বাঙালি শৈশবের আনন্দের এক স্বর্গরাজ্য।
সুকুমার রায়ের জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলির সিংহভাগই প্রকাশিত হয়েছিল এই সন্দেশ পত্রিকার পাতায়। বিজ্ঞানবিষয়ক সহজবোধ্য প্রবন্ধ, ছড়া, গল্প, নাটক এবং অদ্ভুত সব নকশা দিয়ে তিনি পত্রিকাটিকে তৎকালীন বাংলার সর্বাধিক জনপ্রিয় পত্রিকায় পরিণত করেন।
সুকুমার রায়ের সাহিত্যকর্ম কেবল শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক নয়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রগাঢ় মানবদর্শন, সামাজিক বিদ্রূপ এবং অতুলনীয় ভাষা-কারুকার্য। তাঁর কয়েকটি কালজয়ী সৃষ্টি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা যাক:
১৯২৩ সালে প্রকাশিত 'আবোল তাবোল' ছড়ার বই বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। ৫৩টি ছড়া ও অসাধারণ সব রেখাচিত্রে সাজানো এই বইটি আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন মনে হলেও, এর প্রতিটি লাইনে লুকানো আছে নিখাদ আনন্দ ও তীক্ষ্ণ সামাজিক পর্যবেক্ষণ।
'খিচুড়ি' ছড়ায় যখন দেখা যায় হাস আর সজারু মিলে তৈরি হয় 'হাসজারু', কিংবা বক আর কচ্ছপ মিলে 'বকচ্ছপ', তখন তা শুধু কল্পনার ফানুস ওড়ায় না, বরং সমাজব্যবস্থার নানা অবাস্তব মিলনকে বিদ্রূপ করে। 'কাঠবুড়ো', 'প্যাঁচা আর প্যাঁচানী', 'হুঁকোমুখো হ্যাঁংলা', 'বোম্বাগড়ের রাজা' চরিত্রগুলি বাঙালির জাতীয় স্মৃতিতে চিরকালের মতো গেঁথে গেছে।
'হজবরল' হলো বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ ননসেন্স উপন্যাস। একটি সাত বছরের ছেলের স্বপ্নে দেখা এক অদ্ভুত জগতের গল্প এটি। সেখানে রুমাল হয়ে যায় বিড়াল, তক্ষক হয়ে যায় শ্রীশ্রী উডোশ্যাঁপ্সু, আর দাঁড়কাক 'শ্রীকাককেশ্বর কুচকুচে' হিসেব করে বয়স আর দণ্ড-পলের।
হজবরলের মধ্যে আদালতের যে প্রহসনমূলক বিচারপ্রক্রিয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বের যে কোনো শ্রেষ্ঠ রূপক সাহিত্যের পাশে বসার যোগ্য। হিজিবিজবিজের অকারণ হাসি, শ্রী ব্যাকরণ শিং বি.এ.-র গান, আর গেছো দাদার ঠিকানা খোঁজার পালা—সব মিলিয়ে হজবরল এক চিরন্তন হাসির ঝরনা।
'পাগলা দাশু' চরিত্রটির মাধ্যমে সুকুমার রায় স্কুলের ছেলেদের দুষ্টুমি, খামখেয়ালিপনা কিন্তু নির্ভেজাল সত্যবাদিতাকে তুলে ধরেছেন। দাশুর বিচিত্র কাণ্ডকারখানা কেবল হাসায় না, তার ভেতরকার এক অদ্ভুত সরলতা পাঠককে মুগ্ধ করে। এছাড়া 'দাশু', 'পটু', 'জগবন্ধু'-র মতো চরিত্রগুলি বাংলা রূপকথার বাইরে গিয়ে স্কুলজীবনের বাস্তব ও মজার দিক ফুটিয়ে তুলেছিল।
সুকুমারের লেখা নাটক 'চলচিত্তচঞ্চরী' এবং 'লক্ষ্মণের শক্তিশেল' বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক নতুন স্বাদ এনেছিল। পৌরাণিক চরিত্রদের আধুনিক বাঙালি ভঙ্গিতে উপস্থাপন করে যে হাস্যরস তিনি তৈরি করেছিলেন, তার তুলনা তিনি নিজেই।
অনেক সাহিত্য সমালোচক মনে করেন, সুকুমার রায়ের ননসেন্স ছড়াগুলি আসলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কার এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিরুদ্ধে এক সূক্ষ্ম প্রতিরোধ।
"শিবঠাকুরের আপন দেশে,
আইন কানুন সর্বনেশে!
যদি কেউ পিছলে পড়ে,
তাকেই ধরে জেলখানাতে পোড়ে।"
এটি ছিল তৎকালীন পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সরকারের তৈরি নানাবিধ বৈষম্যমূলক ও দমনমূলক আইনের প্রতি এক তীব্র ও রূপক বিদ্রূপ।
সুকুমার রায় কেবল ছড়া বা গল্প লেখেননি, নিজের প্রতিটি চরিত্রের চিত্র রূপায়ণ তিনি নিজেই করে গেছেন। তাঁর আঁকা ছবিগুলি বাদ দিলে তাঁর ছড়া বা গল্প যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ইংল্যান্ড থেকে প্রাপ্ত আধুনিক হাফটোন ও লিথোগ্রাফির কারিগরি জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি কাঠের ব্লক ও কালির আঁচড়ে যে চরিত্রগুলি এঁকেছেন, তার শৈলী ছিল একবারে নিজস্ব। 'কুমড়োপটাশ'-এর ভারী শরীর, 'হুঁকোমুখো হ্যাঁংলা'-র বিষণ্ণ মুখ, কিংবা 'ট্যাঁশ ন্যান্দাই' পাখির কিম্ভূত রূপ—প্রতিটি রেখাচিত্রে ফুটে উঠেছে এক আশ্চর্য দূরদর্শিতা ও কার্টুন শিল্পকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
সুকুমার রায়ের জীবন প্রদীপ অত্যন্ত অল্প বয়সেই নিভে গিয়েছিল। ১৯২১ সালে তিনি মারাত্মক 'কালাজ্বর' (Blackwater Fever)-এ আক্রান্ত হন। তৎকালীন সময়ে এই রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন ছিল। প্রায় দুই বছর তিনি রোগশয্যায় ছিলেন।
কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো, মারাত্মক শারীরিক যন্ত্রণা ও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর কলম থেকে কোনো বিষাদময় বা করুণ সুর বের হয়নি। রোগশয্যায় শুয়েই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি 'আবোল তাবোল'-এর অধিকাংশ ছড়া এবং আঁকছিলেন ছবি।
১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর (২৩শে ভাদ্র, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে রোগশয্যায় শুয়ে তিনি আবোল তাবোলের শেষ ছড়াটি লিখেছিলেন, যা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আবেগঘন সৃষ্টি:
"আদিমকালের পাঁদেও লোক
ছাদিম ঘেরে বাঁধলো চোখ,
ঘোরলাগা ওই গান শুনেছিস
ঘুমপাড়ানী মাসীর থোকে..."
ছড়াটির শেষ কয়েকটি লাইন ছিল তাঁর জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক হাসিমুখের স্বীকারোক্তি:
"ঘনিয়ে এলো ঘুমের ঘোর,
গানের সুর যে হলো ভোর;
'আবোল তাবোল' গান গেয়েছিস,
এবার তবে সাঙ্গ কর।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুকুমারের অকালপ্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত হয়ে লিখেছিলেন, "সুকুমারের মতো সাহিত্যিক আমি বাংলায় আর দেখিনি। তাঁর যে হাস্যরস, তা শুধু বিনোদন নয়, তা মনের স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনে।"
সুকুমার রায়ের প্রয়াণের সময় তাঁর একমাত্র পুত্র সত্যজিৎ রায়ের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর চার মাস। পিতাকে সান্নিধ্য হিসেবে না পেলেও, সুকুমারের রেখে যাওয়া সাহিত্য, শিল্পচেতনা এবং 'সন্দেশ' পত্রিকার আদর্শ সত্যজিতের রক্তের কণিকায় প্রবাহিত হয়েছিল।
পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশ্ববরণ্যে ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং ১৯৬১ সালে পিতার স্মৃতিবিজড়িত 'সন্দেশ' পত্রিকাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। সত্যজিৎ তাঁর পিতাকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও (Documentary on Sukumar Ray) নির্মাণ করেছিলেন, যা সুকুমার রায়ের জীবনের এক অপূর্ব প্রামাণ্য দলিল।
বাঙালির জীবনের প্রতিটি উৎসবে, পয়লা বৈশাখের নববর্ষের আড্ডায়, দুর্গা পূজা বা কালী পূজার বার্ষিক সংখ্যায় এবং ছোটদের যেকোনো সাংস্কৃতিক পঞ্জিকায় সুকুমার রায় এক আবশ্যিক উপস্থিতি।
পঞ্জিকার পাতায় কার্তিক মাসের সূচনা বা ভাদ্রের শেষ বিদায়ে বাঙালি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ তিথি। বাঙালির ছোটবেলার হাতেখড়ি যেমন বর্ণপরিচয়ে হয়, তেমনি কল্পনার জগতে হাতেখড়ি হয় সুকুমার রায়ের 'আটি চুটি' ছড়া ও 'আবোল তাবোল'-এর পাতায়।
উৎসবের দিনগুলিতে, পঞ্জিকা দেখে গৃহস্থ যখন আনন্দের দিনক্ষণ গোনে, তখন পারিবারিক সাহিত্যপাঠে বা ছোটদের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় আজও প্রথম পছন্দ সুকুমারের ছড়া। তাঁর সাহিত্য বাঙালির পারিবারিক মিলনমেলাকে আজও নতুন হাসির খোরাক জোগায়।
সুকুমার রায় ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক কালজয়ী প্রতিভা। তিনি ছোটদের জন্য লিখেছেন, কিন্তু বড়দের চিন্তার খোরাক জোগাতেও পিছপা হননি। তাঁর হাস্যরসের মধ্যে কোনো তিক্ততা বা হিংসা ছিল না; ছিল এক গভীর প্রীতি, বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পের বিশুদ্ধতা।
আজকের ডিজিটাল যুগেও, যখন মানুষ মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত, তখনও সুকুমার রায়ের 'হজবরল'-র গল্প বা 'আবোল তাবোল'-এর লাইনগুলি বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। শতবর্ষ অতিক্রম করেও সুকুমার রায় বাঙালি হৃদয়ে অমলিন, অম্লান এবং চিরকালের মতো জীবন্ত।
উত্তর: সুকুমার রায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বই হলো ছড়ার সংকলন 'আবোল তাবোল'। এটি তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৯ দিন পর, ১৯২৩ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল।
উত্তর: সুকুমার রায় হলেন বিশ্ববরণ্যে চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের পিতা। সত্যজিতের মাত্র আড়াই বছর বয়সে সুকুমার রায় প্রয়াত হন।
উত্তর: 'মণ্ডে ক্লাব' ছিল সুকুমার রায় ও তাঁর সুধী বন্ধুদের একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আড্ডার কেন্দ্র। সেখানে সাহিত্যচর্চা, বিজ্ঞান আলোচনা, কৌতুক এবং নতুন চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটানো হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই ক্লাবের সভায় অংশ নিয়েছিলেন।
উত্তর: সুকুমার রায় ১৯১১ সালে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন মুদ্রণ প্রযুক্তি (Photolithography and Photo-engraving) এবং আলোকচিত্র (Photography) বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেখানে তিনি কৃতিত্বের সাথে ফেলোশিপ (FRPS) অর্জন করেন।