🌟 ব্যক্তিত্ব · ১৮ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার
চলচ্চিত্র পরিচালক, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও সুরকার—সত্যজিৎ রায়ের অনন্য সৃষ্টিশীলতা কীভাবে বিশ্বমঞ্চে বাংলা সংস্কৃতিকে চিরস্থায়ী আসন এনে দিয়েছিল, জানুন সেই মহাকাব্যিক জীবনকথা।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে গুটিকয়েক নাম শাশ্বত ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন সত্যজিৎ রায়। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে বিশ্বমানের সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, সুরকার, প্রচ্ছদশিল্পী, টাইপোগ্রাফার এবং সর্বোপরি বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বিশ্বমঞ্চে বাঙালির মেধা, নান্দনিকতা ও বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকরশ্মি ছড়িয়েছিলেন যিনি, তিনি এই সত্যজিৎ রায়। 'পথের পাঁচালী'র অপুর অপলক চোখে দুর্গার হাত ধরে কাশবন পেরিয়ে দূরন্ত রেলগাড়ি দেখার আকুলতা থেকে শুরু করে 'হীরক রাজার দেশে'র মাধ্যমে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রূপক প্রতিবাদ—সত্যজিতের সেলুলয়েড ক্যানভাস বাঙালির চেতনাকে নতুন রূপ দিয়েছিল।
১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার ১৩ নম্বর গরপার রোডের ঐতিহাসিক বাড়িতে সত্যজিৎ রায়ের জন্ম। তাঁর রক্তেই প্রবাহিত হচ্ছিল বাঙালির নবজাগরণের (Bengal Renaissance) প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার ধারা। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একাধারে শিশুসাহিত্যিক, প্রচ্ছদশিল্পী, সং সং সং সংগ্রাহক, হাফটোন ব্লকের পথিকৃৎ এবং বিখ্যাত 'ইউ রায় অ্যান্ড সন্স' প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা। আর তাঁর পিতা সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা ননসেন্স ছড়া ও 'আবোল তাবোল'-এর স্রষ্টা।
মাত্র আড়াই বছর বয়সে সত্যজিৎ তাঁর পিতা সুকুমার রায়কে হারান। মা সুপ্রভা দেবী অত্যন্ত কষ্ট করে একমাত্র সন্তানকে লালন-পালন করেন। মামাবাড়ির সাহিত্য ও সংগীতের আবহাওয়ায় সত্যজিতের বাল্যকাল কাটে। তিনি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে অর্থনীতি নিয়ে বি.এ পাস করলেও তাঁর ঝোঁক ছিল মূলত শিল্পকলা, পাশ্চাত্য সংগীত ও বিশ্বচলচ্চিত্রের প্রতি।
মায়ের ইচ্ছায় ১৯৪০ সালে সত্যজিৎ পাড়ি জমান শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের 'বিশ্বভারতী'তে। সেখানে কলাভবনে তিনি শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার দুই মহারথী—নন্দলাল বসু এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের। শান্তিনিকেতনের ধ্রুপদী পরিবেশ, প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার শক্তি এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পের মেলবন্ধন সত্যজিতের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চিরদিনের জন্য গড়ে দিয়েছিল।
"শান্তিনিকেতন আমাকে আমার নিজের দেশের শিল্প ঐতিহ্যকে বুঝতে শিখিয়েছিল, একই সঙ্গে শিখিয়েছিল প্রকৃতির দিকে গভীর দৃষ্টি মেলতে।" — সত্যজিৎ রায়
শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ফিরে ১৯৪৩ সালে সত্যজিৎ রায় ক্যালিগ্রাফার ও ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা 'ডি জে কিমার'-এ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেখানে জুনিয়র আর্ট ডিরেক্টর পদ লাভ করেন। এই সময় তিনি গ্রন্থ প্রচ্ছদ ও অলংকরণের কাজেও বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। ডি কে গুপ্তের 'সিগনেট প্রেস'-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি একের পর এক কালজয়ী বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকেন। এই কাজ করার সময়ই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'-র ছোটদের সংস্করণ 'আম আঁটির ভেঁপু'-র জন্য ছবি আঁকার দায়িত্ব আসে তাঁর ওপর। উপন্যাসটি বারবার পড়তে গিয়ে সত্যজিতের মনে প্রথম চলচ্চিত্র বানানোর স্বপ্ন অঙ্কুরিত হয়।
১৯৪৭ সালে তিনি চদানন্দ দাশগুপ্ত ও অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন 'কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি'। সেখানে বিশ্বখ্যাত পরিচালকদের ছবি দেখার সুযোগ হয়। এরপর ১৯৫০ সালে ডি জে কিমার কোম্পানির কাজে সত্যজিৎ বিলেত (লন্ডন) যান। সেই ছয় মাসের প্রবাসী জীবনে তিনি প্রায় ১০০টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র দেখেন। এর মধ্যে ইতালীয় পরিচালক ভিত্তোরিও দে সিকার 'বাইসাইকেল থিভস' (Bicycle Thieves) চলচ্চিত্রটি তাঁর চোখ খুলে দেয়। পেশাদার অভিনেতা ছাড়া, স্টুডিওর বাইরে খোলা আকাশে বাস্তবসম্মতভাবে সিনেমা তৈরির যে ধারা (Neo-realism), তা সত্যজিৎকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। বিলেত থেকে ভারতে ফেরার জাহাজেই তিনি খসড়া চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলেন 'পথের পাঁচালী'র।
সিনেমা বানানোর পথ সত্যজিতের জন্য একেবারেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। প্রযোজক খুঁজে না পেয়ে তিনি নিজের জমানো টাকা, বিমার পলিসি ও প্রচ্ছদ এঁকে উপার্জিত অর্থ ঢালতে শুরু করেন। অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আর্থিক সাহায্যে ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় 'পথের পাঁচালী'। অপু আর দুর্গার গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন আনন্দ-বেদনা, হরিহর ও সর্বজয়ার সংসার সংগ্রাম এবং পিসি ইন্দির ঠাকরুণের অমলিন চরিত্র চিত্রণে তৈরি এই সিনেমা ইতিহাস সৃষ্টি করে।
১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের বিখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসবে (Cannes Film Festival) 'পথের পাঁচালী' শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল (Best Human Document) হিসেবে পুরস্কৃত হয়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতে তোলপাড় পড়ে যায়। আকিরো কুৰোশাওয়া, জঁ রেনোয়ারের মতো বিশ্ববরেণ্য পরিচালকেরা সত্যজিতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। বাংলা চলচ্চিত্র একলফে আঞ্চলিকতার সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের আসন পাকা করে নেয়।
এর পর একে একে সত্যজিৎ তৈরি করেন 'অপরাজিত' (১৯৫৬) এবং 'অপুর সংসার' (১৯৫৯)। এই তিনটি চলচ্চিত্র একত্রে 'অপু ট্রিলজি' (The Apu Trilogy) নামে বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক অমর মহাকাব্যিক স্থান লাভ করে। গ্রামের শৈশব থেকে শহরের কর্মজীবন এবং ভালোবাসার বিচ্ছেদ পেরিয়ে জীবনের জয়গান গাওয়ার এই পথচলা বিশ্ব চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে সর্বকালের সেরা ট্রিলজিগুলির একটি।
সত্যজিৎ রায় কখনোই নিজেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে বাঙালি সমাজের ইতিহাস, পারিবারিক মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি, এবং সামাজিক রূপান্তর প্রতিফলিত হয়েছে অসামান্য দক্ষতায়।
চলচ্চিত্রের বাইরেও সাহিত্যিক হিসেবে সত্যজিৎ রায় বাঙালির হৃদয় জয় করেছেন। ১৯৬১ সালে তিনি তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক শিশু পত্রিকা 'সন্দেশ'-এর পুনরুজ্জীবন ঘটান। সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদনার পাশাপাশি ছোটদের জন্য তিনি একের পর এক অবিশ্বাস্য উপন্যাস ও গল্প লিখতে শুরু করেন।
বাঙালির গোয়েন্দা সাহচর্যে 'ফেলুদা' এক চিরসবুজ নাম। সিআইডি বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ধাঁচ থেকে বেরিয়ে এসে তোপসে ও লালমোহন গাঙ্গুলীকে (জটায়ু) সঙ্গে নিয়ে ফেলুদার মগজাস্ত্রে রহস্য উদঘাটন বাঙালির মন জয় করে নেয়। 'সোনার কেল্লা', 'জয় বাবা ফেলুনাথ', 'বম্বাইয়ের বোম্বেটে'-র মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলো কেবল সাহিত্যেই নয়, রূপোলি পর্দাতেও সত্যজিতের পরিচালনায় অনন্য স্থান লাভ করে।
বাংলা কল্পবিজ্ঞান (Science Fiction) সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান প্রফেসর শঙ্কু। গিরিডির ল্যাবরেটরিতে তাঁর উদ্ভাবিত অদ্ভুত সব যন্ত্র—'অ্যানিহিলেশন গান', 'মিরাকিউরাল', 'সোমনোলিন' এবং তাঁর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী বন্ধুদের নিয়ে রচিত ডায়েরির গল্পগুলো কিশোরদের মনোজগতে বিজ্ঞানের জাদুকরী দুয়ার খুলে দেয়।
এছাড়া তাঁর লেখা ভৌতিক গল্প, রম্যরচনা এবং শিকুয়ালা বা তারাসুন্দরীর মতো বিচিত্র চরিত্রের ছোটগল্পগুলো বাংলা ছোটগল্পের সম্পদ। প্রতি বছর পুজোবার্ষিকী পঞ্জিকা ও শারদীয় সন্দেশে সত্যজিতের নতুন গল্প ও প্রচ্ছদ দেখার জন্য বাঙালি পাঠক ব্যাকুল হয়ে থাকত।
সত্যজিতের চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ দিক ছিল সুরসংযোজন। প্রাথমিক দিকে পন্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ বিলায়ত খাঁ বা আলি আকবর খানের মতো গুণী শিল্পীরা তাঁর ছবিতে সুর দিলেও, ১৯৬১ সালে 'তিন কন্যা' ছবি থেকে সত্যজিৎ রায় নিজেই নিজের চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। আবহসংগীত (Background score) তৈরিতে তাঁর দক্ষতা ছিল বিশ্বমানের। ছবির দৃশ্য অনুযায়ী ক্ল্যাসিকাল ও পাশ্চাত্য সুরের সংমিশ্রণে তিনি এক অনন্য ধ্বনিময় জগৎ তৈরি করতেন।
শিল্পী হিসেবে তিনি তৈরি করেছিলেন দুটি বিখ্যাত ইংরেজি ফন্ট—'Ray Roman' এবং 'Ray Bizarre'। বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা, ছবির টাইটেল কার্ড ডিজাইন থেকে শুরু করে কস্টিউম ডিজাইন—সবই তিনি নিজের হাতে করতেন। তাঁর ছবির স্ক্রিপ্ট বা 'চিত্রনাট্য' ছিল ইলাস্ট্রেটেড নোটবুক, যেখানে দৃশ্যের ছবি, ক্যামেরার মুভমেন্ট ও সুরের সংকেত স্কেচ করা থাকত।
সত্যজিৎ রায়ের কাজ বিশ্বজুড়ে বিপুল প্রশংসিত হয়। তিনি লাভ করেছেন দেশ-বিদেশের অগণিত শ্রেষ্ঠ সম্মান:
১৯৯২ সালের ২৩শে এপ্রিল কলকাতার বেল ভিউ নার্সিংহোমে এই কর্মযোগী ও যুগপুরুষের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় কোনো নির্দিষ্ট যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। আধুনিক বাঙালির মানসিক গঠন, নান্দনিক রুচি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে সত্যজিৎ রায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন।
পয়লা বৈশাখের নতুন হালখাতা থেকে শুরু করে দুর্গা পূজার শারদীয় পঞ্জিকা ও পুজোবার্ষিকী—বাঙালির প্রতিটি উদযাপনে যেমন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন দেখা যায়, সত্যজিতের সৃষ্টিও ঠিক তেমনই। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সম্পূর্ণ আঞ্চলিক পটভূমিতে দাঁড়িয়েও বিশ্বজনীন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা সম্ভব। সেলুলয়েডের ফিতায় এবং সাহিত্যের পাতায় তাঁর এঁকে যাওয়া চরিত্ররা চিরকাল বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনে বেঁচে থাকবে।
সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র 'পথের পাঁচালী'। এটি ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায় এবং পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।
সত্যজিৎ রায় রচিত গোয়েন্দা চরিত্র 'ফেলুদা' এবং কল্পবিজ্ঞান চরিত্র 'প্রফেসর শঙ্কু' দুটিই প্রথম প্রকাশিত হয় শিশুদের জনপ্রিয় পত্রিকা 'সন্দেশ'-এ। প্রথম ফেলুদার গল্প ছিল 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি' (১৯৬৫) এবং প্রফেসর শঙ্কুর প্রথম গল্প ছিল 'ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি' (১৯৬১)।
সত্যজিৎ রায় ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর আজীবন ও অনন্য অবদানের জন্য অনারারি অস্কার (Academy Honorary Award) লাভ করেন।