🌟 ব্যক্তিত্ব · ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার
বাঙালির আবেগের সবচেয়ে কাছের গল্পকার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন, কালজয়ী উপন্যাস, নারীভাবনা, বিপ্লবী রাজনীতি ও সামতাবেড়ের নিভৃত সাহিত্যসাধনার এক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে যা শুধু সাহিত্যিক মূল্যায়নের ফ্রেমে আবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি অনুভূতির গভীরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি হন বাংলা নবজাগরণের মধ্যগগন এবং বঙ্কিমচন্দ্র যদি হন উপন্যাস রচনার পথপ্রদর্শক, তবে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Sarat Chandra Chattopadhyay) হলেন সেই কালজয়ী স্রষ্টা যিনি প্রথম সাধারণ মধ্যবিত্ত, গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের অন্তরে সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁকে বলা হয় 'অপরাজেয় কথাশিল্পী'।
শরৎচন্দ্রের কলমে ধরা পড়েছিল গ্রামীণ বাংলার মাটি, হাওয়া, নদী আর তার পাশাপাশি তৎকালীন অবমিত, দুঃখিনী ও সমাজ-বিতাড়িত নারীজাতির অব্যক্ত যাতনা। তাঁর গল্প-উপন্যাসে প্রেম যতখানি মধুর, তার চেয়েও অনেক বেশি বেদনাময় ও আত্মত্যাগে উজ্জ্বল। 'দেবদাস', 'শ্রীকান্ত', 'চরিত্রহীন', 'গৃহদাহ', 'পল্লীসমাজ' কিংবা 'পথের দাবী'—প্রতিটি সৃষ্টিই শতাব্দীর সীমানা পেরিয়ে আজও সমানভাবে জীবন্ত। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের বিচিত্র পথচলা, সাহিত্যিক বিবর্তন, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁর অমোঘ প্রভাব সম্পর্কে।
১৮৭৬ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২৮৩ সালের ৩১শে ভাদ্র) হুগলি জেলার ব্যান্ডেলের নিকটবর্তী দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক ভবঘুরে, কল্পনাবিলাসী ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। তিনি বহু গল্প ও উপন্যাস লেখার চেষ্টা করলেও অর্থকষ্ট ও অলসতার কারণে কোনোটিই শেষ করে যেতে পারেননি। অন্যদিকে মাতা ভুবনমোহিনী দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও ধর্মপ্রাণা নারী।
পিতার কাছ থেকেই শরৎচন্দ্র পেয়েছিলেন লেখালেখির স্বভাবজাত প্রেরণা এবং অদম্য ভ্রমণপিপাসা। তবে দারিদ্র্য ছিল তাঁদের নিত্যসঙ্গী। দেবানন্দপুরের পাঠশালাতেই শরৎচন্দ্রের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। কিন্তু অভাবের তাড়নায় পরিবারটিকে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করতে হতো। শেষপর্যন্ত শরৎচন্দ্রের শৈশব ও কৈশোরের একটা বিশাল অংশ কাটে ভাগলপুরে তাঁর মাতুলালয়ে।
ভাগলপুরে খঞ্জরপুর এলাকায় কাটানো সময়টি শরৎচন্দ্রের মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মাতুলালয়ের সমৃদ্ধ পাঠাগারে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইংরেজি সাহিত্যের বহু বই পড়ার সুযোগ পান। এই সময়েই তিনি বন্ধুদের নিয়ে 'আড্ডা' জমানো, নাটকে অভিনয় করা, গান গাওয়া এবং নদীতে নৌকা বাইবানোর মতো দুঃসাহসিক অভিযানে মেতে উঠতেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে ইন্দ্রনাথের রূপ ধরে অমরতা লাভ করেছে।
১৮৯৪ সালে ভাগলপুর টিএনজে কলেজ থেকে এফ.এ পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও অর্থাভাবে পরীক্ষার ফি জমা দিতে পারেননি শরৎচন্দ্র। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটে। এর কিছুদিন পরই মাতৃবিয়োগ ঘটে এবং পিতার সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে শরৎচন্দ্র ঘর ছাড়েন। কয়েক বছর তিনি সন্ন্যাসীর বেশে নানা স্থান ঘুরে বেড়ান।
১৯০৩ সালে ভাগ্য অন্বেষণে তিনি বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) এর রাজধানী রেঙ্গুনে পাড়ি জমান। রেঙ্গুনে কাটানো দীর্ঘ ১৩ বছর (১৯০৩-১৯১৬) শরৎচন্দ্রের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সেখানে তিনি প্রথমে রেলওয়ের হিসাব দপ্তরে এবং পরে পাবলিক ওয়ার্কস একাউন্টস অফিসে সাধারণ কেরানির চাকরি নেন।
রেঙ্গুনের জীবন ছিল নিঃসঙ্গতা ও কঠোর সংগ্রামের। কিন্তু এই একাকীত্বই তাঁর সাহিত্যবোধকে প্রখর করে তোলে। প্রবাসী বাঙালি জীবন, রেঙ্গুনের কুলিমজুরদের করুণ অবস্থা এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষদের সাথে তাঁর প্রতিনিয়ত মেলামেশা শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছিল। এই প্রবাসকালেই তিনি দেশীয় ও বিশ্বসাহিত্যের ব্যাপক অধ্যয়ন করেন।
রেঙ্গুনে থাকাকালীনই ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথের 'ভারতী' পত্রিকায় শরৎচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস 'বড়দিদি' নামহীনভাবে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। লেখাটি পড়ে তৎকালীন সাহিত্যিক মহল মনে করেছিলেন এটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কোনো ছদ্মনামে লেখা উপন্যাস। পরে যখন জানা গেল এটি এক অচেনা কেরানি শরৎচন্দ্রের সৃষ্টি, তখন পুরো সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
১৯১৬ সালে রেঙ্গুন থেকে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা ও সাহিত্যিক আকর্ষণে বাংলায় ফিরে আসেন শরৎচন্দ্র। কলকাতায় ফিরে প্রথমে হাওড়ার বাজে শিবপুরে এবং পরবর্তীতে হাওড়ার দেউলটির কাছে সামতাবেড় গ্রামে রূপনারায়ণ নদীর তীরে একটি মনোরম বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেন।
সামতাবেড়ের এই বাড়িটি আজও বাঙালির কাছে এক তীর্থক্ষেত্রের মতো। রূপনারায়ণের হাওয়া, বাঁশঝাড়, সবুজ প্রান্তর আর শান্ত পল্লীপরিবেশে বসেই তিনি রচনা করেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি সাহিত্যকর্ম।
গ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য শরৎচন্দ্র হোমওপ্যাথি ওষুধ রাখা শুরু করেছিলেন। প্রতিদিন সকালে তাঁর সামতাবেড়ের বাড়ির উঠোনে দরিদ্র গ্রামবাসীরা ভিড় জমাত। বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান ও তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনাই ছিল তাঁর প্রতিদিনের আনন্দ। এ ছাড়া পশুপাখির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। 'ভোলী' নামের এক পোষা কুকুর এবং অনেক দেশি পাখি ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যকৃতির প্রধান শক্তি ছিল তাঁর বাস্তববাদী পর্যবেক্ষণ এবং অতি সহজ-সরল ভাষায় গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ করার ক্ষমতা। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে যে রাজকীয় গম্ভীর ভাষা বা ঐতিহাসিক দৃশ্যপট ছিল, শরৎচন্দ্র সেখান থেকে বেরিয়ে সাহিত্যকে নামিয়ে আনলেন মধ্যবিত্তের উঠোনে, মাটির ঘরের দাওয়ায়।
চারটি খণ্ডে প্রকাশিত 'শ্রীকান্ত' (১৯১৭-১৯৩৩) শরৎচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত। এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং একজন পথভোলা, নিরপেক্ষ ও অনুসন্ধিৎসু মানুষের জীবনদর্শনের দলিল।
১৯১৭ সালে প্রকাশিত 'দেবদাস' উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় প্রেমগাথা। দেবদাস ও পার্বতীর ব্যর্থ প্রেম এবং চন্দ্রমুখী নামক গণিকার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ভারতের জনমানসে এতটাই গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে 'দেবদাস' শব্দটি স্বয়ং বিরহী প্রেমিকের এক প্রতিশব্দে পরিণত হয়। দেবদাসকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলায়, হিন্দিতে, তামিল ও তেলুগুতে বহুবার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
শরৎচন্দ্র কেবল রোমান্টিক উপন্যাস লেখেননি, তিনি সমাজ কাঠামোর ভণ্ডামী ও নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন।
'পল্লীসমাজ' (১৯১৬) এবং 'দেনা-পাওনা' (১৯২৩) উপন্যাসে গ্রামীণ বাংলার তৎকালীন কুসংস্কার, জাতিভেদ প্রথা, জমিদারি শোষণ এবং দেবোত্তর সম্পত্তি নিয়ে রাজনীতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রমা ও রমেশের সংযত অথচ করুণ প্রেমগাথা পল্লীসমাজের মূল আকর্ষণ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রধান 'নারী দরদী' লেখক। তাঁর পূর্ববর্তী যুগে বাংলা সাহিত্যে নারীরা প্রধানত গৃহিনী, দেবী অথবা কুলটা হিসেবেই चित्रित হতো। কিন্তু শরৎচন্দ্র নারীদের উপস্থাপন করলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে।
তিনি দেখালেন, সমাজের চোখে যারা 'পতিতা' বা 'গৃহত্যাগী', তাদের ভেতরেও থাকতে পারে অপত্য স্নেহ, সীমাহীন ত্যাগ ও উচ্চ নৈতিকতা।
১৯২৬ সালে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' উপন্যাসটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ। এর আগে বাংলা সাহিত্যে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনকে এভাবে প্রত্যক্ষ সমর্থন জানিয়ে কোনো প্রধান সাহিত্যিক উপন্যাস রচনা করেননি।
উপন্যাসের প্রধান নায়ক 'ডাক্তার সব্যসাচী' ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য সশস্ত্র বিপ্লবী। তিনি সুদূর বার্মা ও দূর প্রাচ্যে গোপনে 'পথের দাবী' নামক বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন ভারতমাতা থেকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য। সব্যসাচীর প্রজ্ঞা, অসাধারণ ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা, বৈপ্লবিক আদর্শ এবং নির্ভীক মনোভাব তৎকালীন ভারতের হাজার হাজার তরুণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।
উপন্যাসটি প্রকাশের সাথে সাথেই ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের নজর পড়ে। ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বইটি সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
শরৎচন্দ্র ভেবেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাবেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসটির রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতা ও ব্রিটিশদের সরাসরি আক্রমণের প্রতিক্রিয়া ভেবে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে শরৎচন্দ্রকে লিখেছিলেন:
"বইটি পড়ে খুশি হয়েছি। কিন্তু বইটি ইংরেজ সরকার সহ্য করবে না তা বইখানি শেষ করলেই বোঝা যায়... রাজনৈতিক প্রচারের জন্য যে বই, তার উদ্দেশ্য সিদ্ধি তার সাহিত্যিক গুণের ওপর নির্ভর করে না, তার প্রত্যক্ষ আঘাতের ওপর করে।"
যদিও এই ঘটনায় শরৎচন্দ্র কিছুটা মর্মাহত হয়েছিলেন, তবুও তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় কোনো ফাটল ধরেনি।
শরৎচন্দ্র কেবল কলম হাতে ঘরে বসে থাকেননি, তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।
তিনি হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হিসেবে টানা কয়েক বছর (১৯২১–১৯৩৬) দায়িত্ব পালন করেন। দেশবন্ধু চিত্ররঞ্জন দাশ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও প্রীতিপূর্ণ। চিত্ররঞ্জন দাশ পরিচালিত 'নারায়ণ' পত্রিকায় শরৎচন্দ্র নিয়মিত লিখতেন। কংগ্রেসের মিটিং-মিছিলে তিনি সাধারণ কর্মীদের মতো হেঁটেছেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের তহবিল সংগ্রহের জন্য কাজ করেছেন।
তবে রাজনৈতিক দলীয় কৌশলের চেয়ে তাঁর কাছে সবসময় বড় ছিল দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তি। বিপ্লবী তরুণদের তিনি গোপনে সাহায্য করতেন, অনেক সময় তাদের আত্মগোপনে থাকার ব্যবস্থাও করে দিতেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি শরৎচন্দ্রের ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। তিনি রবীন্দ্রনাথকে তাঁর 'সাহিত্যের গুরু' মনে করতেন। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের অসামান্য গল্প বলার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার প্রতিভাকে মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করতেন। শরৎচন্দ্রের বায়ান্নতম জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছিলেন, "শরৎচন্দ্রের বাণী বাঙালির হৃদয়ে পৌঁছেছে, তাঁর আনন্দ ও বেদনাকে আপন করেছে।"
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের গভীর স্নেহের সম্পর্ক ছিল। নজরুল শরৎচন্দ্রকে 'দাদা' বলে ডাকতেন। নজরুল যখন জেলে অনশন ধর্মঘট করেন, তখন শরৎচন্দ্র অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে জেলে গিয়েছিলেন তাঁর সাথে দেখা করতে এবং অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে, নজরুলের ধূমকেতু ও লাঙল পত্রিকার তিনি ছিলেন অন্যতম শুভানুধ্যায়ী।
শরৎচন্দ্র ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ওপর তিনি বহু প্রবন্ধ ও বক্তব্য রেখেছেন। গ্রামীণ জীবনের পার্বণ—যেমন দুর্গা পূজা, রাসযাত্রা, দোল কিংবা চৈত্র সংক্রান্তির গাজন—তাঁর উপন্যাসে আবহমান বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। পঞ্জিকা অনুসারে বাংলার পৌষ পার্বণ ও নবান্ন উৎসবের দিনগুলোতে সামতাবেড়ের বাড়িতে তিনি দরিদ্রদের খাওয়ানোর আয়োজন করতেন।
তিনি কোনো সংকীর্ণ পণ্ডিder ধর্ম মতে বিশ্বাসী ছিলেন না। মানুষের কষ্ট লাঘব এবং মানুষের প্রতি প্রীতিকেই তিনি পরম ধর্ম বলে মনে করতেন।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর এতদিন পরও বাংলা ও ভারতীয় সাহিত্যের বাজারে তাঁর বইয়ের কাটতি এতটুকু কমেনি। কেন তিনি এখনও পাঠকদের কাছে 'অপরাজেয়'?
১. সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা: বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের ভাষার মধ্যে যে উচ্চাঙ্গের অলঙ্কার ও জটিলতা ছিল, শরৎচন্দ্রের ভাষা তা থেকে মুক্ত। তাঁর ভাষা যেন আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার এক শৈল্পিক রূপ। ২. আবেগ ও অনুভূতির তীব্রতা: সুখ, দুঃখ, বিরহ, লজ্জা ও ত্যাগের অনুভূতিগুলোকে তিনি যেভাবে স্পর্শ করেছেন, তা পাঠককে সরাসরি কাঁদাতে বা ভাবাতে পারে। ৩. সর্বজনীন চরিত্রায়ন: তাঁর চরিত্রের নায়ক-নায়িকারা কোনো দূর গ্রহের মানুষ নয়; তারা আমাদের পাশের বাড়ির দাদা, বোন, কাকিমা কিংবা পাড়ার ভলান্টিয়ার তরুণ। ৪. অন্যান্য ভাষায় প্রভাব: শরৎচন্দ্রের প্রায় প্রতিটি উপন্যাস হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, মালয়ালম ও ইংরেজি সহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। হিন্দি সাহিত্যে প্রেমচন্দের পর শরৎচন্দ্রকেই সবচেয়ে বেশি পড়া হয়।
১৯৩৭ সালের শেষদিকে শরৎচন্দ্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। যকৃৎ ও পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৮ সালের ১৬ই জানুয়ারি (বাংলা ১৩৪৪ সালের ২রা মাঘ) ৬১ বছর বয়সে কলকাতার এক নার্সিংহোমে এই মহান কথাশিল্পীর জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর মৃত্যুর খবরে সমগ্র বাংলা শোক সাগরে নিমজ্জিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে লিখেছিলেন:
"যাঁহার অমর বাণী মিলিয়াছে কোটি নরনারীর অশ্রুজলে,
শরৎচন্দ্রকে হারালাম আমরা আজ।"
শরৎচন্দ্র চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর অমর সাহিত্যসম্ভার। হাওড়ার সামতাবেড়ের 'শরৎ স্মৃতি মন্দির', দেউলটির রূপনারায়ণ নদী আর কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়-মণিকোঠায় তিনি চিরকাল 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' হিসেবেই বেঁচে থাকবেন।
উত্তর: সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ মানুষের মনস্তত্ত্ব, বিশেষ করে নারীদের কষ্ট ও ভালোবাসাকে অত্যন্ত নিখুঁত ও আবেগঘন ভাষায় সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলার অনন্য ক্ষমতার জন্য তাঁকে 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সময়ের বিবর্তনেও তাঁর উপন্যাসের জনপ্রিয়তা এতটুকু ম্লান হয়নি।
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উপন্যাস 'পথের দাবী' (১৯২৬) ব্রিটিশ সরকার ১৯২৭ সালে বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। উপন্যাসটিতে বিপ্লববাদী সশস্ত্র আন্দোলন এবং 'ডাক্তার সব্যসাচী' চরিত্রের মাধ্যমে পরাধীন ভারতের স্বরাজ অর্জনের কথা বলা হয়েছিল, যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বেশ কিছু লেখা অনিলা দেবী (তাঁর বোন অনিলা দেবীর নামে) ছদ্মনামে প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া সাহিত্য জীবনের শুরুতে তিনি 'অনুপমা' এবং 'সুরেন্দ্রনাথ' ছদ্মনামেও কিছু রচনা করেছিলেন।
উত্তর: ১৯২৬ সাল থেকে মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে পর্যন্ত শরৎচন্দ্র হাওড়ার রূপনারায়ণ নদীর তীরে সামতাবেড়ে বসবাস করেছিলেন। এই নিভৃত পল্লীপরিবেশে বসেই তিনি 'শ্রীকান্ত' (শেষ খণ্ড), 'পথের দাবী', 'গৃহদাহ'-এর অংশবিশেষ ও 'শেষ প্রশ্ন'-এর মতো কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেন। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ।