← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: পাহাড়তলী ক্লাবের বীরকন্যা ও বাংলার প্রথম নারী শহিদের রক্তঝরা মহাকাব্য

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার

মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের অগ্রগামী বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ ও পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মদানের মাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অমর ইতিহাস।

ভূমিকা: আত্মত্যাগের অগ্নিশিখায় প্রজ্জ্বলিত এক রূপকথা

উপমহাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস কেবল পুরুষের বীরত্ব দিয়ে রচিত হয়নি; এতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে বাংলার বহু বীরাঙ্গনার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অমর গাথা। সেই ইতিহাসে সর্বাগ্রে যে নামটি ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, তা হলো বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট পরাধীন ভারতবর্ষে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অগ্নিকন্যা হিসেবে তিনি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

যেই সময় ভারতীয় সমাজে নারীদের ভূমিকা অন্তঃপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেই সময় পুরুষ ছদ্মবেশে ব্রিটিশদের সুসজ্জিত ঘাটিতে সশস্ত্র হামলা চালানো এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে আত্মাহুতি দেওয়া সহজ কথা ছিল না। মাত্র ২১ বছর বয়সে পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করে প্রীতিলতা যে আত্মদান করেছিলেন, তা কেবল তৎকালীন বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করেনি, বরং আজও প্রতিটি বাঙালিকে স্বাবলম্বিতা, দেশপ্রেম ও সাহসিকতার প্রেরণা জোগায়। তিনি চট্টগ্রাম তথা সমগ্র বাংলার প্রথম নারী শহিদ।


শৈশব, পরিবার ও প্রারম্ভিক জীবন

১৯১১ সালের ৫ মে (বাংলা ২১ জৈষ্ঠ্য, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ) চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রীতিলতা। তাঁর পিতা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড কেরানি এবং মাতা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন একজন গৃহিণী। পরিবারের সবাই তাঁকে আদর করে 'ফুন্টু' বলে ডাকতেন। ওয়াদ্দেদার পরিবারটি ছিল সংস্কৃতিমনা ও অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী।

প্রীতিলতার পরিবার মূলত 'দাশগুপ্ত' উপাধির ছিল, কিন্তু তাঁদের কোনো এক পূর্বপুরুষের সরকারি 'ওয়াহেদেদার' (তহবিলদার) পদের দরুন পরবর্তীতে তাঁদের পদবী ওয়াদ্দেদার হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই প্রীতিলতা ছিলেন অত্যন্ত মেধানোভাবাপন্ন ও শান্ত প্রকৃতির, কিন্তু তাঁর মনের গভীরে লালিত হতো এক অদম্য দেশপ্রেম।

শিক্ষার আলো ও চেতনার বিকাশ

প্রীতিলতার শিক্ষাজীবনের শুরু চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। পড়াশোনায় তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দেন। এই স্কুলেই তাঁর শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী বিনোদবালা চৌধুরী, যিনি শিক্ষার্থীদের মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করতেন। খাস্তগীর স্কুলেই প্রীতিলতার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে অপর এক বীরকন্যা কল্পনা দত্তের সাথে।

১৯২৮ সালে প্রীতিলতা প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩০ সালে আইএ পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং বোর্ডে পঞ্চম স্থান অর্জন করেন। ঢাকায় থাকাকালীন তিনি লীলা নাগের গঠিত 'দীপালী সংঘ'-র সাথে যুক্ত হন, যা ছিল নারী শিক্ষা ও বিপ্লবের প্রাথমিক কেন্দ্র।

এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতায় যান এবং ঐতিহাসিক বেথুন কলেজে দর্শনশাস্ত্রে বিএ ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে তিনি দর্শনে কৃতিত্বের সাথে বিএ পাস করেন। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর বিএ ডিগ্রির সনদ স্থগিত করে রাখে (যা পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মরণোত্তর প্রদান করে)।


কলকাতা ও ঢাকার দিনগুলি: বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা

কলকাতা এবং ঢাকায় থাকাকালীন প্রীতিলতা কেবল বইয়ের পাতাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কলকাতা তখন ভারতের বিপ্লবী রাজনীতির মূল প্রাণকেন্দ্র। বেথুন কলেজে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী দল 'ছাত্রী সংঘ'-র সংস্পর্শে আসেন। এখানে তিনি লাঠিখেলা, র্যা পিড ফায়ারিং ও সামরিক কৌশল শেখা শুরু করেন।

এই সময়েই তিনি রামকৃষ্ণ বিশ্বাস নামক চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের এক তরুণ সদস্যের বিচার ও ফাঁসির আদেশ শুনে গভীরভাবে আলোড়িত হন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে যখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়েছিল, তখন প্রীতিলতা 'অমিত রায়' ছদ্মনামে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। প্রায় ৪০ বার তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে কারাগারে এই বিপ্লবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাহসিকতা ও দেশের জন্য হাসি মুখে প্রাণ দেওয়ার অঙ্গীকার প্রীতিলতাকে পুরোপুরি বিপ্লবী পথে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

বিএ পাস করে চট্টগ্রামে ফিরে এসে প্রীতিলতা নন্দনকানন অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষয়িত্রী হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর মন পড়ে ছিল দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে।


মাস্টারদা সূর্য সেন ও চট্টগ্রাম বিপ্লবী দল

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামকে তিন দিনের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকায় বিপ্লবীরা আত্মগোপন করেন এবং ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে একের পর এক গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হন (যার মধ্যে জালালাবাদ যুদ্ধ অন্যতম)।

প্রীতিলতা শৈশব থেকেই মাস্টারদার বীরত্বের গল্প শুনেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম এসে মাস্টারদার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। নারী হিসেবে তাঁকে প্রথমে দলভুক্ত করতে অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কিন্তু মাস্টারদা সূর্য সেন প্রীতিলতার সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা দেখে তাঁকে বিপ্লবী দলে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

"মেয়েদের বিপ্লবী দলে নেওয়া হবে না—এই নিয়ম বদলেছিলেন মাস্টারদা প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে নারী-পুরুষের কোনো বিভেদ থাকতে পারে না।"

প্রীতিলতা বিপ্লবী দলের গোপন চিঠি আদান-প্রদান, অস্ত্র সরবরাহ, বিপ্লবী সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা এবং পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ নিখুঁতভাবে করতে থাকেন।


ধলঘাট সংঘর্ষ: চরম পরীক্ষা ও প্রিয় সঙ্গীদের হারানো

১৯৩২ সালের ১৩ জুন (বাংলা ৩০ জৈষ্ঠ্য, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)। ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে গোপন বৈঠকে বসেছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন, নির্মল সেন, অপূর্ব সেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ব্রিটিশ সামরিক অফিসার ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের নেতৃত্বে বিপুল পুলিশ ও সেনাবাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে।

শুরু হয় ভয়াবহ গুলিবিনিময়। প্রীতিলতার চোখের সামনেই বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন ব্রিটিশ বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে শহিদ হন। অন্যদিকে বিপ্লবীদের গুলিতে নিহত হয় ক্যাপ্টেন ক্যামেরন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মাস্টারদা ও প্রীতিলতা রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে আত্মগোপন করতে সক্ষম হন। এই ঘটনার পর প্রীতিলতার ওপর পুলিশের সন্দেহ গাঢ় হয়ে ওঠে এবং তাঁর ছবি শহরের আনাচে-কানাচে টাঙিয়ে দেওয়া হয়। ফলে স্কুলেই ইস্তফা দিয়ে প্রীতিলতা পুরোপুরি আত্মগোপন করেন।


পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ: ঐতিহাসিক মিশনের পটভূমি

ধলঘাট ঘটনার পর মাস্টারদা সিদ্ধান্ত নেন ব্রিটিশ শক্তিকে এক চরম আঘাত হানতে হবে। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয় চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব-কে।

এই ক্লাবটি ছিল ব্রিটিশ অফিসার ও নীলকরদের বিনোদন কেন্দ্র। ক্লাবের প্রবেশদ্বারে একটি সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকত, যা প্রতিটি ভারতীয়ের আত্মসম্মানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করত। বোর্ডে লেখা ছিল:

"Dogs and Indians not allowed" (কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ)।

এই অপমানজনক ও বর্ণবাদী আচরণের উপযুক্ত জবাব দিতেই পাহাড়তলী ক্লাব ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়। মাস্টারদা এই অভিযানের নেতৃত্বের দায়িত্ব তুলে দেন ২১ বছরের তরুণী প্রীতিলতার ওপর। এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা, যেখানে কোনো নারী সশস্ত্র সামরিক অভিযানের প্রধান অধিনায়ক ছিলেন।


২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বরের সেই রক্তঝরা রাত

১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর (বাংলা ৮ আশ্বিন, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ—শরৎকালের এক মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন বাংলায় শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ তৈরি হচ্ছিল)। পাহাড়তলী ক্লাবে সেদিন রাতে বসেছিল নাচ-গান ও মদের আসর। প্রায় ৪০-৫০ জন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা সেখানে আনন্দে মেতেছিল।

প্রীতিলতা তাঁর দলকে পুনর্গঠিত করেন। তাঁর দলে ছিলেন কালিকিঙ্কর দে, মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে, শান্তি চক্রবর্তী এবং প্রফুাল দাস। অভিযানের সুবিধার্থে প্রীতিলতাকে পরানো হয়েছিল একজন পাঞ্জাবি পুরুষ রাজমিস্ত্রির পোশাক—ধুতি, কোচানো কুর্তা ও মাথায় পাগড়ি।

আক্রমণের বিবরণ

রাত ১০টা ৪৫ মিনিট। পুরো ক্লাব আলোয় ঝলমল করছে। প্রীতিলতার নির্দেশে চারদিক থেকে বিপ্লবীরা ক্লাবটি ঘিরে ফেলেন। সংকেত পাওয়া মাত্রই প্রীতিলতা প্রথম হুইসেল বাজান এবং ক্লাবের ভেতরের দিকে বোমা নিক্ষেপ করেন। একই সাথে অন্য বিপ্লবীরা রাইফেল ও রিভলভার থেকে গুলি চালাতে শুরু করেন।

মুহূর্তের মধ্যে ক্লাবের আনন্দ-উৎসব নারকীয় বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। আলো নিভে যায়, জানালার কাচ ভেঙে পড়ে এবং ক্লাবের ভেতরের অফিসাররা হুড়োহুড়ি শুরু করে। প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীদের এই ঝটিকা আক্রমণে একাধিক ইংরেজ কর্মকর্তা আহত ও নিহত হয়।


আত্মদান: পটাশিয়াম সায়ানাইড ও প্রথম নারী শহিদের বিদায়

অভিযান সফলভাবে শেষ করে বিপ্লবীরা যখন পিছু হটছিলেন, তখন এক ব্রিটিশ অফিসারের গোপন গুলি এসে প্রীতিলতার বাঁ পায়ে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত অবস্থায় তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর ধীরগতির কারণে পুরো দলই ধরা পড়ে যেতে পারে। তাছাড়া, জীবিত অবস্থায় ব্রিটিশদের হাতে ধরা দিলে দলের গোপন তথ্য ও মাস্টারদার অবস্থান বেরিয়ে যেতে পারে।

বিপ্লবী দলের কঠোর নিয়ম ছিল—জীবিত অবস্থায় কোনোভাবেই শত্রুর হাতে ধরা দেওয়া যাবে না। প্রীতিলতার পকেটে আগে থেকেই রাখা ছিল মারাত্মক বিষ পটাশিয়াম সায়ানাইড।

সহযোদ্ধারা তাঁকে তুলে নিয়ে যেতে চাইলে প্রীতিলতা দৃঢ়তার সাথে নির্দেশ দেন সবাই যেন দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। এরপর তিনি শান্ত চিত্তে পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে ঢেলে দেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিথর হয়ে যায় এই মহান বীরকন্যার দেহ।

পরদিন সকালে পুলিশ তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। তল্লাশি চালিয়ে তাঁর পকেট থেকে পাওয়া যায় একটি আবেগঘন ইস্তাহার, যা দেশবাসীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।


শেষ চিঠি ও দেশবাসীর প্রতি প্রীতিলতার বার্তা

মৃত্যুর আগে প্রীতিলতা তাঁর মা প্রতিভাময়ী দেবীর উদ্দেশ্যে এবং সমগ্র ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে দুটি অমর চিঠি লিখে গিয়েছিলেন। পুলিশের হাতে উদ্ধার হওয়া সেই পত্রে তিনি লিখেছিলেন:

"মাগো, আমায় ক্ষমা কোরো। আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে যাচ্ছি, তার চেয়ে বড় ধর্ম আর কী হতে পারে? বোনেরা যদি আজ পুরুষের সাথে স্বাধীনতার যুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে না দাঁড়ায়, তবে আমাদের মুক্তি কোনোদিন আসবে না।"

তিনি আরও লিখেছিলেন, নারীদের কেবল রান্নাবান্না আর গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়; মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনে নারীদেরও সশস্ত্র সংগ্রামের সমপরিমাণ অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে।


বাংলা ও ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসে প্রীতিলতার প্রভাব

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মত্যাগ পরাধীন ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর এই দৃষ্টান্ত দেখে হাজার হাজার নারী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কল্পনা দত্ত, সুনীতি চৌধুরী, শান্তি ঘোষের মতো বীরাঙ্গনারা প্রীতিলতার পথ অনুসরণ করেই সশস্ত্র বিপ্লবের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন।

পাহাড়তলী ক্লাবের সেই অপমানজনক সাইনবোর্ড প্রীতিলতা তাঁর নিজের রক্ত দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন। এটি কেবল একটি ক্লাবে আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঔদ্ধত্যের মুখে কশাঘাত।

আধুনিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসে স্মৃতি

আজও বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ—উভয় বাংলাতেই প্রীতিলতাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।


পঞ্জিকা, সময় ও ইতিহাসের কাকতালীয় মেলবন্ধন

ইতিহাসের পাতা ও প্রাচীন পঞ্জিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর (৮ আশ্বিন) তারিখটি ছিল শরৎকালের দুর্গাপূজা ও মহালয়ার ঠিক আবহকাল। বাঙালি সনাতন সংস্কৃতিতে যখন দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও অসুরবধের কাহিনী ঘরে ঘরে উদযাপিত হয়, ঠিক সেই সময়ই প্রীতিলতা যেন চণ্ডীর রূপ ধরে ব্রিটিশ নামক পরাধীনতার অসুরকে বিনাশ করতে রাজপথে নেমেছিলেন। আশ্বিনের সেই রক্তঝরা রাতে প্রীতিলতার আত্মদান বাংলার ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।


সাধারণ প্রশ্ন

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কে ছিলেন এবং তিনি কেন বিখ্যাত?

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের অন্যতম শীর্ষ নারী সদস্য। তিনি ১৯৩২ সালে পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব সশস্ত্র আক্রমণের নেতৃত্ব দেন এবং ব্রিটিশদের হাতে ধরা না দিয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করে আত্মাহুতি দেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম নারী বাঙালি শহিদ।

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাবে কেন আক্রমণ করা হয়েছিল?

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাবের সামনে "Dogs and Indians not allowed" (কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ) শীর্ষক বর্ণবাদী সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকত, যা ভারতীয়দের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ছিল। ব্রিটিশদের এই বর্ণবিদ্বেষ ও ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে এবং ব্রিটিশ শক্তিকে আঘাত করতে সূর্য সেনের নির্দেশে এই আক্রমণ চালানো হয়।

প্রীতিলতা কেন পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন?

পাহাড়তলী ক্লাবে আক্রমণের পর পিছু হটার সময় প্রীতিলতা পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় ধরা পড়লে বিপ্লবী দলের গোপন তথ্য ও অন্যান্য সদস্যদের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। তাছাড়া revolutionary code অনুযায়ী জীবিত অবস্থায় শত্রুর হাতে ধরা না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতেই তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মদান করেন।

প্রীতিলতার শৈশব ও শিক্ষাজীবন কোথায় কেটেছিল?

প্রীতিলতার শৈশব কাটে চট্টগ্রামের পটিয়া ও শহরে। তিনি ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা, ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আইএ এবং কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে কৃতিত্বের সাথে বিএ পাস করেন।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার