🌟 ব্যক্তিত্ব · ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন, কালজয়ী উপন্যাস, 'বন্দে মাতরম্' মন্ত্রের জন্মকথা এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের সম্পূর্ণ ইতিহাস।
উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণের গগনভেদী আলোয় যে ক'জন মনীষী বাঙালি জাতির বুদ্ধি, জ্ঞান ও সাহিত্যবোধকে নতুন দিশা দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় এক কালজয়ী নাম—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। শুধু গল্প বা উপন্যাস রচনার মধ্যেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বাংলা গদ্যভাষাকে পণ্ডিcheck আড়ষ্টতা ও সরল কথ্যরীতির মাঝামাঝি এনে একটি শক্তিশালী, ঋজু ও বৈচিত্র্যময় রূপ দিয়েছিলেন তিনি। এজন্যই বাঙালি জাতি তাঁকে ভূষিত করেছে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে।
বাংলা সাহিত্যে প্রথম আধুনিক ও সফল উপন্যাসের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র কেবল একজন কথাসাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন এক দূরদর্শী চিন্তাবিদ, সম্পাদক এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম মূল স্থপতি। তাঁর রচিত 'বন্দে মাতরম্' গানটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল এবং আজও তা ভারতবাসীর হৃদয়ে দেশপ্রেমের এক পরম শিখা হয়ে জ্বলছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার এক শান্ত গ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শিখরে আরোহণ—বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র জীবনই এক মহাকাব্যিক বিপ্লবের কাহিনি।
১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুন (বাংলা ১২৪৫ বঙ্গাব্দের ১৩ আষাঢ়) উত্তর চব্বিশ পরগনার নৈহাটি সংলগ্ন কাঁঠালপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণ পরিবারে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের একজন পদস্থ কর্মকর্তা (ডেলিগেট কালেক্টর)। মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও গৃহকর্মনিপুণা নারী।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রারম্ভিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রাম্য পাঠশালায়। বালক বয়স থেকেই তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি ছিল চমকপ্রদ। শোনা যায়, পাঠশালার গুরুমশাই একদিনে পুরো বর্ণমালা শিখিয়ে দেওয়ার পর বালক বঙ্কিম তা একবারে আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মেদিনীপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায় অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করেন। মেদিনীপুর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে (তৎকালীন হিন্দু কলেজ) ভর্তি হন।
১৮৫৮ সালটি বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের পাশাপাশি সমগ্র বাংলার শিক্ষা ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক বছর। এই বছরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমবারের মতো বি.এ (Bachelor of Arts) পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। সেই ঐতিহাসিক প্রথম বি.এ পরীক্ষায় যে দুজন ছাত্র সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপরজন ছিলেন যদুনাথ বোস। শিক্ষা জীবনে এই অভূতপূর্ব কৃতিত্ব অর্জনের পরই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সরাসরি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে নিয়োগ করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘ ৩৩ বছর ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পদমর্যাদায় সরকারি কর্মচারী হলেও তাঁর চিন্তা, চেতনা ও মেরুদণ্ড ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। চাকরির দরুন তাঁকে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বহু জায়গায় স্থানান্তরিত হতে হয়েছে—যশোর, খুলনা, বারাসাত, বেরহামপুর (বহরমপুর), মেদিনীপুর, হাওড়া ও আলিপুর সহ নানান স্থানে।
প্রশাসক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, ন্যায়পরায়ণ এবং কঠোর। ব্রিটিশ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায়শই তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করত, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।
সরকারি চাকরির এই অভিজ্ঞতা বঙ্কিমচন্দ্রকে সাধারণ মানুষের মানসিকতা, গ্রাম বাংলার সমাজব্যবস্থা এবং ইংরেজ শাসকদের শোষণনীতি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। আর এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর উপন্যাস ও প্রবন্ধের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে।
বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্য রচনার সূচনায় প্রথমে ইংরেজিতে হাত দিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ছিল 'Rajmohan's Wife' (রাজমোহন্স ওয়াইফ)। তবে তিনি দ্রুতই অনুধাবন করেন যে, স্বজাতির হৃদয়ে পৌঁছাতে হলে মাতৃভাষাই একমাত্র পথ। এরপরই তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন।
১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী'। এটি কেবল বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম সার্থক রোমান্টিক ঐতিহাসিক উপন্যাস। মোঘল ও পাঠান যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত তিলোত্তমা, আয়েষা ও জগৎসিংহের ত্রিকোণ প্রেমের গল্প এবং রোমাঞ্চকর ঘটনাপ্রবাহ তৎকালীন পাঠকসমাজকে বাক্রুদ্ধ করে দিয়েছিল। 'দুর্গেশনন্দিনী' প্রকাশের সাথে সাথেই বাংলা কথাসাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
প্রথম উপন্যাসের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয় 'কপালকুণ্ডলা'। এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা রোমান্টিক-ট্র্যাজিক উপন্যাস। মেদিনীপুরের হিজলি উপকূলের নির্জন বনাঞ্চলে কাপালিকের কাছে লালিত-পালিত বন্যকন্যা কপালকুণ্ডলা ও নাগরিক যুবক নবকুমারের প্রেম ও জটিল মনস্তত্ত্ব নিয়ে এই উপন্যাস রচিত। উপন্যাসের সেই অমর বাক্য—"পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?"—আজও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা সংলাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তীতে 'মৃণালিনী' উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র তুর্কি আক্রমণের পটভূমিতে ঐতিহাসিক প্রেমের গল্প তুলে ধরেন। আর 'বিষবৃক্ষ' উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছেড়ে প্রবেশ করেন সামাজিক সমস্যামূলক উপন্যাসের জগতে। বিধবা বিবাহ, পরকীয়াতত্ত্ব এবং পারিবারিক জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে রচিত 'বিষবৃক্ষ' সামাজিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক।
১৮৭২ সালে (১২৭৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক সাহিত্য সাময়িকী 'বঙ্গদর্শন'। 'বঙ্গদর্শন' কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের দিক নির্দেশক। এই পত্রিকার মাধ্যমেই বঙ্কিমচন্দ্র একঝাঁক নতুন লেখক তৈরি করেন এবং বাংলা গদ্যকে প্রাঞ্জল ও সমৃদ্ধ করে তোলেন।
'বঙ্গদর্শন'-এর পাতাতেই প্রথম আত্মপ্রকাশ করে বঙ্কিমচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস 'বিষবৃক্ষ', 'চন্দ্রশেখর', 'কামালকান্তের দপ্তর', 'কৃষ্ণকান্তের উইল' এবং 'আনন্দমঠ'।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব সম্পর্কে পরবর্তীতে লিখেছিলেন যে, বঙ্গদর্শন যেন বঙ্গীয় সাহিত্য আকাশে আষাঢ়ের নবমেঘের মতো আবির্ভূত হয়েছিল এবং পাঠকদের মনে তৃষ্ণার জল বর্ষণ করেছিল। বালক বয়সে রবীন্দ্রনাথ নিজেও অতি আগ্রহে বঙ্গদর্শনের প্রতিটি সংখ্যার জন্য অপেক্ষা করতেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক অবদান হলো 'বন্দে মাতরম্' সংগীত রচনা এবং তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস 'আনন্দমঠ' (১৮৮২)।
১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র যখন চুঁচুড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তখন এক ছাঁদে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে সংস্কৃত ও বাংলার সংমিশ্রণে 'বন্দে মাতরম্' স্তোত্রটি রচনা করেন। এতে তিনি মাতৃভূমিকে কেবল একখণ্ড জমি হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর রূপকে সাক্ষাৎ দেবী হিসেবে আবাহন করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে তিনি এই গানটিকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
"বন্দে মাতরম্!
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং মাতরম্!"
১৭৭০ সালের (১১৭৬ বঙ্গাব্দের) ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং তার পরবর্তী 'সন্ন্যাসী বিদ্রোহ'-এর ঐতিহাসিক পটভূমিতে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি রচিত। উপন্যাসের মূল চরিত্র ভবানন্দ, জীবানন্দ ও সত্যানন্দের নেতৃত্বাধীন 'সন্তান দল' নিজেদের জীবন বাজি রেখে মাতৃভূমির স্বাধীকার রক্ষার জন্য লড়াই করে। বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন কীভাবে ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করতে হয়।
'আনন্দমঠ' ও 'বন্দে মাতরম্' মন্ত্র ভারতীয়দের সুপ্ত জাতীয়তাবাদকে এক লহমায় জাগিয়ে তুলেছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি যুগ এবং পরবর্তীতে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের বিপ্লবী বীরেরা এই 'বন্দে মাতরম্' ধ্বনি দিয়েই ফাঁসির মঞ্চে উঠতেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে মাস্টারদা সূর্য সেন—সবার কাছেই বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ' ছিল বিপ্লবের এক মহাগ্রন্থ।
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলোকে মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. ঐতিহাসিক রোমান্স ও উপন্যাস: 'দুর্গেশনন্দিনী', 'কপালকুণ্ডলা', 'মৃণালিনী', 'চন্দ্রশেখর'। ২. সামাজিক উপন্যাস: 'বিষবৃক্ষ', 'কৃষ্ণকান্তের উইল'। যেখানে তৎকালীন বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের নীতি, নৈতিকতা ও পরকীয়া সম্পর্কের জটিলতা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। ৩. রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী উপন্যাস (ত্রয়ী উপন্যাস): 'আনন্দমঠ', 'দেবী চৌধুরাণী' এবং 'সীতারাম'। এই তিনটি উপন্যাসকে একত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের 'ত্রয়ী উপন্যাস' বলা হয়। 'দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসে এক সাধারণ গৃহবধূ প্রফুল্ল কীভাবে আত্মশক্তি ও অনুশাসনের মাধ্যমে ভবানী পাঠকের সান্নিধ্যে এসে 'দেবী চৌধুরাণী'তে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজাকল্যাণে নিজের জীবন সঁপে দেয়, তা অসাধারণভাবে রূপায়িত হয়েছে। ৪. ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় উপন্যাস: 'রাজসিংহ'। বঙ্কিমচন্দ্র নিজে এই একটিমাত্র উপন্যাসকেই খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে মানতেন, যেখানে রাজপুত বীর রাজসিংহের মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মহাকাব্যিক গল্প বলা হয়েছে। ৫. ব্যঙ্গাত্মক ও মনস্তাত্ত্বিক রচনা: 'কমলাকান্তের দপ্তর'। আফিমখোর কমলাকান্তের ছদ্মবেশে বঙ্কিমচন্দ্র তৎকালীন সমাজ, রাজনীতি, ভণ্ডামি ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে তীব্র ব্যঙ্গ ও শ্লেষ হেনেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয়।
জীবনের শেষভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাভাবনায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তবে তাঁর ধর্মভাবনা কোনো অন্ধ সংস্কার বা পৌত্তলিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তিনি প্রাচ্য দর্শন ও পাশ্চাত্য যুক্তিবাদের (বিশেষ করে ওগ্যুস্ত কোঁতের প্রাত্যক্ষিকবাদ বা Positivism) এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলন এবং রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের যুগে বঙ্কিমচন্দ্র সামাজিক সংস্কারের পক্ষে কলম ধরেছিলেন, তবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিছুটা স্বতন্ত্র। তিনি সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কেবল আইন পাসের চেয়ে মানুষের অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও নৈতিক জাগরণকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর 'সাম্য' নামক প্রবন্ধে তিনি তৎকালীন কৃষক সমাজের ওপর জমিদারি শোষণ এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, যা বঙ্গীয় সমাজে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। বয়সের দিক থেকে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ২৩ বছরের জ্যেষ্ঠ। ঠাকুরবাড়ির সাথে বঙ্কিমচন্দ্রের যোগসূত্র ছিল বেশ নিবিড়।
রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রকে তাঁর সাহিত্যিক গুরু ও পথপ্রদর্শক মনে করতেন। 'বঙ্গদর্শন' সাময়িকীতে রবীন্দ্রনাথের বহু প্রাথমিক রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৯৩ সালে হাওড়ায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এক সভায় রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র নিজে সেই মাল্যটি তরুণ রবীন্দ্রনাথের গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "এ মালা তো রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্য, ও যে উদীয়মান সূর্য!"
সাহিত্য সম্রাটের এই দূরদর্শিতা পরবর্তীতে সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের যে শক্ত ভিত নির্মাণ করে গিয়েছিলেন, তার ওপর দাঁড়িয়েই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলাকে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের পারিবারিক জীবন ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। প্রথম স্ত্রী দেবাশীষ দেবীর অকালমৃত্যুর পর তিনি রাজলক্ষ্মী দেবীকে বিবাহ করেন। তাঁদের তিন কন্যা সন্তান ছিল।
উত্তর চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে অবস্থিত বঙ্কিমচন্দ্রের পৈতৃক ভিটা 'কাঁঠালপাড়া ভবন' আজও বাংলা সাহিত্যের এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এই বাড়িতেই 'বন্দে মাতরম্' গানের বেশ কিছু অংশ রচিত হয়েছিল এবং এখানেই বসে বঙ্কিমচন্দ্র ও তৎকালীন মনীষীরা সাহিত্য আলোচনা করতেন। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ বা বিশেষ সাংস্কৃতিক তিথিতে বহু সাহিত্যপ্রেমী মানুষ এই ঐতিহাসিক বাড়িটি পরিদর্শন করতে আসেন। বর্তমানে এটিকে বঙ্কিম ভবন গবেষণা কেন্দ্র ও সংগ্রহশালা হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) রোগে ভোগার পর ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল (বাংলা ১৩০০ বঙ্গাব্দের ২৬ চৈত্র) মাত্র ৫৫ বছর বয়সে এই মহান সাহিত্য সাধকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র বাংলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেবল একজন ঔপন্যাসিক বা প্রাবন্ধিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা গদ্যের স্থপতি, জাতীয়তাবাদের প্রেরণা এবং বাঙালি মানসিকতার দিশারী। আজ বঙ্গাব্দের পঞ্জিকায় কত তিথি ও উৎসবের আবর্তন ঘটে—দুর্গা পূজা, কালী পূজা, কিংবা পয়লা বৈশাখ; বাঙালির প্রতিটি উৎসব ও জাতীয় চেতনার মূলে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য ও দেশপ্রেমের সুবাস জড়িয়ে রয়েছে।
যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন 'সাহিত্য সম্রাট' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম বাঙালির হৃদয়ে অমলিন হয়ে জ্বলবে।
বাংলা সাহিত্যে প্রথম আধুনিক, সার্থক ও জনপ্রিয় উপন্যাসের জনক হওয়ার কারণে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে 'সাহিত্য সম্রাট' বলা হয়। তিনি আড়ষ্ট বাংলা গদ্যকে প্রাঞ্জল, গতিশীল ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপ দেন এবং 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে এক বিশ্বমানের উচ্চতায় নিয়ে যান।
'বন্দে মাতরম্' গানটি বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৫ সালে পৃথকভাবে রচনা করলেও এটি প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী উপন্যাস 'আনন্দমঠ'-এ, যা ১৮৮২ সালে বই আকারে আত্মপ্রকাশ করে।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস হলো 'দুর্গেশনন্দিনী', যা ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম কালজয়ী ঐতিহাসিক-রোমান্টিক উপন্যাস।
বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের প্রতিভাবাদ অনুধাবন করে তাঁকে উদীয়মান সূর্য হিসেবে সম্মান করেছিলেন, আর রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রকে বাংলা গদ্যের গুরু ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনেছেন।