🏛️ ইতিহাস · ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার
১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলায় গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ‘তেভাগা আন্দোলন’-এর সূচনা, রক্তঝরা সংগ্রাম, ইলা মিত্রের ভূমিকা এবং কৃষক অধিকারের লড়াই কীভাবে ইতিহাসের মোড় বদলে দিয়েছিল—তার বিস্তারিত আখ্যান।
১৯৪৬ সালের শেষভাগ। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষাক্ত বাষ্প। কিন্তু সেই অশান্ত সময়ের মধ্যেও অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ জনপদে ধ্বনিত হয়েছিল এক অন্যরকম সংকল্পের গর্জন—
“আধি নয়, তেভাগা চাই!”
“নিজ খামারে ধান তোলো!”
“করজ ধানের সুদ নাই!”
বাংলার শোষিত, লাঞ্ছিত কৃষক ও আধিয়ারদের (ভাগচাষী) শতাব্দীপ্রাচীন বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধই ইতিহাসে ‘তেভাগা আন্দোলন’ নামে অমর হয়ে রয়েছে। এই আন্দোলন কেবল ফসল ভাগাভাগির কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক লড়াই ছিল না; এটি ছিল জমিদারি প্রথা, জোতদারি শোষণ ও সামন্তবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলার মেহনতী মানুষের এক চরম রাজনৈতিক জাগরণ। অগ্রহায়ণের পাকা ধানের সোনালী ক্ষেত যখন রক্তে রাঙানো হয়েছিল, তখনই লিখিত হয়েছিল বাংলার কৃষকমুক্তির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।
তেভাগা আন্দোলনের শিকড় বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর যুগে। এই আইনের মাধ্যমে বাংলার মাটিতে গড়ে ওঠে এক পরজীবী সামন্তশ্রেণী—জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী জোতদার সমাজ।
বাংলার প্রথাগত কৃষি ব্যবস্থায় প্রকৃত কৃষকেরা ছিলেন ‘আধিয়ার’ বা ভাগচাষী। তারা নিজের গায়ের ঘাম রক্তে পরিণত করে জোতদারের জমিতে ফসল ফলাতেন। অথচ ফসল কাটার পর নিয়ম ছিল হাফ-হাফ বা অর্ধেক ভাগ। এই প্রথাকে বলা হতো ‘আধিধি প্রথা’। কিন্তু বাস্তবে কৃষকেরা সেই অর্ধেক ফসলও পেতেন না।
১. আবওয়াব বা বেআইনি তোল্লা: বরকন্দাজ খরচ, পার্বণী, মহাজন কমিশন, এমনকি জমিদার-জোতদারের বাড়ির যেকোনো শুভকাজে বা পূজাপার্বণে কৃষকদের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক চাঁদা বা ‘আবওয়াব’ আদায় করা হতো।
২. জোতদারের খামার প্রথা: নিয়ম ছিল ধান কাটার পর তা নিয়ে যেতে হবে জোতদারের খামারে। সেখানে মাপা বা ওজনের সময় নানা ছলচাতুরি করে কৃষকের প্রাপ্য অংশ কেটে রাখা হতো।
৩. করজ ধান ও সুদের চক্র: খরা বা বন্যার সময় কৃষক জোতদারের কাছ থেকে যে ধান ঋণ নিত, ফসল উঠলে ‘দেওড়া’ বা ‘দ্বিগুণ’ সুদে তা শোধ করতে হতো। ফলে ফসল ঘরে তোলার পরও আধিয়ারের ঝুলি থেকে যেত শূন্য।
৪. উচ্ছেদ আতঙ্ক: আধিয়ারদের জমিতে কোনো আইনি অধিকার ছিল না। জোতদার বা জমিদার যেকোনো মুহূর্তে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে দিত।
১৯৪৩ সালে (বাংলা ১৩৫০ বঙ্গাব্দে) বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়, তাতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। এই মন্বন্তরের প্রধান কারণ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; ছিল জোতদার-মজুতদার ও ব্রিটিশ সরকারের কৃত্রিম খাদ্যসংকট। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
এর আগেই ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গঠিত ‘ফ্লাউড কমিশন’ (Floud Commission) তাদের রিপোর্টে স্বীকার করেছিল যে, আধিয়ার প্রথা অত্যন্ত শোষক ও ক্ষতিকর। কমিশন সুপারিশ করেছিল যে—
কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বা প্রভাবশালী জমিদার-জোতদার গোষ্ঠী এই সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। ফলে বঞ্চিত কৃষকদের সামনে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা’ আনুষ্ঠানিকভাবে তেভাগা আন্দোলনের ডাক দেয়। অগ্রহায়ণ মাস—যে সময়ে নতুন ধান কাটার মরশুম শুরু হয় এবং গ্রাম বাংলায় নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি চলে—ঠিক সেই সময়েই কৃষকেরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে এবার আর জোতদারের খামারে ধান যাবে না।
দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর, ২৪ পরগনা, খুলনা, যশোর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীসহ অবিভক্ত বাংলার অন্তত ১৯টি জেলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন।
তেভাগা আন্দোলন একক কোনো অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। উত্তর বঙ্গ থেকে শুরু করে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার গ্রামীণ এলাকায় এটি এক গণবিপ্লবে রূপ নেয়।
দিনাজপুর ছিল তেভাগা আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি। রূপনারায়ণপুর, খানপুর ও চিরিরবন্দরে হাজার হাজার কৃষক লাল ঝান্ডা হাতে রাস্তায় নেমে আসেন। কৃষক নেতা রূপনারায়ণ রায়, সুশীল সেন, অবনী লাহিড়ী, এবং চারু মজুমদারের মতো ব্যক্তিত্বরা এখানে নেতৃত্ব দেন। কৃষক রমণীরা দা, বঁটি, ঝাঁটা ও বাঁশের লাঠি হাতে জোতদার ও পুলিশের প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ, ক্যানিং ও সুন্দরবন অঞ্চলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কংসারী হালদার, জটাধারী পাইক প্রমুখ। এখানে আন্দোলন এতটাই তীব্র রূপ নেয় যে জোতদারেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পালাতে বাধ্য হয়। কৃষকেরা নিজেরাই জমি শাসন ও ফসল বণ্টনের দায়িত্ব নেয়।
ময়মনসিংহের সুসং দুর্গাপুর ও হাজং অধ্যুষিত অঞ্চলে তেভাগার সাথে যুক্ত হয় ‘টঙ্ক প্রথা’ উচ্ছেদের আন্দোলন। মনি সিংহ-এর নেতৃত্বে হাজং ও গারো সম্প্রদায়ের কৃষকেরা অস্ত্রধারী জমিদারদের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। রাসিমণি ও সরস্বতী দেবীর মতো হাজং নারীরা এখানে জীবন উৎসর্গ করে শহিদ হন।
তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল দিক ছিল গ্রামীণ নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। পুরুষেরা যখন পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থাকতেন, তখন নারীরাই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতেন। তারা গঠন করেছিলেন ‘নারী আত্মরক্ষা সমিতি’ এবং তৈরি করেছিলেন নিজস্ব লাঠি ও দা-বাহিনী।
তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ইলা মিত্র। রাজশাহীর নবাবগঞ্জ মহকুমার নাচোলে সাঁওতাল ও প্রান্তিক কৃষকদের সংঘটিত করে তিনি তেভাগা আন্দোলনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। সাঁওতালরা তাঁকে ভালোবেসে নাম দিয়েছিল ‘রানী মা’ বা ‘নাচোলের রানী’।
তেভাগা আন্দোলন শান্তিপূর্ণ উপায়ে শোষণের অবসান চেয়েছিল, কিন্তু শাসকশ্রেণী ও জোতদারেরা পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে তা রক্তে ভাসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, দিনাজপুরের বালুরঘাট থানার খানপুর গ্রামে ঐতিহাসিক গণহত্যা ঘটে। পুলিশ ও জোতদারদের সশস্ত্র বাহিনী আধিয়ারদের ঘরে ঢুকে ধান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে কৃষকেরা শঙ্খ বাজিয়ে ও মাদল পিটিয়ে বার্তা ছড়িয়ে দেয়। হাজার হাজার কৃষক বাঁশ, ধনুক ও দা নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়।
পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঘটনাস্তলেই শহিদ হন ২২ জন কৃষক ও নারীকর্মী। এদের মধ্যে যশোদা দেবী, চিয়ারসায়ি শেখ, গুরুদাস বর্মন প্রমুখ অন্যতম। এই রক্তপাত কৃষক সমাজকে দমাতে পারেনি, বরং তেভাগার আগুনকে আরও দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
বাংলার গ্রামীণ জীবন, পঞ্জিকার দিনপঞ্জি এবং কৃষিজ সংস্কৃতির সঙ্গে তেভাগা আন্দোলনের এক অদ্ভুত ও গভীর মেলবন্ধন ছিল।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী অগ্রহায়ণ মাস মানেই নবান্ন—নতুন ধানের ঘ্রাণ, পিঠাপুলি আর নতুন আনন্দের উৎসব। কিন্তু তেভাগা আন্দোলনের আগে পর্যন্ত আধিয়ার কৃষকের কাছে নবান্ন কোনো আনন্দ আনত না। অগ্রহায়ণের সকালে মেহনত করে কাটা ধান যখন জোতদারের গোলায় চলে যেত, তখন কৃষক পরিবারে নেমে আসত চরম অন্ধকার।
তেভাগা আন্দোলন নবান্ন উৎসবকে তার প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে দিয়েছিল। কৃষকেরা আত্মমর্যাদার সাথে বলতে পেরেছিল, “আমাদের ঘামে ফলা ধান, আমাদের ঘরেই উঠবে।”
তেভাগা আন্দোলন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
যদিও তৎকালীন পুলিশি দমনপীড়ন এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের রাজনৈতিক ডামাডোলে তেভাগা আন্দোলন সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়েছিল, কিন্তু এর দূরপ্রসারী প্রভাব ছিল অপরিসীম।
১. আইনি স্বীকৃতি (পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ):
২. কৃষকের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ: তেভাগা আন্দোলন প্রমাণ করেছিল যে, গ্রামীণ নিপীড়িত কৃষকেরা সংগঠিত হলে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামন্তপ্রভুদের কাঁপিয়ে দিতে পারে। এই আন্দোলন পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিতে বামপন্থী ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম শক্ত ভিটি তৈরি করে।
তেভাগা আন্দোলন শুধু এক অতীত ইতিহাস নয়, এটি অধিকার আদায়ের এক চিরন্তন বাতিঘর। আজ যখন আমরা অগ্রহায়ণ বা পৌষের নবান্নে নতুন ধানের গন্ধে মেতে উঠি, কিংবা শুভ মুহূর্ত ও পঞ্জিকার পাতা উল্টে গ্রামীণ জীবনকে প্রত্যক্ষ করি, তখন আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন সেই রক্তঝরা দিনগুলোর কথা।
যে মাটিতে সুশীল সেন, ইলা মিত্র, রাসিমণি বা যশোদা দেবীদের রক্ত মিশে রয়েছে, সেই মাটি কেবল ফসলের নয়, বীরত্বেরও। “নিজ খামারে ধান তোলো”—এই স্লোগান আজ কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, এটি বাঙালি জাতির প্রতিরোধ ও অধিকার সচেতনতার এক অমর প্রতীক।
তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল—জমিতে উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ (তেভাগা) পাবেন আধিয়ার বা ভাগচাষী, এবং এক ভাগ পাবেন জমির মালিক বা জোতদার। এছাড়া জোতদারের বদলে আধিয়ারের নিজস্ব খামারে ধান তোলা এবং বেআইনি তোল্লা ও সুদ বন্ধের দাবিও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইলা মিত্র ছিলেন তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী। তিনি রাজশাহী অঞ্চলের নাচোল ও তার আশপাশের সাঁওতাল ও প্রান্তিক কৃষকদের সংঘটিত করে এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। কৃষকেরা তাঁকে ভালোবেসে ‘নাচোলের রানী’ বলত। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি পুলিশের হাতে চরম নির্যাতনের শিকার হন, কিন্তু কৃষকদের গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি।
তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার আহ্বানে অবিভক্ত বাংলায় শুরু হয়। এটি মূলত দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর, ২৪ পরগনা, খুলনা ও রাজশাহীর মতো অন্তত ১৯টি জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন সময়ে আন্দোলনটি পুলিশি চাপে দমে গেলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিল বিশাল। এর ফলেই ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা হয়। আবার পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে 'অপারেশন বার্গা'র মাধ্যমে ভাগচাষীদের জমিতে স্থায়িত্ব ও ফসল পাওয়ার আইনি অধিকার দেওয়া হয়, যার মূল ভিত্তি ছিল তেভাগা আন্দোলনের সংগ্রাম।