← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

ভগিনী নিবেদিতা: আয়ারল্যান্ডের মার্গারেট থেকে বাংলার 'লোকমাতা', নিবেদিত এক ত্যাগের মহাকাব্য

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার

সুদূর আয়ারল্যান্ড থেকে এসে কীভাবে মার্গারেট নোবল বাংলার 'লোকমাতা' ভগিনী নিবেদিতা হয়ে উঠলেন? নারীশিক্ষা, প্লেগ মহামারি, স্বadeshi বিপ্লব ও বিজ্ঞানের বিকাশে তাঁর অমর অবদানের রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগে, সুদূর আয়ারল্যান্ডের সবুজ প্রান্তর ও আটলান্টিকের হাওয়া ছেড়ে গঙ্গার পলিমাটিঘেরা কলকাতায় এসেছিলেন এক তরুণী। গায়ের রং শ্বেতশুভ্র, পরনে সাধারণ সন্ন্যাসিনীর পোশাক, কিন্তু চোখে ভালোবাসার অসীম আলো। নাম মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। তবে বাংলা ও ভারতের ইতিহাস তাঁকে গ্রহণ করেছিল অন্য এক পবিত্র নামে—ভগিনী নিবেদিতা।

গুরু স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নাম দিয়েছিলেন 'নিবেদিতা', যার অর্থ—যিনি ঈশ্বরের চরণে ও মানবসেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিঃস্বার্থ মাতৃত্ব ও কাজের পরিধি দেখে তাঁকে ভূষিত করেছিলেন 'লোকমাতা' উপাধিতে। এক বিদেশী নারী কীভাবে নিজের দেশ, জাতি ও সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রাম, বাঙালি নারীর শিক্ষা, মহামারি প্রতিরোধ এবং বিজ্ঞান ও শিল্পকলার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাদাত্রী হয়ে উঠলেন—তা কেবল এক ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এক রূপকথাসম বাস্তব মহাকাব্য।

আয়ারল্যান্ডের মার্গারেট: শৈশব ও শিক্ষয়িত্রী জীবন

১৮৬৭ সালের ২৮শে অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যানন শহরে জন্ম নেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। তাঁর পিতা স্যামুয়েল রচ নোবল ছিলেন ধর্মযাজক এবং মাতা মেরি ইজাবেল। শৈশব থেকেই মার্গারেট পরিবারে ঈশ্বরপ্রেম, মানবসেবা ও শোষিতের প্রতি সমবেদনার পাঠ পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা প্রায়ই বলতেন, "ঈশ্বর যখন তোমাকে কোনো বিশেষ শক্তি দেবেন, তখন তা মানবজাতির কল্যাণে বিলিয়ে দিয়ো।"

পিতার অকালপ্রয়াণের পর মার্গারেট অত্যন্ত কষ্ট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও শিক্ষাদানের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালোবাসা। আঠারো বছর বয়সে তিনি শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাবিদ পেস্তালোত্সি এবং ফ্রোবেলের শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা নীতি দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। লন্ডনে গিয়ে তিনি নিজস্ব ভাবনায় একটি প্রগতিশীল স্কুল গড়ে তোলেন, যার নাম ছিল 'রাসকিন স্কুল'। শিক্ষাবিদ হিসেবে লন্ডনের বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর পরিচিতি ও সুনাম তখন তুঙ্গে। কিন্তু ঈশ্বর তাঁর জন্য অন্য এক বৃহত্তর ভবিষ্যৎ চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের সান্নিধ্য ও জীবনের মোড় ঘোরা

১৮৯৫ সালের এক শীতের বিকেল। লন্ডনের এক ড্রয়িং রুমে ভারতীয় এক তরুণ সন্ন্যাসী বেদান্ত দর্শন ও হিন্দু ধর্ম বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ছে অগ্নিকণা, চোখ দুটোয় যেন এক অলৌকিক আকর্ষণ। সেই সন্ন্যাসী আর কেউ নন, স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ।

মার্গারেটও সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রথমদিকে তিনি বিবেকানন্দের চিন্তাভাবনাকে যুক্তি ও দর্শনের কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি অনুধাবন করলেন, এই গৈরিকবসনধারী ভারতীয় সাধুর মধ্যে কোনো ধর্মান্ধতা নেই, আছে সমগ্র মানবজাতির জন্য এক গভীর প্রেম। বিবেকানন্দ অনুভব করেছিলেন, পরাধীন ভারতের অধঃপতনের মূল কারণ হলো শিক্ষার অভাব এবং বিশেষ করে নারী সমাজের প্রতি অবহেলা।

একদিন বিবেকানন্দ সোজা মার্গারেটের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন:

"ভারতের জন্য একজন নারীর প্রয়োজন—যে নারী সিংহের মতো সাহসী, আবার মায়ের মতো মমতাময়ী। এমন এক নারী, যে ভারতের নারীসমাজকে শিক্ষার আলো দেখাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে। মার্গারেট, আমার বিশ্বাস তুমিই সেই নারী।"

এই একটি বাক্যই মার্গারেটের জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। আয়ারল্যান্ডের আরামদায়ক জীবন, বাগদান পর্ব ও কর্মজীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এক নিমেষে তুচ্ছ মনে হলো তাঁর কাছে। তিনি স্থির করলেন, ভারতই হবে তাঁর কর্মভূমি, ভারতবাসীই হবে তাঁর আপনজন।

কলকাতায় আগমন ও 'নিবেদিতা' রূপে পুনর্জন্ম

১৮৯৮ সালের ২৮শে জানুয়ারি। কনকনে শীতের সকালে 'মোম্বাসা' জাহাজে চড়ে কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে পা রাখলেন মার্গারেট নোবল। ভারতভূমিকে তিনি কোনো ঔপনিবেশিক শাসকের চোখে দেখেননি, দেখেছিলাম এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে।

একই বছরের ২৫শে মার্চ স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'ব্রহ্মচর্য' ব্রতে দীক্ষিত করেন। তিনি মার্গারেটের নাম রাখেন 'নিবেদিতা'। বিবেকানন্দ তাঁর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন—"যাও, শিবের চরণে অর্পিত পুষ্পের মতো তোমার জীবন ধন্য হোক।" সেদিনের পর থেকে মার্গারেট নোবল হারিয়ে গেলেন, জন্ম হলো ভগিনী নিবেদিতার।

কলকাতা শহরের গরম, মশা, দারিদ্র্য ও অচেনা সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া একজন ইউরোপীয় নারীর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু নিবেদিতাকে কোনো প্রতিকূলতাই থামাতে পারেনি। তিনি উত্তর কলকাতার বাগবাজারের এক পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে নিজের বাসস্থান গড়ে তোলেন এবং ভারতীয় জীবনযাত্রাকে আপন করে নেন।

বাগবাজারের বালিকা বিদ্যালয়: নারীশিক্ষায় এক ঐতিহাসিক বিপ্লব

১৮৯৮ সালের ১৩ই নভেম্বর। সেদিন ছিল পবিত্র কালীপূজা। পঞ্জিকার শুভ তিথিতে উত্তর কলকাতার ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনে নিবেদিতা স্থাপন করলেন একটি বালিকা বিদ্যালয়। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং শ্রীশ্রী সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যান্য সন্ন্যাসীগণ। সারদা দেবী নিবেদিতার স্কুলকে আন্তরিক আশীর্বাদ করে বলেছিলেন—"এই বিদ্যালয়ের ওপর জগজ্জননীর অশেষ কৃপা থাকবে, এখানকার ছাত্রীরা আদর্শ নারী হয়ে উঠবে।"

কিন্তু তৎকালীন বাঙালি সমাজে কুলীন প্রথা ও পর্দা প্রথার কড়াকড়ি এত বেশি ছিল যে, মেয়েদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানোকে অধর্ম মনে করা হতো। নিবেদিতা দমে যাননি। তিনি প্রতিদিন গ্রীষ্মের চড়া রোদ কিংবা বর্ষার মুষলধারায় উত্তর কলকাতার গলি থেকে গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের অনুনয় করতেন মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য। অনেক সময় তাঁকে অপমানিত হতে হয়েছে, কিন্তু নিবেদিতার হাসিমুখ ও পরম ভালোবাসার কাছে শেষ পর্যন্ত সমস্ত রক্ষণশীলতা ভেঙে পড়েছিল।

স্কুলে কেবল বর্ণমালা বা অঙ্ক শেখানো হতো না; সেলাই, শিল্পকলা, স্বাস্থ্যবিধি এবং জাতীয়তাবোধের শিক্ষাও দেওয়া হতো। বয়স্কা বিধবা নারীদের জন্যও তিনি সান্ধ্যকালীন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। আজকের বিখ্যাত 'ভগিনী নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়' নারীশিক্ষার সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবেরই রক্তমাংসের প্রতীক।

প্লেগ মহামারি ও 'লোকমাতা' নিবেদিতা

১৮৯৯ সালের মার্চ মাস। হঠাৎ করেই কলকাতা শহরে নেমে এলো এক ভয়াবহ অভিশাপ—প্লেগ মহামারি। ছোঁয়াচে এই মরণব্যাধির ভয়ে মানুষ আতঙ্কে শহর ছেড়ে পালাতে লাগল। রোগী তো দূর, আত্মীয়স্বজনের মৃতদেহ সৎকার করার মতো লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। চারিদিকে কেবল আর্তনাদ ও লাশ।

ঠিক এই করুণ মুহূর্তে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হলেন ভগিনী নিবেদিতা। তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের তরুণদের নিয়ে গঠন করলেন 'প্লেগ ত্রাণ কমিটি'। বাগবাজার, চিত্পুর ও বস্তি এলাকাগুলোতে তিনি নিজে হাতঝাড়ু নিয়ে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে নেমে পড়লেন। জীবানু মুক্ত করার জন্য গলি গলিতে ছিটালেন চুন ও কার্বলিক অ্যাসিড।

রোগীদের বাড়িতে গিয়ে তিনি তাঁদের শুশ্রূষা করতেন, ওষুধ খাইয়ে দিতেন, আর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন—"ভয় পেয়ো না, আমি আছি।" নিজের হাতে বহু প্লেগ আক্রান্ত শিশুকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন তিনি। বহু অনাথ শিশুকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর এই অলৌকিক আত্মত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে চমকে গিয়েছিল কলকাতার তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনও। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় নিবেদিতাকে খুব কাছ থেকে দেখেন এবং গভীরভাবে অভিভূত হয়ে লেখেন, নিবেদিতা কেবল সেবা করেননি, তিনি যেন নিখিল ভারতের 'লোকমাতা' হিসেবে ধরা দিয়েছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সশস্ত্র বিপ্লবীদের প্রেরণা

১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়াণ নিবেদিতার জীবনের এক চরম আঘাত ছিল। কিন্তু গুরুর প্রয়াণের পর তিনি নিজেকে আরও তীব্রভাবে দেশের কাজে সঁপে দেন। বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন ভারত আধ্যাত্মিকভাবে স্বাধীন হোক, আর নিবেদিতা অনুধাবন করলেন পরাধীন ভারতের মুক্তি ছাড়া এই দেশের আত্মিক বা সামাজিক বিকাশ সম্ভব নয়।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিয়ম ছিল তারা কোনো প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়াবে না। নিবেদিতা মঠের সেই নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং মঠকে ব্রিটিশ সরকারের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করার জন্য রামকৃষ্ণ মিশন থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। তবে মঠের সাথে তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক সারা জীবন অটুট ছিল।

এরপর নিবেদিতা সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়েন ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে:

সায়েন্স ও আর্ট: আচার্য জগদীশচন্দ্র ও নন্দলাল বসুর পেছনে অদৃশ্য শক্তি

বাংলা তথা ভারতের বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ইতিহাসে ভগিনী নিবেদিতার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকার যোগ্য, যা বহু সময় ইতিহাসের মূল আলোচনায় আড়ালে থেকে যায়।

১. বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ও নিবেদিতা

ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু যখন উদ্ভাবন করলেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে এবং বেতার তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করলেন, তখন বর্ণবাদী ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক মহল তাঁর এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। উপরন্তু, রয়্যাল সোসাইটিতে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছিল। জগদীশচন্দ্র আর্থিক সংকটে পড়ে গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।

এই কঠিন সময়ে নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের পাশে এসে দাঁড়ান পর্বতপ্রমাণ সাহস হয়ে। নিবেদিতা অনুধাবন করেছিলেন, জগদীশচন্দ্রের জয় মানেই ভারতীয় বিজ্ঞানের জয়। তিনি দিনের পর দিন জগদীশচন্দ্রের জটিল বৈজ্ঞানিক ইংরেজি লেখাগুলো নিজে বসে সম্পাদনা করে দিতেন। বহু অর্থের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তাঁর ল্যাবরেটরির জন্য। নিবেদিতার উৎসাহেই জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। জগদীশচন্দ্র নিবেদিতাকে মানতেন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণা হিসেবে।

২. ভারতীয় আধুনিক চিত্রশিল্পের পুনর্জাগরণ

নিবেদিতা বিশ্বাস করতেন, শিল্পকলায় নিজের ঐতিহ্যকে ভুলে কোনো জাতি স্বকীয়তা লাভ করতে পারে না। তিনি তরুণ শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নন্দলাল বসুকে অনুপ্রাণিত করেন পাশ্চাত্য অনুকরণ ছেড়ে ভারতের প্রাচীন অজন্তা, ইলোরা ও রাজপুত চিত্রকলার মূল আত্মাকে খুঁজে নিতে। নিবেদিতা নিজে উদ্যোগ নিয়ে নন্দলাল বসু ও অসিতকুমার হালদারকে অজন্তার গুহাচিত্র অনুকরণ ও অধ্যয়নের জন্য পাঠিয়েছিলেন। আজকের যে 'বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট' বা ভারতীয় আধুনিক চিত্রশিল্প, তার নেপথ্যে নিবেদিতার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনস্বীকার্য।

মা সারদা ও নিবেদিতার অলৌকিক বন্ধন

শ্রীশ্রী সারদা দেবী ছিলেন নিবেদিতার জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের বিরাট ফারাক থাকা সত্ত্বেও মা সারদা ও নিবেদিতার সম্পর্কের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না। সারদা দেবী নিবেদিতাকে ভালোবেসে ডাকতেন 'খুকি'।

তৎকালীন সামাজিক বাধানিষেধের তোয়াক্কা না করে সারদা দেবী নিবেদিতাকে নিজের ঘরে ঠাঁই দিয়েছিলেন, তাঁর সাথে একসাথে খেতেন। এই দৃশ্য দেখে উত্তর কলকাতার রক্ষণশীল সমাজও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিবেদিতা লিখতেন—"মা সারদার ভালোবাসা হলো এক মহাসমুদ্রের মতো, যার সামনে দাঁড়ালে পৃথিবীর সব পার্থিব বৈষম্য তুচ্ছ হয়ে যায়।"

বাংলার কালচার, উৎসব ও পঞ্জিকার শুভ ভাবনায় নিবেদিতা

ভগিনী নিবেদিতা কেবল রাজনীতি বা শিক্ষা নয়, বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, উৎসব ও লোকজ জীবনকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। দুর্গাপূজা, কালীপূজা কিংবা সরস্বতী পূজার পেছনের যে দার্শনিক চেতনা, তা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন।

পঞ্জিকার পাতা উল্টে বাঙালি যখন শুভ তিথিতে কোনো নতুন কাজ শুরু করে, তখন বাগবাজারের সেই একশ বছর আগের কালীপূজার দিনটি মনে পড়ে যায়। ১৩ই নভেম্বর, ১৮৯৮—মা কালীর আরাধনার শুভ তিথিতেই তিনি জ্বালিয়েছিলেন মেয়েদের শিক্ষার প্রথম আলো। নিবেদিতা বলতেন, "দুর্গা বা কালী কেবল দেবী নন, তিনি হলেন শক্তির প্রতীক। ভারতের প্রতিটি নারীর মধ্যে সেই শক্তির সুপ্ত প্রকাশ ঘটাতে হবে।"

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্প্রীতি ও মিলনের বাণীকে তিনি সারা বিশ্বের সামনে তাঁর বিখ্যাত বই 'The Web of Indian Life' এবং 'Cradle Tales of Hinduism'—এর মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন।

শেষ দিনগুলো: দার্জিলিংয়ের মেঘের কোলে শেষযাত্রা

দেশসেবা, আন্দোলন, লেখনী এবং স্কুলের অক্লান্ত পরিশ্রমে নিবেদিতার শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। এর মধ্যে তিনি মারাত্মক ম্যালেরিয়া ও রক্তের আমাশয় রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা তাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন।

১৯১১ সালের অক্টোবর মাস। আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং তাঁর স্ত্রী অবলা বসু নিবেদিতাকে নিয়ে যান পাহাড়ি শহর দার্জিলিংয়ে। সেখানে ঐতিহাসিক 'রায় ভিলা' (Roy Villa)-য় রাখা হয় তাঁকে। কিন্তু ততদিনে তাঁর শরীরের সমস্ত জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছে।

১৯১১ সালের ১৩ই অক্টোবর, ভোরবেলা। দার্জিলিংয়ের আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটছে, কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ ঢাকা চূড়ায় ঝরে পড়ছে সোনালী রোদ। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে এই মহান আত্মত্যাগী নারী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর শেষ কথা ছিল:

"The boat is sinking, but I shall see the sun rise." (নৌকা ডুবছে, কিন্তু আমি সূর্যোদয় দেখতে পাচ্ছি।)

দার্জিলিংয়ের শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। আজও দার্জিলিংয়ের সেই সমাধিসৌধে পাথরের ওপর খোদাই করা রয়েছে সেই ঐতিহাসিক বাক্যটি:

"Here reposeth Sister Nivedita who gave her all to India" (এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ভগিনী নিবেদিতা, যিনি ভারতকে তাঁর সর্বস্ব দান করেছিলেন।)

উপসংহার: বাঙালির হৃদয়ে নিবেদিতার অমর ঐতিহ্য

ভগিনী নিবেদিতা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আলো ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার প্রতীক। একজন আইরিশ নারী হয়েও তিনি যেভাবে বাংলা ভাষাকে ভালোবেসেছিলেন, বাঙালিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য নিজের রক্ত-জল করা পরিশ্রম বিসর্জন দিয়েছিলেন—তা ইতিহাসের পাতায় বিরল।

আজও বাগবাজারের বোসপাড়া লেন দিয়ে হাঁটলে যেন মনে হয় সেই শ্বেতশুভ্র পোশাক পরা নারীটি প্রতিটি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ছেন মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য। পঞ্জিকার পাতায় শরৎকালের আগমন ঘটে, দুর্গাপূজা বা কালীপূজার ঢাক বাজে, আর বাঙালি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাঁর সেই 'লোকমাতা'কে—যিনি সুদূর আয়ারল্যান্ড থেকে এসে আমাদের শিখিয়ে গিয়েছিলেন কীভাবে স্বদেশকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে মানুষের সেবায় নিজেকে নিবেদন করতে হয়।


সাধারণ প্রশ্ন

১. ভগিনী নিবেদিতার প্রকৃত নাম কী ছিল এবং তিনি কোন দেশের মানুষ ছিলেন?

ভগিনী নিবেদিতার আসল নাম ছিল মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। তিনি আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যানন শহরে ১৮৬৭ সালের ২৮শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা হয়ে তিনি ভারতে আসেন এবং 'নিবেদিতা' নাম গ্রহণ করেন।

২. স্বামী বিবেকানন্দ কেন মার্গারেটকে 'নিবেদিতা' নাম দিয়েছিলেন?

১৮৯৮ সালের ২৫শে মার্চ স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটকে ব্রহ্মচর্য ব্রতে দীক্ষিত করেন। 'নিবেদিতা' শব্দের অর্থ হলো 'ঈশ্বর বা মানবসেবায় সমর্পিত বা নিবেদিতপ্রাণ'। ভারতের নারীশিক্ষা ও মানবকল্যাণে মার্গারেটের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের সংকল্প দেখেই বিবেকানন্দ তাঁকে এই নাম দেন।

৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন নিবেদিতাকে 'লোকমাতা' আখ্যা দিয়েছিলেন?

১৮৯৯ সালে কলকাতায় যখন ভয়াবহ প্লেগ মহামারি দেখা দেয়, তখন নিবেদিতা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কলকাতার নোংরা গলি পরিষ্কার করেন এবং আক্রান্ত রোগীদের নিজ হাতে শুশ্রূষা করেন। এই অসাধারণ জনসেবা, মাতৃস্নেহ ও সর্বস্তরের মানুষকে ভালোবাসার মহান রূপ দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'লোকমাতা' (সমগ্র জনগণের মা) বলে ভূষিত করেছিলেন।

৪. বিজ্ঞান ও শিল্পকলায় ভগিনী নিবেদিতার ভূমিকা কী ছিল?

ভগিনী নিবেদিতা মহান বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণায় আর্থিক ও মানসিকভাবে সাহায্য করেছিলেন এবং তাঁর জটিল গবেষণাপত্রগুলো নিজে সম্পাদনা করতেন। পাশাপাশি, তিনি নন্দলাল বসু ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শিল্পীদের ভারতীয় প্রাচীন চিত্রকলার মূল আত্মাকে পুনরুদ্ধার করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, যা আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার ভিত্তি স্থাপন করে।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার