← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

সত্যেন্দ্রনাথ বসু: বোসন কণার জনক, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের বাঙালি কিংবদন্তি ও বিজ্ঞান-সাধনার মহাকাব্য

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান ও বোসন কণার আবিষ্কারক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বর্ণময় জীবন, বিজ্ঞানসাধনা এবং মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার অমর অবদানের সম্পূর্ণ ইতিহাস।

মহাবিশ্বের অর্ধেক কণা যার নামে: সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অনন্য পরিচয়

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বিশাল জগতে মাত্র দুজন বিজ্ঞানীর নামে মহাবিশ্বের মৌলিক কণাসমূহকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে— একটি হলো 'ফার্মিয়ন' (ইতালীয় বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মির নামে) এবং অপরটি হলো 'বোসন' (বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে)। আজ বিশ্বজুড়ে যে হিগস বোসন বা 'ঈশ্বর কণা' নিয়ে আলোড়ন, তেজস্ক্রিয় আলো থেকে শুরু করে লেজার রশ্মি ও সুপারকন্ডাক্টিভিটির ব্যাখ্যা— এই সবকিছুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল একজন বাঙালির হাতে। তিনি আর কেউ নন, বিশ্ববরেণ্য পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন পাশ্চাত্য বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একচ্ছত্র অধিপতি, ঠিক সেই সময় তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মাটি থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমঞ্চে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি। মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সমকক্ষ গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের গণনায় তিনি যা উপস্থাপন করেছিলেন, তা পরবর্তীতে 'বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান' (Bose-Einstein Statistics) নামে স্বীকৃত হয়। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ বসু কেবল একজন ধরাছোঁয়ার বাইরের অসামান্য বিজ্ঞানীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীতরসিক, বহুভাষাবিদ, সাহিত্যপ্রেমী এবং মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার পরম অনুরাগী প্রবক্তা।

শৈশব, পরিবার ও মেধার প্রথম স্ফুরণ (১৮৯৪–১৯১৫)

১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি (বাংলা ১৭ই পৌষ, ১২০০০ বঙ্গাব্দ) উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলের ঈশ্বর মিস্ত্রি লেনে জন্মগ্রহণ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন পূর্ব ভারতীয় রেলওয়ের হিসাব বিভাগের কর্মচারী এবং মা আমাদিনী দেবী ছিলেন গৃহবধূ। সাত ভাইবোনের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন সবার বড়। অত্যন্ত সাধারণ এক বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠলেও শৈশব থেকেই তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও গণিতের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ পেতে শুরু করে।

সত্যেন্দ্রনাথের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় সাধারণ একটি বাংলা স্কুলে। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার ভবানীপুরে স্থানান্তরিত হলে তিনি নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে ভর্তি হন। এরপর হিন্দু স্কুলে স্থানান্তরিত হন তিনি। হিন্দু স্কুলে পড়ার সময়ই একটি বিখ্যাত ঘটনা ঘটেছিল— নবম শ্রেণীর পরীক্ষায় গণিতের শিক্ষক উপেন্দ্রনাথ বক্সী তাঁকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১১০ দিয়েছিলেন! শিক্ষক মহাশয় খাতার নিচে লিখে দিয়েছিলেন, সত্যেন নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট উপায়ে অঙ্কের সমাধান তো করেছেই, তার সাথে অত্যন্ত কম সময়ে আরও একাধিক বিকল্প উপায়ে সঠিক সমাধান বের করেছে।

১৯০৯ সালে হিন্দু স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ভর্তি হন কলকাতার ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে তিনি বিজ্ঞান শাখায় প্রবেশ করেন। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বেঙ্গল রেনেসাঁ বা বাংলা নবজাগরণের যে প্রজ্ঞা ও বিদ্যানুরাগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল— যা পূর্বে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা আধুনিক শিক্ষার অগ্রদূতদের মাধ্যমে রূপ পেয়েছিল— সেই ধারারই শ্রেষ্ঠ ফল ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ।

প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি শিক্ষক হিসেবে পান আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো মহীরূহদের। আবার সহপাঠী হিসেবে পান মেঘনাদ সাহা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের মতো উজ্জ্বল রথী-মহারথীদের। ১৯১৩ সালে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বি.এসসি পাশ করেন সত্যেন বসু এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে (Applied Mathematics) এম.এসসি পরীক্ষায় পুনরায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁর প্রাপ্ত নম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড গড়েছিল, যা বহু বছর ধরে অক্ষুণ্ণ ছিল।

রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: বিজ্ঞানচর্চার সূচনা

এম.এসসি পাশ করার পর ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পঠনপাঠন ও গবেষণার জন্য রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তরুণ ও অত্যন্ত মেধাবী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং মেঘনাদ সাহাকে সেখানে গণিত ও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর জন্য প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

সেসময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব বা আপেক্ষিকতার তত্ত্বের ভালো বইপুস্তক বা ল্যাবরেটরি ছিল না। অধিকাংশ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতো জার্মান বা ফরাসি ভাষায়। সত্যেন্দ্রনাথ এবং মেঘনাদ সাহা নিজেদের চেষ্টায় অত্যন্ত দ্রুত জার্মান ও ফরাসি ভাষা শিখে ফেলেন এবং আলবার্ট আইনস্টাইন ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের মূল গবেষণাপত্রগুলো সরাসরি অনুবাদ করে পড়তে ও ছাত্রদের পড়াতে শুরু করেন। ১৯২০ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা যৌথভাবে আইনস্টাইনের সাধারণ ও বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, যা ছিল বিশ্বসাহিত্যে আইনস্টাইনের কাজের প্রথম ইংরেজি সংস্করণ।

১৯২১ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে নতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সত্যেন্দ্রনাথ বসু সেখানে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে 'রিডার' (Reader) হিসেবে যোগ দেন। ঢাকার রমনা প্রাঙ্গণে শান্ত ও নিভৃত পরিবেশে শুরু হয় তাঁর নতুন গবেষণাজীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানকালেই তিনি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কারটি করেন, যা বিশ্ববিজ্ঞানের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

১৯২৪ সালের মাহেন্দ্রক্ষণ: আইনস্টাইনকে লেখা সেই ঐতিহাসিক চিঠি

১৯২৪ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোককণা বা ফটোন (Photon) নিয়ে ছাত্রদের ক্লাস নিচ্ছিলেন অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেসময় বিজ্ঞানে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের 'বিকিরণ সূত্র' (Planck's Radiation Law) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই সূত্রের গাণিতিক প্রমাণ দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের কিছু অনুমানের ওপর নির্ভর করতেন। সত্যেন্দ্রনাথ লক্ষ করলেন, ক্লাসিক্যাল থিওরির সাহায্য নিয়ে কোয়ান্টাম সূত্রের প্রমাণ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়; এটি একটি বৈজ্ঞানিক স্ববিরোধিতা।

তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে, ধ্রুপদী বিজ্ঞানের সমস্ত ধারণা দূরে সরিয়ে রেখে, বিশুদ্ধ পরিসংখ্যান ও কোয়ান্টাম ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্ল্যাঙ্কের বিকিরণ সূত্রের একটি সম্পূর্ণ নতুন গাণিতিক ব্যুৎপত্তি (Derivation) তৈরি করেন। তিনি ধরে নেন যে, আলোককণা বা ফটোনগুলো একে অপরের থেকে অভিন্ন এবং তারা নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম শক্তিস্তরে একটি বিশেষ নিয়ম মেনে অবস্থান করে।

তিনি তাঁর এই গবেষণাপত্রটি পাঠাতে চেয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত 'ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন' (Philosophical Magazine)-এ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পত্রিকাটির সম্পাদকরা সত্যেন্দ্রনাথের উদ্ভাবনী ধারণার গভীরতা বুঝতে না পেরে লেখাটি প্রত্যাখ্যান করেন।

হতভম্ব না হয়ে তরুণ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ ১৯২৪ সালের ৪ জুন সরাসরি এক চিঠি লেখেন মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে। চিঠিতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তিনি লেখেন:

"মহাশয়, আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে এই গবেষণাপত্রটি আপনার পর্যালোচনার জন্য পাঠাচ্ছি। আপনি দেখতে পাবেন যে, আমি ধ্রুপদী তড়িৎ-গতিবিদ্যার কোনো সাহায্য ছাড়াই প্ল্যাঙ্কের সূত্রের একটি স্বাধীন প্রমাণ তৈরি করার চেষ্টা করেছি..."

আইনস্টাইন চিঠিটি এবং সাথে পাঠানো চার পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রটি পড়ে স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি মুহূর্তেই বুঝতে পারেন, এই অনামধেয় বাঙালি তরুণ কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের এক বিরাট জটিল জট খুলে ফেলেছেন! আইনস্টাইন নিজে সেই গবেষণাপত্রটি বাংলা থেকে অনুপ্রাণিত সত্যেন্দ্রনাথের ইংরেজি রূপ থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন এবং নিজ দায়িত্বে বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা 'ৎসেশ্রিফট ফ্যুয়ার ফিজিক' (Zeitschrift für Physik)-এ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেন। আইনস্টাইন সেখানে লেখেন: "বসুর এই প্রমাণটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সূচিত করে।"

আইনস্টাইন কেবল বসু-র প্রবন্ধ প্রকাশেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এই ধারণাকে আলোর কণা থেকে প্রসারিত করে বস্তুকণা বা আণবিক গ্যাসের ওপর প্রয়োগ করেন। এই যৌথ চিন্তাভাবনার ফসলই হলো আজ বিখ্যাত 'বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান' (Bose-Einstein Statistics)।

'বোসন' কণা ও বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট

পদার্থবিজ্ঞানে সত্যেন্দ্রনাথের অবদান ঠিক কতটা গভীর, তা বুঝতে হলে পরমাণুর ভেতরের জগতে তাকাতে হয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত মৌলিক কণাকে দুটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়:

সত্যেন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের এই গণিত থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এক অভূতপূর্ব থিওরি— বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন বা বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট (Bose-Einstein Condensate - BEC)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো গ্যাসীয় পদার্থকে যদি পরম শূন্য তাপমাত্রায় (-২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নামিয়ে আনা হয়, তবে সমস্ত পরমাণু তাদের পৃথক সত্তা হারিয়ে একটি মাত্র 'মহাপরমাণু' বা 'সুপার-অ্যাটম'-এর মতো আচরণ করতে শুরু করে। এটি পদার্থের পঞ্চম অবস্থা নামে পরিচিত।

১৯২৪ সালের এই তত্ত্বটি গবেষণাগারে তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ৭১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে বিজ্ঞানী এরিক কর্নেল, কার্ল ওয়াইম্যান এবং উলফগ্যাং কেটারলে গবেষণাগারে প্রথম 'বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট' তৈরি করতে সক্ষম হন এবং ২০০১ সালে এর জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। একইভাবে ২০১২ সালে ইউরোপের 'সার্ন' (CERN)-এর বৃহৎ হ্যাড্রন সংঘর্ষকে (LHC) যে হিগস বোসন আবিষ্কৃত হয়, তাও সত্যেন্দ্রনাথের প্রবর্তিত বোসন ধারণারই বাস্তব রূপ।

ইউরোপ সফর ও বিশ্ববিজ্ঞানের আঙিনায় সত্যেন বসু

আইনস্টাইনের সুপারিশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'বছরের দীর্ঘ ছুটি নিয়ে ১৯২৪ সালের শেষের দিকে সত্যেন্দ্রনাথ ইউরোপ যাত্রা করেন। সেখানে তিনি বার্লিন, প্যারিস ও ইউরোপের প্রধান প্রধান বিজ্ঞান কেন্দ্রে দুই বছর কাটান।

প্যারিসে তিনি বিখ্যাত তেজস্ক্রিয়তা গবেষক মারি ক্যুরি (Madame Curie)-র ল্যাবরেটরিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপের কৌশল শেখেন। সেখানে তিনি ফরাসি বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রয় (Louis de Broglie)-এর সাথেও কাজ করেন। এরপর তিনি বার্লিনে যান এবং দীর্ঘকাঙ্ক্ষিত মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। আইনস্টাইন তাঁকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের মধ্যে একাধিক বৈজ্ঞানিক বিষয়ে গভীর আলোচনা হয়। সেখানে তিনি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, ওল্ফগ্যাং পৌলির মতো কোয়ান্টাম বিপ্লবের মূল রূপকারদের সান্নিধ্যে আসেন।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা: "যাঁরা বলেন বাংলায় বিজ্ঞান হয় না..."

সত্যেন্দ্রনাথ বসু কেবল গবেষণাগারের চারদেওয়ালে আবদ্ধ বিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি ছিলেন চরম স্বদেশপ্রেমী ও বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ সেবক। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানকে যদি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হয়, তবে মাতৃভাষাই তার সেরা মাধ্যম।

তাঁর সেই অমর উক্তিটি আজ বাঙালি জাতির প্রেরণার উৎস:

"যাঁরা বলেন বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।"

১৯৪৮ সালে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ'। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মানুষের কাছে বাংলায় বিজ্ঞানকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা। পরিষদ থেকে তিনি 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' নামের একটি মাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। জটিল থেকে জটিলতর বৈজ্ঞানিক গবেষণার খবর, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্য সহজ বাংলায় এই পত্রিকায় লেখা হতো।

তিনি নিজে বিজ্ঞানের নতুন নতুন পারিভাষিক শব্দ বাংলায় তৈরি করেছিলেন। বিশ্বভারতীতে থাকাকালীনও তিনি উচ্চশিক্ষায় বাংলার ব্যবহারকে উৎসাহিত করেন। তৎকালীন সময়ে বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা কেবল ইংরেজিতেই সম্ভব— এই অন্ধ ধারণাকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু কঠোরভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন যে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানের কঠিনতম দর্শনও প্রকাশ করা সম্ভব।

সাহিত্য, সঙ্গীত ও রবীন্দ্রনাথের সাথে সখ্য

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ব্যক্তিত্বের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভা। তিনি কেবল গণিতবিদ ছিলেন না, ছিলেন এক উচ্চমানের সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি অত্যন্ত চমৎকার এসরাজ বাজাতে পারতেন। প্রখ্যাত ওস্তাদদের কাছ থেকে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন। অবসর সময়ে নিজের ঘরে বসে এসরাজ বাজানো ছিল তাঁর পরম আনন্দের বিষয়।

সাহিত্যের প্রতি তাঁর টান ছিল অসীম। তিনি ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, সংস্কৃত ও বিশ্বসাহিত্যে গভীর বুৎপত্তি রাখতেন। ফরাসি কবি র্যাঁবো বা বোদলেয়ারের কবিতা তিনি ফরাসি থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করতেন।

বিশ্বকোটিনন্দিত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সাথে সত্যেন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর জীবনের একমাত্র বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ 'বিশ্বপরিচয়' (১৯৩৭) রচনা করেন, তিনি সেটি অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন:

"তোমার নামের সাথে আমার এই সামান্য বিজ্ঞান পরিচয় গ্রন্থখানি যুক্ত করার অধিকার আমাকে দাও... তুমি বিজ্ঞানের দুর্গম পথের পথিক, তোমাকে আমার এই অভিনন্দন জানাই।"

বিশ্বকবির এই স্বীকৃতি ছিল সত্যেন্দ্রনাথের সার্বিক ব্যক্তিত্ব ও বিজ্ঞানসাধনার এক অপূর্ব মূল্যায়ন।

জাতীয় অধ্যাপক, পদ্মবিভূষণ ও পরবর্তী জীবন

১৯৪৫ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা অধ্যাপক (Khaira Professor) হিসেবে পুনরায় ফিরে আসেন এবং ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা 'উপাচার্য পদ' গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানজনক একাডেমিক পদ 'জাতীয় অধ্যাপক' (National Professor) হিসেবে নিযুক্ত করে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।

তিনি রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'পদ্মবিভূষণ' প্রদান করা হয়। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো (FRS) নির্বাচিত হন এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পরিষদের সদস্য পদ লাভ করেন।

কিন্তু এত সব বিশ্বজোড়া সম্মান ও খ্যাতি সত্ত্বেও সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন অতি সাধারণ পোশাক পরা, অমায়িক ও নিরহংকার একজন বাঙালি। কলকাতার সাধারণ আড্ডায়, ছাত্র-শিক্ষক বৈঠকে বা বিজ্ঞান পরিষদের আলোচনায় তাঁকে সবসময় পাওয়া যেত চটি পায়ে, সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায়, চুরুট হাতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে।

১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৮০ বছর বয়সে এই মহান মহাজাগতিক পথিক কলকাতায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাঙালির জীবনচর্চা, শুভ মুহূর্ত ও পঞ্জিকার ভাবনায় সত্যেন বসুর প্রাসঙ্গিকতা

বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী দিকগুলোর সাথে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বিজ্ঞানের যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর। বাঙালির ঐতিহ্যগত পঞ্জিকা গণনা, মহাজাগতিক গতিবিধি বা শুভ মুহূর্তের সময় নির্ধারণের পেছনে হাজার বছরের জ্যোতির্বিজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কাজ করে আসছে। বৈদিক কাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বাঙালির বর্ষপঞ্জি বা পঞ্জিকায় তিথি, নক্ষত্র, গ্রহণ ও রতু পরিবর্তনের যে হিসাব কষা হয়, তার মূলভিত্তি হলো মহাকাশবিজ্ঞান।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলতেন, প্রাচীন বাঙালির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল অতুলনীয়, তবে তাকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তির আলোয় বিচার করতে হবে। আজ যখন কোনো শুভ মুহূর্তে, পয়লা বৈশাখ বা শুভ উৎসবে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে উদযাপন করি, তখন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা আমাদের শেখায়— বিশ্বাসের সাথে যুক্তির, সংস্কৃতির সাথে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধিতা নেই। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার অর্থ নিজের অতীত ঐতিহ্যকে বাদ দেওয়া নয়, বরং তাকে কুসংস্কারমুক্ত করে আরও উজ্জ্বল করে তোলা।

নোবেল না পাওয়ার বিতর্ক ও বিশ্ববিজ্ঞানের বিচার

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবনগাথায় একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো: তিনি কেন নোবেল পুরস্কার পাননি? কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে যে আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে অন্তত দশজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন (যার মধ্যে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট আবিষ্কারক বিজ্ঞানীরাও রয়েছেন), সেই মূল সূত্রের জনক সত্যেন্দ্রনাথ নিজে নোবেল পাননি।

এই বিষয়ে যখনই সত্যেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করা হতো, তিনি অত্যন্ত শান্ত ও হাসিমুখে বলতেন:

"আমার যা পাওয়ার তা তো আমি পেয়েই গেছি। বিশ্ববিজ্ঞানে আমার নাম 'বোসন' কণার সাথে চিরতরে যুক্ত হয়ে গেছে, এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?"

বাস্তবিকই, নোবেল পুরস্কারের সীমানা পেরিয়ে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে, অণু-পরমাণুর প্রতিটি কণার শ্রেণীবিন্যাসে 'বোসন' হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ বসু চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।


সাধারণ প্রশ্ন

সত্যেন্দ্রনাথ বসু কেন বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত?

সত্যেন্দ্রনাথ বসু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে 'বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান' (Bose-Einstein Statistics) আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। ১৯২৪ সালে তিনি সম্পূর্ণ নতুন গাণিতিক পদ্ধতিতে কোয়ান্টাম কণার অবস্থান ও আচরণ ব্যাখ্যা করেন, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তাঁর নামানুসারেই মহাবিশ্বের আলোক ও বলবাহক কণাগুলোর নাম রাখা হয়েছে 'বোসন' (Boson)।

'বোসন' কণা (Boson particle) কী?

মহাবিশ্বের সমস্ত মৌলিক কণাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়— ফার্মিয়ন ও বোসন। যেসব কণা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে এবং একই শক্তিস্তরে একসাথে অবস্থান করতে পারে, সেগুলোকে বোসন কণা বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফটোন (আলোর কণা), গ্লুঅন এবং বিখ্যাত 'হিগস বোসন' (ঈশ্বর কণা) হলো বোসন কণা। বিজ্ঞানী পল ডির্যাক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সম্মানে এই নাম দেন।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান কী ছিল?

সত্যেন্দ্রনাথ বসু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে মাতৃভাষাতেই বিজ্ঞান চর্চা সবচেয়ে কার্যকর। তিনি ১৯৪৮ সালে 'বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ' প্রতিষ্ঠা করেন এবং 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' নামে একটি বাংলা বিজ্ঞান পত্রিকা চালু করেন। তিনি নিজে জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সহজ বাংলা পরিভাষা তৈরি করেন এবং বিজ্ঞানকে সাধারণ বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আজীবন কাজ করে যান।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সম্পর্ক কেমন ছিল?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সত্যেন্দ্রনাথের অত্যন্ত গভীর ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা একমাত্র বিজ্ঞানগ্রন্থ 'বিশ্বপরিচয়' (১৯৩৭) সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। এছাড়া শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞান চর্চা প্রসার ও বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনেও সত্যেন্দ্রনাথ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার