🌟 ব্যক্তিত্ব · ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার
জানবাজারের রাজবধূ থেকে লোকমাতা রানী রাসমণি — ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অসম সাহসী সংগ্রাম, দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা ও ঊনবিংশ শতকের বাংলায় এক অনন্য মহিয়সী নারীর অমর উপাখ্যান।
ঊনবিংশ শতকের বাংলায় যখন নবজাগরণের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তখন সমাজব্যবস্থা ছিল চরম পিতৃতান্ত্রিক এবং রক্ষণশীলতায় আচ্ছন্ন। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে সমাজ সংস্কারক হিসেবে পুরুষ রাজপুরুষদের পাশাপাশি এক সাধারণ পরিবারের নারী কীভাবে তাঁর মেধা, সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় গোটা বাংলাকে চমকে দিয়েছিলেন — সেই ইতিহাসের নাম রানী রাসমণি।
তিনি শুধু জানবাজারের বিশাল জমিদারির কর্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের 'লোকমাতা'। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্য ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তা তৎকালীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিরল। গঙ্গার জলে জেলেদের অধিকার রক্ষা থেকে শুরু করে ধর্মীয় স্বাধীনতার লড়াই — রাসমণি ছিলেন অপরাজেয়। আর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি — দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আগমন, যা বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২০০ সালের ১৩ই আশ্বিন, দুর্গাপূজার মহাষ্টমী তিথিতে) উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরের নিকটবর্তী কোণায় এক দরিদ্র মাহিষ্য কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাসমণি। বাবা হরেকৃষ্ণ দাস এবং মা রামপ্রিয়া দেবী মেয়ের নাম রেখেছিলেন 'রাসমণি'। শৈশবেই মাতৃহীন হন তিনি। দরিদ্র হলেও রাসমণি ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, দয়ালু এবং আত্মবিশ্বাসী।
মাত্র ১১ বছর বয়সে কলকাতার জানবাজারের ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদার রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে রাসমণির বিবাহ হয়। রাজচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও উদারমনস্ক ব্যক্তিত্ব। অল্প বয়সেই রাসমণি তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও গৃহ পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দেন। রাজচন্দ্র বাবুও স্ত্রীর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। যৌথভাবে তাঁরা বহু জনকল্যাণমূলক কাজ শুরু করেন। তবে রাসমণির জীবনের আসল পরীক্ষার সূচনা হয় ১৮৩৬ সালে, যখন মাত্র ৪৪ বছর বয়সে রাজচন্দ্র দাস পরলোক গমন করেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর রক্ষণশীল সমাজ আশা করেছিল, রাসমণি বিধবা হিসেবে পর্দার অন্তরালে থেকে ধর্মকর্মেই দিন কাটাবেন। আত্মীয়-স্বজন ও দেওয়ানদের ধারণা ছিল, বিশাল এই জমিদারি ও ব্যবসা পরিচালনা করা একজন নারীর পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাসমণি জানবাজারের বিশাল ভূসম্পত্তি ও ব্যবসার পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
তিনি কেবল সম্পত্তি রক্ষাই করেননি, বরং ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত করেন। ব্যাংকিং, জমিদারি, গঙ্গা বক্ষ বাণিজ্য এবং আবাসন ব্যবসার তদারকি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছিলেন। তাঁর বিচক্ষণতায় জানবাজারের জমিদারি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। তৎকালীন সমাজ তাঁকে উপাধি দেয় 'রানী' — যা কোনো সরকারি সনদ সূত্রে পাওয়া নয়, বরং প্রজা ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় অর্জিত।
রানী রাসমণির নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর অসম সাহসী ও কৌশলগত প্রতিরোধের জন্য। তিনি কেবল আইনি লড়াই লড়েননি, প্রয়োজনে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক চাপেও ফেলেছিলেন।
১৮৫০-এর দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঙ্গার (হুগলি নদী) ওপর চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষার অজুহাতে গঙ্গার নির্দিষ্ট অংশে মাছ ধরার ওপর কর আরোপ করে এবং সাধারণ ধীবর বা জেলেদের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে। এর ফলে হাজার হাজার দরিদ্র জেলে পরিবার অনাহারে পড়ার উপক্রম হয়।
জেলে সম্প্রদায় রানী রাসমণির কাছে সাহায্য চাইতে এলে রানী এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে গঙ্গার একটি বিশাল অংশ (ঘোলা থেকে শ্রীরামপুর পর্যন্ত) বার্ষিক ১০,০০০ টাকায় ইজারা বা জমা নেন। ইজারা নেওয়ার পর রানী গঙ্গার দু-প্রান্তে বিশাল মোটা শিকল ফেলে নদীর নৌপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এর ফলে ব্রিটিশদের বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ ও স্টিমার চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যখন এর কারণ জানতে চায়, রানী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে আইনি যুক্তি দেন:
"আমি তো সরকারের কাছ থেকেই গঙ্গার এই অংশ ইজারা নিয়েছি। গঙ্গার জলে আমার প্রজা জেলেরা যাতে শান্তিতে মাছ ধরতে পারে এবং বড় জাহাজের ধাক্কায় তাদের ডিঙি নৌকা ডুবে না যায়, তাই শিকল দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে।"
বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ সরকার জেলেদের ওপর থেকে সমস্ত কর তুলে নেয় এবং গঙ্গায় অবাধ মাছ ধরার অধিকার ফিরিয়ে দেয়। রানীও শিকল সরিয়ে নেন। এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সাধারণ ভারতীয় নারীর ঐতিহাসিক জয়।
জানবাজার রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা শেষে যখন বিসর্জনের শোভাযাত্রা বের হতো, তখন ঢাক-ঢোল ও সানাইয়ের বাদ্য বাজানো হতো। একবার এক ইংরেজ সাহেব শান্তিনষ্টের অভিযোগ তুলে পূজা বিসর্জনের শোভাযাত্রায় গান-বাজনা নিষিদ্ধ করে দেয় এবং রানীকে বিপুল অঙ্কের জরিমানা করে।
রানী রাসমণি ব্রিটিশ সরকারের এই অন্যায় নির্দেশ মেনে নেননি। তিনি জরিমানা প্রদান করেন ঠিকই, কিন্তু পরদিনই জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত প্রধান রাস্তা কাঠ দিয়ে ঘিরে যাতায়াত বন্ধ করে দেন। রাস্তাটি ছিল রানীর নিজস্ব জমি। ফলে কলকাতার প্রধান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ প্রশাসন অচল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সাহেব রানীর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন, জরিমানা ফেরত দেন এবং রানীকে ঐতিহ্য মেনে পূজা পার্বণের শোভাযাত্রা করার পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দেন।
রানী রাসমণি তাঁর অফুরন্ত সম্পদ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছিলেন। বাঙালির দৈনন্দিন জীবন ও কলকাতার স্থাপত্যের সাথে তাঁর অবদান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে:
রানী রাসমণির জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অমর কীর্তি হলো দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা। এই মন্দির নির্মাণের পেছনে রয়েছে এক অলৌকিক ও আবেগঘন ইতিহাস।
১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে রানী রাসমণি বিশাল বহর নিয়ে জাহাজে করে কাশী (বারাণসী) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বনাথ ও মা অন্নপূর্ণার দর্শন ও পূজা দেওয়া। যাত্রার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন, নৌকায় বিপুল ধনসম্পদ ও খাদ্য সামগ্রী বোঝাই করা হয়েছে। কিন্তু যাত্রার ঠিক আগের রাতে রানী এক স্বপ্নদেশ পান। স্বপ্নে জগজ্জননী দেবী কালী তাঁকে দর্শন দিয়ে বলেন:
"তোকে কাশী যেতে হবে না। গঙ্গার পূর্বতীরে এক মনোরম স্থানে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার ব্যবস্থা কর। আমি সেখানেই তোর পূজা গ্রহণ করব।"
স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে রানী তৎক্ষণাৎ কাশীযাত্রা স্থগিত করেন এবং গঙ্গার তীরে উপযুক্ত জমির সন্ধান শুরু করেন।
অবশেষে কলকাতার উত্তরে গঙ্গাতীরে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে প্রায় ৬০ বিঘা জমি পছন্দ করা হয়। স্থানটি ছিল এককালে সাহেবদের কুঠি এবং আংশিক গোরস্থান। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে একে 'কচ্ছপপৃষ্ঠ' আকৃতির পবিত্র স্থান বলে মনে করা হয়। ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৫ — দীর্ঘ আট বছর ধরে তৎকালীন বিপুল অর্থ (প্রায় সাড়ে নয় লক্ষ টাকা) ব্যয়ে নির্মিত হয় এই ঐতিহাসিক মন্দির।
মন্দির প্রাঙ্গণটিতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী 'নবরত্ন' স্থাপত্যশৈলীতে মূল কালী মন্দির নির্মিত হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে:
১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে মে, জ্যৈষ্ঠ মাসের শুভ স্নানযাত্রা তিথিতে পরম সমারোহে ভবতারিণী মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু সেই সময়ে সমাজে বর্ণপ্রথা ও জাতপাতের চরম প্রভাব ছিল। রানী রাসমণি ছিলেন শূদ্র (মাহিষ্য) সম্প্রদায়ের। তৎকালীন অর্থোডক্স বা রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজ এক শূদ্র নারীর প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে পুজো দিতে বা প্রসাদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
রানী এই সামাজিক বাধা অতিক্রম করতে ঝাড়বাটির পণ্ডিতদের পরামর্শ নেন। মেদিনীপুরের প্রখ্যাত পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায় (শ্রীরামকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা) সমাধান দেন যে, যদি মন্দিরটি কোনো ব্রাহ্মণকে দান করে দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে দেবীকে ভোগ নিবেদন করেন, তবে শাস্ত্রমতে কোনো দোষ থাকবে না। রানী রাসমণি মন্দিরটি তাঁর গুরুকে দান করে দেন এবং রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে প্রথম প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত করেন।
দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অনুজ ভাই তরুণ গদাধর চট্টোপাধ্যায় (যিনি পরবর্তীকালে যুগপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নামে বিশ্ববন্দিত হন) দক্ষিণেশ্বরে আসেন। ১৮৫৬ সালে রামকুমারের মৃত্যুর পর শ্রীরামকৃষ্ণ ভবতারিণীর পূজার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রানী রাসমণি প্রথম দর্শনেই শ্রীরামকৃষ্ণের ভিতরের divine শক্তি ও আধ্যাত্মিকতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে সাধারণ পুরোহিত হিসেবে না দেখে পরম সাধক হিসেবে সম্মান করতেন। অন্যদিকে, রামকৃষ্ণদেবও রাসমণিকে দেবী ভবতারিণীর 'রসময়ী' বা অষ্টনায়িকার একজন হিসেবে গণ্য করতেন।
একবার মন্দিরে পূজার সময় রানী রাসমণির মন যখন অন্য বিষয়ে (জমিদারির মামলা-মোকদ্দমায়) বিচলিত ছিল, তখন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর পিঠে আলতো থাপ্পড় মেরে বলেছিলেন, "এখানেও ওই চিন্তা!" রাসমণি ক্ষুব্ধ না হয়ে বরং নিজের ভুল বুঝতে পেরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে রানীর ভক্তি ও আধ্যাত্মিক জীবন পূর্ণতা পায়।
আজও বাংলায় উদযাপিত প্রতিটি প্রধান উৎসবের সঙ্গে রানী রাসমণির স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। বাংলা পঞ্জিকা বা পঞ্চাঙ্গের শুভ তিথি যেমন — দুর্গাপূজার মহাষ্টমী, কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা, শ্যামা পূজা এবং বৈশাখী সংক্রান্তি — জানবাজার রাজবাড়ি ও দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ঐতিহ্যবাহী নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাবে দক্ষিণেশ্বর হয়ে উঠেছিল সমস্ত ধর্মের মিলনক্ষেত্র। রানী রাসমণি যে উদার সনাতন ভাবধারার সূচনা করেছিলেন, তা পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বজয়ের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় বছর পর, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ফেব্রুয়ারি (বাংলা ১২৬৭ সালের ৮ই ফাল্গুন) এই মহান নারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের নিত্যপূজা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দিনাজপুর জেলায় একটি বিশাল জমিদারি অর্পণ করে যান, যাতে মন্দিরের কাজ কোনোদিন অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়।
জীবনাবসানের মুহূর্তে তাঁকে গঙ্গার তীরে (কালীঘাট বা কেওড়াতলা সংলগ্ন ঘাটে) নিয়ে যাওয়া হলে, তিনি প্রদীপের আলো দেখে বলেছিলেন, "প্রদীপ নিভিয়ে দাও, এখন মা ভবতারিণীর আলো আসছে..."।
রানী রাসমণি কেবল ইতিহাস বা অতীত কথার কোনো এক চরিত্র নন; তিনি আধুনিক ভারতীয় নারীদের আত্মমর্যাদা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সাহসিকতার প্রতীক। এমন এক যুগে দাঁড়িয়ে তিনি রাজত্ব পরিচালনা করেছিলেন, যখন নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়াও ছিল নিষিদ্ধ।
তিনি আমাদের শেখান কীভাবে শক্তির সাথে ভক্তি, রাজকীয়তার সাথে মানবতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই পরিচালনা করতে হয়। লোকমাতা রানী রাসমণি বাঙালির হৃদয়ে ও বাংলার ইতিহাসে চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করবেন।
রানী রাসমণি জানবাজারের বিশাল জমিদারি সত্ত্বেও সাধারণ প্রজা ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিলেন। গঙ্গার জেলেদের অধিকার রক্ষা, দুর্ভিক্ষে অন্নদান, গঙ্গার ঘাট ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং সব বর্ণ-ধর্মের মানুষের প্রতি তাঁর অপার ভালোবাসার কারণে প্রজা ও সাধারণ মানুষ তাঁকে ভালোবেসে 'লোকমাতা' উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে মে (স্নানযাত্রার শুভ দিন) প্রতিষ্ঠিত হয়। রানী রাসমণি কাশী (বারাণসী) গিয়ে বিশ্বনাথ ও অন্নপূর্ণা পূজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু যাত্রার আগের রাতে দেবী কালী স্বপ্নে তাঁকে গঙ্গার পূর্বতীরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দেন। দেবীর সেই স্বপ্নাদেশ পালন করতেই রানী দক্ষিণেশ্বরে এই ঐতিহাসিক মন্দির নির্মাণ করেন।
১৮৫০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার গঙ্গায় জেলেদের মাছ ধরার ওপর অন্যায় কর আরোপ করে। রানী রাসমণি গঙ্গার একটি বিশাল অংশ নিজে ইজারা নেন এবং সেখানে মোটা লোহার শিকল ফেলে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেন। আইনি জালে ব্রিটিশদের বন্দি করে তিনি শেষ পর্যন্ত সরকারকে জেলেদের ওপর থেকে সমস্ত কর তুলে নিতে বাধ্য করেছিলেন।
রানী রাসমণি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রথম প্রধান পুরোহিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর অনুজ শ্রীরামকৃষ্ণকে ভবতারিণীর পূজার দায়িত্ব দেন। রানী রাসমণি শ্রীরামকৃষ্ণের পরম ভক্ত ছিলেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বুঝতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে, শ্রীরামকৃষ্ণও রানীকে দেবী ভবতারিণীর বিশেষ অনুগৃহীত ও 'অষ্টনায়িকার এক জন' বলে মনে করতেন।