🎉 উৎসব · ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার
শ্রাবণ পূর্ণিমার আলোয় স্নাত রাখীবন্ধন উৎসবের পৌরাণিক রূপকথা, ঐতিহাসিক বিবর্তন, বৈদিক আচার এবং আধুনিক সামাজিক সম্প্রীতির এক গভীর তথ্যবহুল বিবরণ।
শ্রাবণ মাসের শেষভাগে, আকাশ যখন মেঘলা রোদের খেলায় মাতোয়ারা, আর বাতাসে ভেসে আসে বর্ষার সোঁদা গন্ধ—ঠিক তখনই বাঙালি ঘরে ঘরে উপস্থিত হয় এক অপার স্নেহের উৎসব। 'রাখীবন্ধন' বা 'রক্ষাবন্ধন'। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি স্রেফ একটি রেশমি সুতো বা রঙিন রাখি ভাইয়ের কবজিতে বোনের বেঁধে দেওয়ার দৃশ্য। কিন্তু এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতি, স্নেহের সুগভীর অনুভূতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সুরক্ষার এক অলিখিত অঙ্গীকার।
রাখীবন্ধন ভারতের অন্যতম প্রাচীন উৎসব হলেও বাংলা ও বাঙালির হৃদয়ে এর স্থান এক অনন্য উচ্চতায়। এটি কেবল ভাই ও বোনের মধ্যকার রক্তের সম্পর্ক উদযাপনের দিন নয়; বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার এক মহাসাধনা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই রেশমি সুতোকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আজকের এই দীর্ঘ নিবন্ধে আমরা রাখীবন্ধনের পৌরাণিক কাহিনি, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ধর্মীয় বিবর্তন, পঞ্জিকা মতে শুভ তিথির নিয়মাবলি এবং বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য বিশদভাবে অনুসন্ধান করব।
'রাখীবন্ধন' শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত 'রক্ষাবন্ধন' শব্দ থেকে।
অতএব, 'রক্ষাবন্ধন' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো 'সুরক্ষার জন্য আবদ্ধ করা' বা 'সুরক্ষার অঙ্গীকারসূত্র'। প্রাচীন বাংলায় 'রক্ষা' শব্দটি রূপান্তরিত হয়ে 'রাখী' বা 'রাখি' রূপ ধারণ করে। যখন একজন বোন তার ভাইয়ের ডান হাতে এই সুতোটি বেঁধে দেয়, তখন তা কেবল ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় না, বরং ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে এবং ভাইও বোনের জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তার পাশে দাঁড়িয়ে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়।
হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ও হিন্দু পৌরাণিক সাহিত্যে রাখীবন্ধন বা রক্ষাসূত্র বাঁধার একাধিক বিস্ময়কর ও শিক্ষাভিত্তিক কাহিনি বর্ণিত রয়েছে। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে মহাভারতের কাল পর্যন্ত এই পবিত্র সুতোর প্রয়োগ দেখা যায়।
পৌরাণিক এক কাহিনি অনুসারে, একবার দেবলোক ও অসুরলোকের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। অসুরদের রাজাসুর বৃত্রাসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গের অধিকার ছিনিয়ে নেন। ব্যাকুল হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র গুরু বৃহস্পতির কাছে পরামর্শ চাইতে যান। বৃহস্পতি ইন্দ্রকে একটি নির্দিষ্ট শুভ তিথিতে মন্ত্রপূত প্রতিরক্ষাসূত্র ধারণ করার উপদেশ দেন।
ইন্দ্রের পত্নী দেবী শচী (ইন্দ্রি) স্বামীর সুরক্ষার জন্য কঠোর তপস্যা করে একটি সুতো মন্ত্রপূত করেন এবং শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথিতে ইন্দ্রের ডান হাতে সেই পবিত্র 'রক্ষাসূত্র' বেঁধে দেন। এই সুতোর অলৌকিক প্রভাবে দেবরাজ ইন্দ্র পুনরুজ্জীবিত শক্তিতে অসুরদের পরাজিত করেন এবং স্বর্গের সার্বভৌমত্ব ফিরে পান। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আদি পৌরাণিক যুগে রক্ষাসূত্র কেবল ভাই-বোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি সুরক্ষার আশীর্বাদ হিসেবে স্ত্রী স্বামীকে বা গুরু শিষ্যকেও বাঁধতে পারতেন।
রাখীবন্ধন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ও মধুর পৌরাণিক গল্পটি বিষ্ণুপুরাণ ও ভাগবত পুরাণে পাওয়া যায়। অসুররাজ বলি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও ভক্ত। তিনি ১০০টি অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করে স্বর্গের অধিপতি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। দেবরাজ ইন্দ্রের অনুরোধে ভগবান বিষ্ণু বামন অবতার রূপ ধারণ করে বলির কাছে তিন পদ ভূমি দান চান।
ভগবান বামন দুই পদে সমগ্র মর্ত্য ও স্বর্গ মেপে নেন এবং তৃতীয় পদের জন্য রাজা বলি নিজের মস্তক বাড়িয়ে দেন। বলির সততা ও সর্বস্ব সমর্পণে সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু তাঁকে পাতালপুরীর রাজা করেন এবং স্বয়ং তাঁর পাতালপুরের দ্বারপাল হিসেবে অবস্থান করার বর দান করেন।
কিন্তু এতে গোলযোগ বাঁধল বৈকুণ্ঠে। পতি বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরিয়ে আনার জন্য দেবী লক্ষ্মী এক সাধারণ নারী রূপ ধরে পাতালপুরে গিয়ে পৌঁছান। শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিতে দেবী লক্ষ্মী রাজা বলিকে নিজের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁর কবজিতে একটি রঙিন সুতো বেঁধে দেন। বলি আবেগাপ্লুত হয়ে বোনকে উপহার দিতে চাইলে, দেবী লক্ষ্মী নিজের আসল রূপ প্রকাশ করেন এবং দ্বারপাল বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। রাজা বলি বোনের ইচ্ছা পূরণ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমার এই দিনটি রাখীবন্ধন ও বলির ত্যাগের স্মারক হিসেবে উদযাপিত হয়।
মহাভারতের একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনায় রাখীবন্ধনের প্রগাঢ় রূপটি ফুটে ওঠে। শিশুপাল বধের সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাতের আঙুল কেটে মারাত্মক রক্তপাত শুরু হয়। সে সময় সেখানে উপস্থিত পাণ্ডবপত্নী দ্রৌপদী এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের মূল্যবান রেশমি শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে শ্রীকৃষ্ণের রক্তক্ষরণরত আঙুলে শক্ত করে বেঁধে দেন।
দ্রৌপদীর এই তাৎক্ষণিক মমতা ও ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে বোন হিসেবে গ্রহণ করেন এবং কথা দেন, জীবনের যেকোনো বিপদে তিনি এই এক টুকরো কাপড়ের ঋণ শোধ করবেন। পরবর্তীকালে কৌরবদের রাজসভায় দুঃশাসন যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করার চেষ্টা করে, তখন ভগবান কৃষ্ণ অলৌকিকভাবে দ্রৌপদীর শাড়ির দৈর্ঘ্য অবিরাম বাড়িয়ে তাঁর লজ্জা ও সম্মান রক্ষা করেছিলেন। দ্রৌপদীর আঁচলের সেই টুকরোটিই যেন ছিল বিশ্বের প্রথম অচ্ছেদ্য রাখী।
অন্য একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর দেবতা যমরাজ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বোন যমুনার সাথে দেখা করতে পারেননি। দেবী যমুনা অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে দেবী গঙ্গার কাছে সাহায্য চান। গঙ্গা যমরাজকে বোনের ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এর পর যমরাজ যমুনার গৃহে যান। বোন যমুনা ভাইকে পরম আদরে আপ্যায়ন করেন, কপালে তিলক কেটে হাতে সুরক্ষা সুতো বেঁধে দেন। যমরাজ বোনের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে বর দেন যে, শ্রাবণী পূর্ণিমায় যে ভাই তার বোনের হাতে রাখী পরাবে এবং বোনের স্নেহ গ্রহণ করবে, সে অকালমৃত্যু ও যমযাতনা থেকে মুক্তি পাবে।
কেবল পৌরাণিক গল্পেই নয়, রাখীবন্ধন ভারতের বাস্তব ইতিহাসে বহু জটিল রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বিভিন্ন মধ্যযুগীয় ও প্রাচীন ইতিহাসে এই প্রতিরক্ষাসূত্রের গভীর ঐতিহাসিক প্রয়োগ পাওয়া যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার যখন ভারত অভিযানে আসেন এবং পাঞ্জাবের রাজা পুরুর (পোরাস) মুখোমুখি হন, তখন আলেকজান্ডারের স্ত্রী রুকসানা (Roxana) পুরুর বীরত্বের কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি রাজা পুরুর কাছে একটি অলঙ্কৃত সুতো পাঠায় এবং তাঁকে ভাই বলে সম্বোধন করে অনুরোধ জানান যেন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডারকে হত্যা না করেন। রাজা পুরু সেই সুতোটিকে সম্মান জানিয়ে যুদ্ধের মাঠে আলেকজান্ডারকে বধ করার সুযোগ পেয়েও অস্ত্র সংবরণ করেছিলেন।
রাখীবন্ধনের ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়টি হলো গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ ও চিতোরের মধ্যে যুদ্ধ। চিতোরের রানা সঙ্গের বিধবা পত্নী রানী কর্ণাবতী বুঝতে পেরেছিলেন যে, শক্তিশালী সুলতানের আক্রমণের বিরুদ্ধে চিতোরকে রক্ষা করা তাঁর একার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি নিরুপায় হয়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে একটি অলঙ্কৃত রাখী পাঠায় এবং সাহায্য প্রার্থনা করেন।
হুমায়ুন তখন অন্য অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু একজন রাজপুত রানীর প্রেরিত রাখীর তাৎপর্য ও সম্মান রক্ষা করতে তিনি অবিলম্বে চিতোরের উদ্দেশ্যে সৈন্য পরিচালনা করেন। যদিও হুমায়ুন পৌঁছানোর আগেই রানী কর্ণাবতী জৌহর ব্রত পালন করে প্রাণবিসর্জন দিয়েছিলেন, কিন্তু হুমায়ুন চিতোরে পৌঁছে বাহাদুর শাহকে পরাস্ত করেন এবং কর্ণাবতীর পুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে ভাইয়ের কর্তব্য পালন করেন। এটি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও রাখীর সম্মানের এক অমর উদাহরণ।
বাঙালির ইতিহাসে রাখীবন্ধন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রা লাভ করে ১৯০৫ সালে। বড়লাট লর্ড কার্জন যখন ধর্মীয় ভিত্তিতে বাংলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন (বঙ্গভঙ্গ), তখন তৎকালীন সমগ্র বাংলায় এক অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদী আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
বিশ্বকবির দৃষ্টিভঙ্গিতে রাখীবন্ধন: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝতে পেরেছিলেন যে, ব্রিটিশদের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতিকে পরাস্ত করতে হলে হিন্দু ও মুসলিম—এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ের হৃদয়ের মেলবন্ধন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। ১৯০৫ সালের১৬ই অক্টোবর (৩০শে আশ্বিন) বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিনটিকে রবীন্দ্রনাথ এক শোক দিবস নয়, বরং 'রাখীবন্ধন দিবস' বা ভ্রাতৃত্বের মিলন উৎসব হিসেবে পালনের আহ্বান জানান।
সেদিন সকালে কবিগুরুর নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ গঙ্গার ঘাটে স্নান সেরে খালি পায়ে গান গাইতে গাইতে কলকাতার রাস্তায় নেমে আসেন। গানটি ছিল—
"বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ুর, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান..."
রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীরা পথে নেমে পরিচিত-অপরিচিত প্রতিটি মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে হলুদ রেশমি রাখী বেঁধে দেন। গঙ্গার তীর থেকে শুরু করে কলকাতার নাখোদা মসজিদ পর্যন্ত এই রাখী পরানোর ধারা বিস্তৃত হয়। রবীন্দ্রনাথের এই উদ্যোগ রাখীবন্ধনকে শুধু ভাই-বোনের ঘরোয়া সম্পর্কের গণ্ডি থেকে বের করে এনে একটি জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও অহিংস প্রতিরোধের মস্ত বড় প্রতীকে পরিণত করেছিল। আজও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এই সামাজিক রাখীবন্ধনের ঐতিহ্য শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
বাঙালির যেকোনো পূজাপার্বণ ও সামাজিক আচার পঞ্জিকার ওপর গভীরভাবে নির্ভর করে। রাখীবন্ধন পালিত হয় বাংলা শ্রাবণ মাসের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে, যাকে বলা হয় 'শ্রাবণী পূর্ণিমা' বা 'ঝুলন পূর্ণিমা'। তবে পঞ্জিকা অনুসারে কেবল শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথি পেলেই রাখী বাঁধা যায় না; জ্যোতিষশাস্ত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম ও সময়সীমা (শুভ মুহূর্ত) মেনে চলার বিধান রয়েছে।
পঞ্জিকা ও জ্যোতিষশাস্ত্রে 'ভদ্রা' বা 'বিষ্টি করণ'-কে অত্যন্ত অশুভ বলে গণ্য করা হয়। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী, ভদ্রা হলেন শনিদেবের বোন এবং সূর্যদেবের কন্যা। ভদ্রার সময়ে কোনো মাঙ্গলিক কাজ সম্পাদন করা নিষিদ্ধ।
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, লঙ্কার অধিপতি রাবণ তাঁর বোন শূর্পণখার কাছ থেকে ভদ্রাকালে রাখী বাঁধিয়েছিলেন, যার ফলে এক বছরের মধ্যে রাবণ ও তাঁর সমগ্র রাক্ষস বংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তাই জ্যোতিষবিদ ও পঞ্জিকাকাররা রাখীবন্ধনের দিন পঞ্জিকা দেখে 'ভদ্রা কাল' বর্জন করার কঠোর পরামর্শ দেন। ভদ্রা শেষ হলে তবেই অপরাহ্ন (বিকাল) বা প্রদোষ কালে রাখী বাঁধার সেরা শুভ সময় নির্ধারিত হয়।
শ্রাবণ পূর্ণিমার এই দিনটি কেবল রাখীবন্ধনের জন্যই নয়, পঞ্জিকা ও সনাতন ঐতিহ্যে এটি 'শ্রাবণী উপকর্ম' নামেও পরিচিত। এই দিনে বৈদিক ব্রাহ্মণ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নদী বা জলাশয়ে স্নান করে পুরনো যজ্ঞোপবীত (পৈত) ত্যাগ করেন এবং বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে নতুন পৈত ধারণ করেন। এই দিনটিকে গায়ত্রী নদীর আবির্ভাব দিবস বা 'গায়ত্রী জয়ন্তী' হিসেবেও পুজো করা হয়।
বাংলা পঞ্জিকায় শ্রাবণ মাসের একাদশী তিথি থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত রাধা-কৃষ্ণের 'ঝুলন যাত্রা' উৎসব উদযাপিত হয়। এই ঝুলন উৎসবের সমাপ্তি ঘটে শ্রাবণী পূর্ণিমা বা রাখীবন্ধনের দিনে। শান্তিনিকেতন থেকে শুরু করে মায়াপুর ইসকন মন্দির, নবদ্বীপ ও বৃন্দাবনে এই দিন শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণের মূর্তিকে রাখী পরিয়ে উৎসবের সমাপন করা হয়।
রাখীবন্ধন কেবল একটি সুতো বাঁধার কাজ নয়, এটি একটি নিয়মনিষ্ঠ আনন্দঘন পারিবারিক আচার। সাধারণ বাঙালি পরিবারগুলোতে এই দিন যেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
বোনেরা স্নান সেরে শুভ্র ও পরিষ্কার বস্ত্র ধারণ করেন। এরপর একটি কাঁসার বা পিতলের থালায় নিম্নলিখিত সামগ্রীগুলো সাজিয়ে নেন:
ভাইকে পূর্বে বা উত্তর-পূর্ব দিকে (ঈশান কোণ) মুখ করে বসানো হয়। কারণ শাস্ত্র মতে, উত্তর-পূর্ব দিক শুভ শক্তির আধার। এরপর বোন ভাইয়ের কপালে চন্দন ও সিঁদুরের তিলক কেটে দেন এবং তিলকের ওপর কয়েকটি চাল (অক্ষত) আটকে দেন। এটি ভাইয়ের দীর্ঘায়ু ও বুদ্ধির বিকাশের প্রতীক। অতঃপর জ্বলন্ত প্রদীপ দিয়ে ভাইয়ের আরতি করা হয়, যাতে সমস্ত অশুভ দৃষ্টি ও নেতিবাচক শক্তি দূর হয়ে যায়।
ভাইয়ের ডান হাতের কবজিতে রাখী বাঁধার সময় বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণিত এই ঐতিহ্যবাহী মন্ত্রটি পাঠ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়:
"য়েন বধ্যো বালি রাজা দানবেন্দ্রো মহাবলঃ।
তেন ত্বামভিবধ্নামি রক্ষে মা চল মা চল॥"
অর্থ: "যে সুরক্ষাসূত্র দ্বারা মহা পরাক্রমশালী দানবরাজ বলি আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই পবিত্র সুরক্ষাসূত্র দিয়ে আমি তোমাকে আবদ্ধ করছি। হে রক্ষাসূত্র, তুমি স্থির থাকো, নিজের সুরক্ষা ধর্ম থেকে কখনো বিচ্যুত হয়ো না।"
রাখী বাঁধার পর বোন ভাইকে নিজ হাতে মিষ্টি খাওয়ায়। এরপর ভাই বোনের চরণ স্পর্শ করে আশীর্বাদ নেয় (যদি বোন বয়সে বড় হয়) অথবা ছোট বোনকে স্নেহ-ভালোবাসা ও সুরক্ষার হাত বাড়িয়ে দেয়। ভাই তার সামর্থ্য অনুযায়ী বোনকে বস্ত্র, অর্থ বা প্রিয় উপহার প্রদান করে এবং চিরকাল বোনের পাশে থাকার অঙ্গীকার প্রকাশ করে।
বাঙালির যেকোনো উৎসবে মিষ্টির উপস্থিতি অনিবার্য, আর রাখীবন্ধনে তো মিষ্টান্ন বাজারের আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা, বর্ধমান, কৃষ্ণনগর থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে রাখীবন্ধনের দিন মিষ্টির দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাখীবন্ধন উৎসবের রূপ ও পালনের পরিধিতেও বেশ কিছু আধুনিক মাত্রা সংযোজিত হয়েছে।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে বহু ভাই-বোন কর্মসূত্রে বা শিক্ষাসূত্রে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছেন। প্রবাসী ভাইয়ের কাছে সময়মতো রাখী পৌঁছানোর জন্য কুরিয়ার বা অনলাইন ডেলিভারি সার্ভিস অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আবার যারা সামনাসামনি উপস্থিত হতে পারেন না, তারা ভিডিও কল এবং 'ডিজিটাল রাখী' বা 'ই-রাখী' প্রেরণের মাধ্যমে নিজেদের ভালোবাসা প্রকাশ করেন। প্রযুক্তির এই রূপান্তর সুতোর টানকে কমায়নি, বরং ভৌগোলিক দূরত্বকে তুচ্ছ প্রমাণ করেছে।
আজকাল প্লাস্টিক বা কৃত্রিম চকচকে উপাদান দিয়ে তৈরি রাখীর বদলে প্লাস্টিকমুক্ত, পরিবেশবান্ধব রাখীর চাহিদা তুঙ্গে। সুতি সুতো, বীজ (Seed Rakhi), কাঠের পুঁতি এবং পাটের তৈরি রাখী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। 'সীড রাখী' বা বিজ-রাখীর বিশেষত্ব হলো, উৎসব শেষে এই রাখীটি টবে মাটিতে পুঁতে দিলে তা থেকে সুন্দর চারাগাছ জন্মায়—যা ভাই-বোনের ভালোবাসার সাথে সাথে প্রকৃতি সংরক্ষণের এক দারুণ প্রতীক।
আধুনিক সমাজে রাখীবন্ধন কেবল ভাই-বোনের গণ্ডিতে আটকে নেই।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে শ্রাবণী পূর্ণিমার এই দিনটি নিজস্ব স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে ভিন্ন ভিন্ন নামে পালিত হয়:
রাখীবন্ধন শুধুই পঞ্জিকার একটি তিথি কিংবা সুতো বিক্রির কোনো বাণিজ্য নয়। এটি এমন এক অদৃশ্য আত্মিক সুতো, যা দুটি হৃদয়কে অনুভূতির সুগভীর বন্ধনে আবদ্ধ করে। হিংসা, বিদ্বেষ, অস্থিরতা ও স্বার্থপরতার আধুনিক বিশ্বে রাখীবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবিকতার মূল ভিত্তি হলো প্রেম, সুরক্ষা এবং পারস্পরিক মর্যাদা।
একটি ছোট্ট সুতো যেমন দুটি হাতের কবজিকে যুক্ত করে, তেমনই এটি সমগ্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার পরম হাতিয়ার। রবীন্দ্রনাথের সেই অমর বার্তা—"হাতে হাতে হাত মেলাও, হৃদয়ে হৃদয়"—আজকের যুগে রাখীবন্ধনের দিনটিতে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। শ্রাবণী পূর্ণিমার এই পবিত্র ডোর বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মনে শান্তি, সৌহার্দ্য এবং অটুট সুরক্ষার বার্তা নিয়ে আসুক—এই আমাদের প্রার্থনা।
রাখীবন্ধন প্রতি বছর বাংলা শ্রাবণ মাসের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে (শ্রাবণী পূর্ণিমা বা ঝুলন পূর্ণিমা) পালিত হয়। পঞ্জিকার স্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পঞ্জিকা ঘেঁটে পূর্ণিমা তিথির সূচনার সময় এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় 'ভদ্রাকাল' বাদ দিয়ে শুভ সময় বা অপরাহ্নের মুহূর্ত নির্ধারণ করতে হয়। সঠিক তিথিতে নিয়ম মেনে রাখী বাঁধাকেই শাস্ত্রসম্মত বলে মনে করা হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্রে 'ভদ্রা'-কে এক ধরনের অশুভ সময় বা বিষ্টি করণ হিসেবে গণ্য করা হয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, ভদ্রাকালে সূচিত যেকোনো শুভ কাজের পরিণতি বিপরীত হতে পারে। কথিত আছে, লঙ্কাপতি রাবণ ভদ্রাকালে তাঁর বোন শূর্পণখার কাছ থেকে রাখী বাঁধিয়েছিলেন, যার ফলে তাঁর সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছিল। তাই পঞ্জিকায় উল্লিখিত ভদ্রাকাল সমাপ্ত হওয়ার পরেই রাখী বাঁধা বিধেয়।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বাংলাকে বিভক্ত করার জন্য 'বঙ্গভঙ্গ' ঘোষণা করেন, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষা ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে রাখীবন্ধনের ডাক দেন। এটি ছিল ব্রিটিশদের বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে এক অহিংস, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের প্রতীক।
বাংলা পঞ্জিকায় শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিতেই ঝুলন যাত্রার সমাপ্তি ঘটে এবং একই দিনে রাখীবন্ধন পালিত হয়। শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণের ঝুলন উৎসবের শেষ দিনে দেব-দেবীকে রাখী পরানোর পর সেই প্রসাদী রাখি বা পবিত্র সুতো বাড়িতে ভাইদের হাতে বাঁধার প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে।