🌟 ব্যক্তিত্ব · ১৮ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার
কুসংস্কার ও কুপমণ্ডূকতার শৃঙ্খল ভেঙে আধুনিক বাংলা তথা ভারতের রেনেসাঁর দিশারী রাজা রামমোহন রায়ের বিপ্লবী জীবন, সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ ও সমাজ সংস্কারের রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষ যখন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং সামন্তবাদী কুপমণ্ডূকতার গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব—রাজা রামমোহন রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাঁকে শ্রদ্ধাভরে আখ্যায়িত করেছিলেন 'ভারতপথিক' হিসেবে, আর ইতিহাস যাঁকে বরণ করে নিয়েছে 'আধুনিক ভারতের জনক' (Father of Modern India) এবং 'বাংলা নবজাগরণের প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ' হিসেবে।
কুসংস্কারের শিকল ভেঙে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সহজ ছিল না। বিশেষ করে যে সমাজে নারীর সম্মান বলতে কিছু ছিল না, সতীদাহের নামে জ্যান্ত মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো ধর্মের দোহাই দিয়ে—সেই সমাজে দাঁড়িয়ে একা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন রামমোহন। কেবল সতীদাহ প্রথা রদই নয়, বহুভাষী পণ্ডিতে রূপান্তর, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার পত্তন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সংস্কারের মাধ্যমে তিনি বাংলা ও ভারতের সমাজব্যবস্থাকে নতুন এক ভোরের আলো দেখিয়েছিলেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রামমোহন রায়ের সেই মহাকাব্যিক জীবন, সংগ্রাম ও সংস্কারকে পুনরাবিষ্কার করা মানেই আমাদের নিজেদের শিকড় ও আধুনিকতার উৎসকে জানা।
১৭৭২ সালের ২২ মে (অন্য মতে ১৭৭৪ সাল) হুগলি জেলার খানাকুলের অন্তর্গত রাধানগর গ্রামে এক অভিজাত ও রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রামমোহন রায়। তাঁর পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন তৎকালীন জমিদারি ও প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, আর মাতা তারিণী দেবী (যাঁকে 'দেবী রাধাবল্লভী' নামেও ডাকা হতো) ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও কঠোর বৈষ্ণব বংশের কন্যা।
রামমোহনের শৈশব কাটে এক প্রবল ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় আবহাওয়ার মধ্যে। কিন্তু রামমোহনের চিন্তাধারা শৈশব থেকেই সাধারণের চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি কেবল নির্দিষ্ট কোনো একটি গণ্ডির মধ্যে নিজের জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি।
রামমোহনের শিক্ষার সূচনা হয়েছিল গ্রামের পাঠশালায়। তবে অতি অল্প বয়সেই তাঁর মেধার উজ্জ্বলতা প্রকাশ পায়। তৎকালীন যুগের প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বুঝে তাঁর পিতা তাঁকে বিভিন্ন ভাষা ও শাস্ত্রে পারদর্শী করে তোলেন:
১. পার্সি ও আরবি শিক্ষা (পাটনা): বাল্যকালেই তিনি পাটনায় গিয়ে তৎকালীন সরকারি ভাষা পার্সি এবং ইসলামিক তত্ত্ববিদ্যার জন্য আরবি ভাষা শেখেন। সেখানে তিনি অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর দর্শনের পার্সি অনুবাদ পাঠ করেন এবং সূফি মতবাদের প্রেমে পড়েন। ২. সংস্কৃত ও বেদ চর্চা (বারাণসী): পরবর্তীতে তিনি কাশীতে (বারাণসী) গিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে সংস্কৃত ভাষা, বেদ, উপনিষদ এবং হিন্দু দর্শন অধ্যয়ন করেন। ৩. ইংরেজি ও অন্যান্য পশ্চিমা ভাষা: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কাজ করার সময় এবং জন ডিগবি (John Digby)-র সান্নিধ্যে এসে তিনি ইংরেজি ভাষায় অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন। এছাড়া পরবর্তীতে বাইবেল ও হিব্রু-গ্রিক ধর্মগ্রন্থ মূল ভাষায় পড়ার জন্য তিনি হিব্রু, গ্রিক, লাতিন ও ফরাসি ভাষাও শেখেন।
একটি মানুষ একই সাথে সংস্কৃতের প্রজ্ঞা, পার্সির লালিত্য, আরবির যুক্তি এবং ইংরেজির আধুনিকতাকে কীভাবে ধারণ করতে পারেন—রামমোহন ছিলেন তার জীবন্ত উদাহরণ।
মাত্র ষোলো বছর বয়সেই রামমোহন হিন্দু ধর্মের প্রচলিত মূর্তিপূজা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে নিজের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করেন। এর ফলে পিতা রামকান্ত রায়ের সাথে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয় এবং তিনি গৃহত্যাগ করতে বাধ্য হন। বলা হয়ে থাকে, এই সময়ে তিনি তিব্বতসহ ভারতের বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্র ও দুর্গম অঞ্চল পরিভ্রমণ করে বৌদ্ধ ও অন্যান্য দর্শন লাভ করেন।
"সত্য একটিই, কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকেন। ধর্ম যখন আচার-সর্বস্ব হয়ে পড়ে, তখন মানুষ মানবিকতা ভুলে কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়।"
১৮০৪ সালে মুর্শিদাবাদে থাকাকালীন রামমোহন পার্সি ভাষায় (আরবি ভূমিকা সহ) তাঁর বিখ্যাত প্রথম গ্রন্থ 'তুহফাতুল মুওয়াহহিদিন' (Tuhfat-ul-Muwahhidin বা 'একেশ্বরবাদীদের প্রতি উপহার') প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থে তিনি যুক্তির আলোকে সকল ধর্মের মৌলিক সত্য অর্থাৎ 'একেশ্বরবাদ'-এর পক্ষে সওয়াল করেন এবং অন্ধ আচার-অনুষ্ঠানকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন।
১৮১৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি ছেড়ে রামমোহন স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। কলকাতায় এসে তিনি অনুগামী ও সমমনা বন্ধুদের নিয়ে গঠন করেন 'আত্মীয় সভা'। দ্বারকানাত ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, নন্দকিশোর বসু প্রমুখ প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব এই সভার নিয়মিত সদস্য ছিলেন। এই সভায় নিয়মিত বেদ-উপনিষদের আলোচনা, একেশ্বরবাদ প্রচার এবং সমাজের বলিক প্রথা, সতীদাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা হতো।
রামমোহন রায়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক অধ্যায় হলো সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। তৎকালীন বাংলায় স্বামী মারা গেলে বিধবা স্ত্রীকে পতিব্রতা প্রমাণের নামে জোর করে স্বামীর চিতার সাথে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। একে ধর্মীয় আচার হিসেবে মহিমান্বিত করা হলেও, এর পেছনে কাজ করত পরিবারের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা এবং নারীর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতার মানসিকতা।
১৮১১ সালে রামমোহনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জগমোহনের মৃত্যুর পর তাঁর বৌদি অলকমঞ্জরীকে বলপূর্বক সতীদাহ করা হয়। রামমোহন শত চেষ্টা করেও আত্মীয়দের এই নির্মম কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেননি। চিতার সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য, নারীর আর্তচিৎকার এবং ঢাক-ঢোলের শব্দে তা চাপা দেওয়ার নিষ্ঠুরতা রামমোহনের অন্তরাত্মাকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি শ্মশানে দাঁড়িয়ে শপথ নেন—যতদিন না বাংলা ও ভারত থেকে এই বর্বরোচিত প্রথা বিলুপ্ত হচ্ছে, ততদিন তিনি বিশ্রাম নেবেন না।
রামমোহন কলকাতার বিভিন্ন শ্মশানে গিয়ে সতীদাহে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এর ফলে সনাতনপন্থী চরমপন্থীদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়তে হতো তাঁকে। এমনকি তাঁকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন সমাজের কট্টরপন্থী দল, রাজা রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে 'ধর্মসভা' গঠন করে রামমোহনের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করে।
কিন্তু রামমোহন দমে যাননি। তিনি অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন শাস্ত্রকেই। তিনি বেদ, উপনিষদ ও মনুসংহিতা ঘেঁটে প্রমাণ করে দেন যে—হিন্দুধর্মে বা শাস্ত্রে কোথাও সতীদাহ প্রথা বাধ্যতামূলক বা ধর্মাচারের মূল অঙ্গ বলা হয়নি। তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে একাধিক পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যেখানে রামমোহন ও এক কাল্পনিক সনাতনপন্থীর কথোপকথনের মাধ্যমে সতীদাহের অসারতা তুলে ধরা হয়।
রামমোহনের নিরলস প্রচেষ্টা, জনমত গঠন এবং লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের (Lord William Bentinck) সাহসিকতায় অবশেষে সফলতা আসে। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর 'Regulation XVII' পাস করে ব্রিটিশ সরকার সতীদাহ প্রথাকে বেআইনি ও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে।
সনাতনপন্থীরা এই আইনের বিরুদ্ধে বিলাতের প্রিভি কাউন্সিলে (Privy Council) আপিল করলে রামমোহন নিজেই বিলেত গিয়ে নিশ্চিত করেন যাতে এই মানবিক আইন কোনোভাবেই বাতিল না হয়।
রামমোহন খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল আইন করে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষা ও স্বাধীন মুক্ত চিন্তা।
রামমোহনকে 'বাংলা গদ্যের প্রথম প্রামাণ্য রূপকার' বলা চলে। সাময়িকপত্র এবং বিতর্কিত পুস্তিকার মাধ্যমে তিনি কঠিন গম্ভীর বিষয়কে বাংলায় প্রকাশ করার পথ দেখান।
১. সংবাদ কৌমুদী (১৮২১): বাংলা ভাষায় প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সামাজিক কুসংস্কার, শিক্ষানীতি এবং সতীদাহের মতো বিষয় তুলে ধরতেন। ২. মিরাত-উল-আকবার (১৮২২): পার্সি ভাষায় প্রকাশিত এটিই ভারতের প্রথম রাজনৈতিক ও সামাজিক সংবাদপত্র। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, রাজনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে তিনি এখানে মতামত প্রকাশ করতেন।
১৮২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন প্রেস অর্ডিন্যান্স (Press Ordinance) এনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তখন রামমোহন সুপ্রিম কোর্ট ও বিলাতের রাজার কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে জোরদার লড়াই করেন।
১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট (৬ ভাদ্র ১২৩৫ বঙ্গাব্দ) রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠা করেন 'ব্রাহ্মসভা', যা পরবর্তীতে 'ব্রাহ্মসমাজ' নামে বিখ্যাত হয়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেনের হাত ধরে এই আন্দোলন পরবর্তীতে আরও গতি লাভ করে।
ব্রাহ্মসমাজের মূল ভিত্তি ছিল:
ব্রাহ্মসমাজ কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল বাংলা নবজাগরণের এক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূলস্রোত, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত বাংলার বহু প্রথিতযশা পরিবারকে প্রভাবিত করেছিল।
১৮৩০ সালে রামমোহন রায় সমুদ্রপথে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তৎকালীন হিন্দু সমাজে সমুদ্রযাত্রা ছিল এক পরম পাপ বা 'জাত যাওয়ার' শামিল। কিন্তু সমাজসংস্কারের টানে এবং বিশ্বকে কাছ থেকে দেখার উদ্দেশ্যে তিনি সেই নিষেধ অনায়াসে ভঙ্গ করেন। প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি আধুনিক যুগে ইউরোপ ভ্রমণ করেন।
বিলাত যাওয়ার পূর্বে দিল্লির তৎকালীন দুর্বল মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর (Akbar II) রামমোহনকে নিজের দূত হিসেবে ইংল্যান্ডে পাঠায়, যাতে ব্রিটিশ রাজ দরবারে সম্রাটের ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানানো যায়। এই কাজের জন্য সম্রাট আকবর দ্বিতীয় রামমোহনকে 'রাজা' উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে তিনি 'রাজা রামমোহন রায়' নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হন।
ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর পর রামমোহনকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতের শাসনভার, রাজস্ব নীতি এবং কৃষকদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। সেখান থেকে তিনি ফ্রান্সও ভ্রমণ করেন এবং ফরাসি বিপ্লব ও স্বাধীনতার ধারণায় উদ্বুদ্ধ হন।
কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ইংল্যান্ডের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রেন ফিভার বা মস্তিষ্কের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল (Bristol) শহরের স্ট্যাপলটন গ্রোভে এই মহান মানবতাবাদী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অনুগামী মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর্থিক সহায়তায় ব্রিস্টলের 'আর্নোস ভ্যাল' (Arnos Vale Cemetery) সমাধিক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের সুন্দর স্মৃতিসৌধ ও সমাধি নির্মাণ করা হয়, যা আজও প্রবাসী ভারতীয় ও ভ্রমণার্থীদের কাছে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।
রাজা রামমোহন রায় কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি যুগ। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে তিনি অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করে বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছিলেন।
আজকে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের যে মুক্তমনা, বিজ্ঞানমুখী এবং সাম্যবাদী চেতনা আমরা দেখতে পাই—তার দূরবর্তী ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করে গিয়েছিলেন রামমোহনই। আমাদের দৈনন্দিন জীবন, পঞ্জিকার পাতায় উৎসবের আনন্দ কিংবা সামাজিক চিন্তায় নারীর সমঅধিকারের দাবি—সবকিছুর পেছনেই কোথাও না কোথাও রামমোহনের সংস্কারের ছোঁয়া রয়ে গেছে।
তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ঐতিহ্য ও শাস্ত্রকে সম্মান করেও আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা যায়।
রাজা রামমোহন রায় ১৮ শতকের অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও সামন্তবাদী সমাজকে ভেঙে আধুনিক যুক্তিভিত্তিক সমাজ গঠনের সূচনা করেছিলেন। তিনি প্রথম ভারতীয় যিনি শিক্ষা, ধর্ম, সমাজ সংস্কার, সংবাদপত্র এবং রাজনীতিতে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। এই কারণেই তাঁকে 'আধুনিক ভারতের জনক' এবং 'বাংলা নবজাগরণের প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ' বলা হয়।
নিজের বৌদির সতীদাহের করুণ দৃশ্য দেখে রামমোহন এই প্রথা উচ্ছেদের প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি বেদ ও উপনিষদ ঘেঁটে শাস্ত্রীয় প্রমাণ পেশ করেন যে সতীদাহ প্রথা ধর্মানুমোদিত নয়। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তিনি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে আইন প্রণয়নে বাধ্য করেন, যার ফলে ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর 'Regulation XVII' আইন পাসের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হয়।
রামমোহন রায় ১৮২১ সালে বাংলা ভাষায় 'সংবাদ কৌমুদী' এবং ১৮২২ সালে পার্সি ভাষায় 'মিরাত-উল-আকবার' নামক সাময়িকপত্র প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি মুক্ত সাংবাদিকতা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছিলেন।
রাজা রামমোহন রায় ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরের স্ট্যাপলটন গ্রোভে মস্তিষ্কের জ্বরে (Brain Fever) আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিস্টলের আর্নোস ভ্যাল সমাধিক্ষেত্রে তাঁর সমাধি ও স্মৃতিসৌধ রয়েছে।