🏛️ ইতিহাস · ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার
ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত মুর্শিদাবাদ একসময় ছিল অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী। মুর্শিদ কুলি খান থেকে আলীবর্দী খান—মুর্শিদাবাদের নবাবী আমল, অর্থনীতি, স্থাপত্য ও দরবারি সংস্কৃতির এক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসচর্চায় ভাগীরথী নদীর তীরের শহর মুর্শিদাবাদ কেবল একটি নাম নয়, এটি এক গৌরবোজ্জ্বল ও নাটकीय অধ্যায়ের জীবন্ত দলিল। একসময় যখন ঢাকা ছিল বাংলার সুবাহর রাজধানী, তখন সুবাদার ও দেওয়ানদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে পশ্চিম বাংলায় এক নতুন রাজনৈতিক কেন্দ্রের অভাব অনুভূত হচ্ছিল। সেই অভাব পূরণ করতেই জন্ম নেয় মুর্শিদাবাদ—যা ১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত ছিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার একচ্ছত্র শাসনকেন্দ্র ও এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ বাণিজ্যনগরী।
মুর্শিদাবাদের মাটি স্পর্শ করলে আজও যেন বাতাসে ভেসে আসে রেশম বাণিজ্যের হাঁকডাক, দরবারের আভিজাত্য, বর্গীর আক্রমণের গর্জন এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফিসফিসানি। এই প্রবন্ধে আমরা ফিরে দেখব মুর্শিদাবাদের সেই মহাকাব্যিক নবাবী আমল, যার সাথে মিশে রয়েছে বাংলার অর্থনীতি, স্থাপত্য, পঞ্জিকাভিত্তিক উৎসব এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
মুর্শিদাবাদ শহরের পূর্বনাম ছিল মাকসুদাবাদ। ষোড়শ শতকে মাকসুদ খান নামে এক মোগল ব্যবসায়ী এখানে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় নদীপথে যোগাযোগের অভূতপূর্ব সুবিধা ছিল এই অঞ্চলে।
১৭০০ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব এক অনন্য বিচক্ষণ ব্যক্তিতকে বাংলার 'দেওয়ান' হিসেবে নিযুক্ত করেন। তাঁর নাম ছিল কারতলব খান। পরবর্তীতে তাঁর দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে আওরঙ্গজেব তাঁকে 'মুর্শিদ কুলি খান' উপাধিতে ভূষিত করেন। তৎকালীন সুবাদার আজিম-উস-শানের সাথে মতবিরোধ এবং নিরাপত্তার কারণে মুর্শিদ কুলি খান ১৭০৪ সালে দেওয়ানি কার্যালয় ঢাকা থেকে মাকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। ১৭১৭ সালে সম্রাট ফাররুখশিয়ার তাঁকে বাংলার 'নাজিম' বা সুবাদার হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মাকসুদাবাদের নাম পরিবর্তন করে রাখেন মুর্শিদাবাদ।
মুর্শিদ কুলি খানের হাত ধরেই স্বাধীন বাংলা নবাবীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তিনি মোগল সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করেও কার্যত স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করতেন।
মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন এক অনন্য প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলার অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। তিনি জমি জরিপ করান এবং 'মাল জাসিনী' ব্যবস্থার মাধ্যমে কর আদায় নিশ্চিত করেন।
এখানেই যুক্ত হয় বাংলা পঞ্জিকা ও বাঙালি সংস্কৃতির এক বিশেষ প্রথা—পুণ্যাহ (Punyah)। বৈশাখ মাসের প্রারম্ভে বা নতুন বাংলা বছরের শুভ মুহূর্তে নবাবের দরবারে রাজস্ব জমা দেওয়ার উৎসব উদযাপিত হতো। জমিদার, তালুকদার ও সাধারণ কৃষকরা শুভ তিথি ও পঞ্জিকার পয়া মুহূর্ত দেখে নবাবের দরবারে নতুন বছরের খাজনা জমা দিতে আসতেন। নবাব তাঁদের পান-সুপরি ও উপহার দিয়ে আপ্যায়িত করতেন। এই ঐতিহ্য থেকেই পরবর্তীতে বাংলায় 'হালখাতা' ও বৈশাখী উৎসবের সামাজিক প্রচলন আরও বিস্তৃত হয়।
মুর্শিদ কুলি খান নিজের জীবনের শেষভাগে গড়ে তোলেন কাটরা মসজিদ। তাঁর অনাড়ম্বর জীবনের প্রতীকস্বরূপ এই মসজিদের প্রবেশপথের সিঁড়ির নিচে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়, যাতে মসজিদে প্রবেশকারী ধার্মিকদের পদধূলি চিরকাল তাঁর কবরের ওপর পড়ে।
১৭২৭ সালে মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খান মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেন। সুজাউদ্দিনের আমল ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত ও সমৃদ্ধ। তিনি দরবারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন, রাজপ্রাসাদ অলঙ্কৃত করেন এবং উড়িষ্যা ও বিহারকে বাংলার সুবাহর সাথে আরও সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত করেন।
তবে ১৭৩৯ সালে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সরফরাজ খান মসনদে বসলে পরিস্থিতি বদলে যায়। সরফরাজ খান বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে পড়েন এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন। এই সুযোগে বিহারের ডেপুটি গভর্নর ও অত্যন্ত চতুর সেনাপতি আলীবর্দী খান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। ১৭৪০ সালে গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে আলীবর্দী খান মুর্শিদাবাদের নবাব হন।
আলীবর্দী খানের শাসনকাল (১৭৪০-১৭৫৬) ছিল মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের অন্যতম উত্তাল ও বীরত্বপূর্ণ সময়। ক্ষমতা দখলের পরপরই তাঁকে পড়তে হয় মারাঠা বা 'বর্গী' আক্রমণের মুখে। নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজি ভোঁসলের সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গীরা বারবার বাংলায় তাণ্ডব চালায়।
ছড়ার সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি সকলেরই জানা:
"ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে..."
বর্গীরা মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের উপকণ্ঠ পর্যন্ত লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করত। কিন্তু বৃদ্ধ আলীবর্দী খান হার মানেননি। অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও বীরত্বের সাথে তিনি প্রায় এক দশক ধরে বর্গীদের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১৭৫১ সালে এক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আলীবর্দী উড়িষ্যার একাংশ এবং ১২ লক্ষ টাকা চৌথ দিতে সম্মত হয়ে বাংলায় শান্তি ফিরিয়ে আনেন।
আলীবর্দী খানের আমলে মুর্শিদাবাদ কেবল যুদ্ধের ময়দান ছিল না, তিনি শিল্প, সাহিত্য ও বাণিজ্যেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।
নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারিগর ছিল জগৎ শেঠ পরিবার। মারোয়াড়ি ব্যাংকার মানিকচাঁদ মোগল সম্রাটের কাছ থেকে 'জগৎ শেঠ' (জগতের ব্যাংক) উপাধি পান। পরবর্তীকালে তাঁর দত্তক পুত্র ফতেহ চাঁদ এই সাম্রাজ্যকে অকল্পনীয় উচ্চতায় নিয়ে যান।
তৎকালীন ইউরোপীয় পরিব্রাজকদের মতে, জগৎ শেঠদের সম্পদ ছিল ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের চেয়েও বেশি! মুর্শিদাবাদের ট্রেজারি বা রাজকোষ পরিচালনা, মুদ্রা তৈরি (মিন্টিং) এবং ইউরোপীয় বণিকদের ঋণ দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিলেন এই জগৎ শেঠরা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফরাসি ও ওলন্দাজরা তাদের বাণিজ্যের জন্য জগৎ শেঠদের ঋণের ওপর নির্ভর করত। মুর্শিদাবাদ তখন কেবল রাজনীতির কেন্দ্র ছিল না, ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় আর্থিক রাজধানী।
১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২৩ বছর বয়সে মুর্শিদাবাদের মসনদে আরোহণ করেন। কিন্তু সিরাজের মসনদে বসা সহজ ছিল না। চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল ষড়যন্ত্র:
১. পারিবারিক শত্রুতা: ঘসেটি বেগম (সিরাজউদ্দৌলার খালা) ও শওকত জং (মাসতুতো ভাই)। ২. দরবারি প্রধানদের ক্ষোভ: প্রধান সেনাপতি মিরজাফর, রায়দুর্লভ এবং জগৎ শেঠদের সাথে সিরাজের সম্পর্কের অবনতি। ৩. ইউরোপীয়দের উদ্ধত্য: বিশেষ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও নবাবের আদেশ অমান্য করা।
সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন অত্যন্ত দেশপ্রেমিক কিন্তু অভিজ্ঞতাহীন। ইংরেজদের শায়েস্তা করতে তিনি কাসিমবাজার কুঠি ও কলকাতা জয় করেন। কিন্তু ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আমবাগানে মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। সিরাজকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদে এনে নি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
মুর্শিদাবাদের নবাবী আমল ছিল এক অপূর্ব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। নবাবরা শিয়া মুসলিম হলেও হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের উৎসব-পার্বণে উদার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
মুর্শিদাবাদের কাসিমবাজার ছিল রেশম (Silk) ও মসলিন বাণিজ্যের অন্যতম বড় কেন্দ্র। সুতি ও রেশমের মিশ্রণে তৈরি 'বালুচরী' শাড়ি ও হাতির দাঁতের (Ivory) সূক্ষ্ম কাজ মুর্শিদাবাদকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
মুর্শিদাবাদের রাজদরবারে মহররম যেমন গম্ভীর ভাবাবেগে পালিত হতো, তেমনই দুর্গাপূজা, দেওয়ালি ও দোল পূর্ণিমায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ত। শুভ কাজের সূচনায় পঞ্জিকা দেখে তিথি ও লগ্ন নির্ধারণের প্রথা তৎকালীন হিন্দু রাজকর্মচারী ও বণিকদের মধ্যে অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। নবাবরাও প্রজাদের আনন্দ উৎসবে যোগ দিতেন। বিশেষ করে ভাগীরথী নদীতে 'বেড়া ভাসান' বা খাজা খিজিরের উদ্দেশ্যে ভেলা ভাসানোর উৎসব ছিল মুর্শিদাবাদের এক অনন্য আকর্ষণ।
মুর্শিদাবাদি পোলাও, কোফতা, মোঘলাই পরোটা এবং বিশেষ মিষ্টি 'ছানাবড়া' নবাবী রন্ধনশিল্পের অমর সৃষ্টি। কথিত আছে, নবাবের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় এমন ছানাবড়া তৈরি করা হতো যা বাইরে শক্ত কিন্তু ভেতরে রসালো।
আজও যারা মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ করেন, তারা নবাবী আমল ও পরবর্তীকালের বহু স্থাপত্য দেখে অতীতে ফিরে যান:
পলাশীর যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কলকাতার উত্থান ঘটে। কিন্তু ইতিহাস থেকে মুর্শিদাবাদের নাম মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।
মুর্শিদাবাদের নবাবী ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও কূটনীতির মিলনে একটি সাধারণ নদী তীরবর্তী অঞ্চল এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নগরে পরিণত হতে পারে। আজ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কোটি কোটি বাংলাভাষীর কাছে মুর্শিদাবাদ কেবল এক পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও ঐতিহ্য অনুধাবনের এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।
উত্তর: ১৭০৪ সালে মোগল সম্রাটের নির্দেশে দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খান তাঁর কার্যালয় ঢাকা থেকে মাকসুদাবাদে সরিয়ে আনেন। ১৭১৭ সালে তিনি বাংলার সুবাদার বা নাজিম হিসেবে স্বীকৃতি পেলে তাঁর নামানুসারে মাকসুদাবাদ শহরের নাম বদলে রাখা হয় 'মুর্শিদাবাদ'।
উত্তর: নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র। কাসিমবাজারের রেশম (Silk), সূক্ষ্ম মসলিন, কৃষি পণ্য এবং হাতির দাঁতের শিল্প ছিল অত্যন্ত বিখ্যাত। পাশাপাশি জগৎ শেঠদের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা ও রাজকোষ পরিচালনার কারণে মুর্শিদাবাদ ছিল তৎকালীন ভারতের ধনীতম শহরগুলির একটি।
উত্তর: ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধ ছিল মুর্শিদাবাদ তথা সমগ্র ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড়। এই যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হন, যার ফলে বাংলায় নবাবী শাসনের পতন ঘটে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়।
উত্তর: কাটরা মসজিদ ১৭২৪-২৫ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খান তৈরি করেছিলেন। এটি কেবল একটি বিশাল প্রার্থনা স্থানই ছিল না, এটি একটি ইসলামিক শিক্ষা কেন্দ্রও ছিল। এই মসজিদের বিশেষত্ব হলো, নবাব মুর্শিদ কুলি খানের অনাড়ম্বর জীবনের ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে মসজিদের প্রবেশপথের সিঁড়ির নিচে সমাহিত করা হয়েছে।