← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

মাইকেল মধুসূদন দত্ত: বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী মহাকবি, অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও রেনেসাঁসের অমর অধ্যায়

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ২ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার

বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন, অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈপ্লবিক উদ্ভাবন, 'মেঘনাদবধ কাব্য' এবং বাংলা রেনেসাঁসে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের এক মহাকাব্যিক ও করুণ ইতিহাস।

উনবিংশ শতাব্দীর উষালগ্নে বাংলা সাহিত্য যখন মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিকতার আলো খুঁজছিল, ঠিক তখনই আকাশে এক ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের। তিনি কেবল এক কবি বা নাট্যকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের নিয়মভাঙ্গা প্রথম সার্থক বিদ্রোহী। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে তিনি বাংলা ভাষাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। প্রাচীন প্রথা ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দের উদ্ভাবন, পাশ্চাত্যের ট্র্যাজেডির স্বাদ বাংলা নাটকে আনা এবং 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর মতো কালজয়ী মহাকাব্য রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের মানচিত্র চিরকালের জন্য বদলে দেন।

মধুসূদনের জীবন ছিল তাঁর নিজের সৃষ্ট ট্র্যাজেডির মতোই টানটান, নাটకీయ এবং গভীর বিষাদে ভরা। একদিকে ছিল তাঁর তীব্র আত্মাভিমান, বিশ্বখ্যাত হওয়ার দাম্ভিক স্বপ্ন এবং ইউরোপীয় জীবনযাত্রার প্রতি তীব্র আকর্ষণ; অন্যদিকে ছিল মাতৃভাষা ও জন্মভূমির প্রতি এক গোপন, গভীর ও ব্যাকুল ভালোবাসা।

কপিলমুনি ও সাগরদাঁড়ি: কপোতাক্ষের তীরে শৈশব ও বেড়ে ওঠা

১৮২৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি (বাঙালি পঞ্জিকা অনুযায়ী মাঘ মাসের ১২ তারিখ) অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদীর তীরে অবস্থিত সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও ধনবান জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মধুসূদন দত্ত। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতা সদর দেওয়ানি আদালতের একজন প্রতিপত্তিশালী আইনজীবী, আর মাতা জাহ্নবী দেবী ছিলেন এক বিদুষী ও ধর্মপ্রাণ নারী।

গ্রামের পাঠশালায় মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। শৈশবেই তিনি মায়ের কাছ থেকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ এবং রামপ্রসাদী গান শুনে বড় হয়েছেন। সাগরদাঁড়ি গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বিশেষ করে পাশ দিয়ে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদী তাঁর শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যদিও পরবর্তীতে তিনি সুদূর ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শৈশবের এই কপোতাক্ষ নদী তাঁর স্মৃতির ক্যানভাসে অমলিন ছিল।

হিন্দু কলেজ, ইয়ং বেঙ্গল ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির টান

১৮৩৭ সালে মধুসূদন কলকাতায় আসেন এবং তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এটি ছিল বাংলা রেনেসাঁসের সেই স্বর্ণযুগ, যখন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর 'ইয়ং বেঙ্গল' আন্দোলনের প্রভাবে কলকাতার শিক্ষিত তরুণ সমাজ প্রথাগত সামাজিক নিয়ম ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছিল।

হিন্দু কলেজে পড়ার সময়ই মধুসূদনের মেধার স্ফুরণ ঘটে। তিনি ইংরেজি, লাতিন, গ্রিক, হিব্রুসহ একাধিক ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। সহপাঠী গৌরদাস বসাক, ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং রাজনারায়ণ বসুর সাথে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এই সময়েই মধুসূদনের মনে এক অদ্ভুত স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়—তিনি হবেন একজন খাঁটি বিলেতি কবি, ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে জয় করবেন পুরো বিশ্ব। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ বাংলা ভাষার বদলে ইংরেজি সাহিত্যই তাঁর প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে।

ধর্মান্তর ও 'মাইকেল' উপাধি গ্রহণ: জীবনের প্রথম বড় বিতর্ক

১৮৪৩ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি মধুসূদন দত্ত এক চরম ও দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত যখন তাঁর বিয়ে এক বালিকার সাথে স্থির করেন, তখন মধুসূদন পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক বাধ্যবাধকতা এড়াতে এবং বিলেত যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের আশায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ওল্ড মিশন চার্চে ব্যাপটাইজড হয়ে তাঁর নামের আগে যুক্ত হয় 'মাইকেল' শব্দটি।

এই ধর্মান্তরের ফলে মধুসূদনের জীবনে নেমে আসে এক প্রচণ্ড ঝড়। হিন্দু কলেজের নিয়ম অনুযায়ী খ্রিস্টান হওয়ায় তাঁকে কলেজ ছাড়তে হয় এবং পিতা রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করে সমস্ত আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেন। স্বজাতি, সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও তরুণ মধুসূদন তাঁর জেদ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি শিবপুরের বিশপস কলেজে ভর্তি হয়ে গ্রিক, লাতিন, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষা শেখায় মন দেন।

মাদ্রাজ পর্ব: চরম সংগ্রাম ও মাতৃভাষার সংকেত

কলকাতা থেকে বিতাড়িত ও চরম আর্থিক সংকটে পড়ে ১৮৪৮ সালে মধুসূদন মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) চলে যান। সেখানে অর্থমাসিক পত্রিকার শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা শুরু করেন। মাদ্রাজে অবস্থানকালেই তিনি রেবেকা ম্যাকটাভিশকে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর সাথে বিচ্ছেদের পর হেনরিয়েটা ট্রাসকিটকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন।

মাদ্রাজ পর্বেই মধুসূদন ইংরেজি ভাষায় কাব্যচর্চা শুরু করেন এবং 'দ্য ক্যাপটিভ ল্যাডি' (The Captive Ladie) এবং 'ভিশনস অব দ্য পাস্ট' (Visions of the Past) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। 'দ্য ক্যাপটিভ ল্যাডি' কাব্যগ্রন্থটি ডিরোজিও ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে লেখা হলেও বিলেতের সাহিত্য সমালোচকদের কাছে তেমন সাড়া পায়নি। ইংরেজ কবি ও সমালোচকরা তাঁকে পরামর্শ দেন—নিজের মাতৃভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি না করলে কোনো কবিই বিশ্বসাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করতে পারেন না। এই সত্য উপলব্ধি করার পরেই মধুসূদনের জীবনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয়—মাতৃভাষার কোলে ফেরা।

বাংলা সাহিত্যে ধুমকেতুর মতো আত্মপ্রকাশ: নাট্যকার মধুসূদন

১৮৫৬ সালে মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন মধুসূদন। তখন কলকাতার বেলগাছিয়া থিয়েটারে রামনারায়ণ তর্করত্নের 'রত্নাবলী' নাটকটি অভিনয় করার আয়োজন চলছিল। নাটকটির ইংরেজি অনুবাদের দায়িত্ব পড়ে মধুসূদনের ওপর। অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন যে বাংলা নাটকের মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং তা মধ্যযুগীয় নিয়মে আচ্ছন্ন।

সংস্কৃত নাট্যরীতির শেকল ভাঙতে মধুসূদন নিজেই নাট্যকার হিসেবে কলম তুলে নেন। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর রচিত প্রথম বাংলা নাটক 'শর্মিষ্ঠা'। এটিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সর্বাঙ্গসুন্দর আধুনিক নাটক। এরপর তিনি লেখেন 'পদ্মাবতী' এবং 'একেই কি বলে সভ্যতা?' ও 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ'-এর মতো দুটি চমৎকার সামাজিক প্রহসন।

প্রহসন দুটিতে মধুসূদন তৎকালীন সমাজের দুটি দিককে নির্মমভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন—একদিকে ইয়ং বেঙ্গলের নামে সুরাপান ও উৃঙ্খলতা, আর অন্যদিকে প্রবীণ সমাজপতিদের ভণ্ডামি ও নৈতিক অবক্ষয়।

অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈপ্লবিক আবিষ্কার ও পয়ারের শেকল ভাঙা

বাংলা কবিতা তখনো চতুর্দশপদী পয়ার ছন্দের (৮+৬ মাত্রার অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দ) খাঁচায় বন্দি ছিল। পয়ারের এই একঘেয়ে মিলকে মধুসূদন বলতেন 'পদ্যের বেড়ি'। তিনি বিশ্বাস করতেন, গাম্ভীর্য ও মহাকাব্যিক ভাব প্রকাশের জন্য এই ঝংকারযুক্ত ছন্দের পরিবর্তন অপরিহার্য।

পাশ্চ্যাতের কবি জন মিল্টন ও শেক্সপিয়ারের 'ব্ল্যাঙ্ক ভার্স' (Blank Verse)-এর আদর্শে মধুসূদন বাংলা ভাষায় আবিষ্কার করেন 'অমিত্রাক্ষর ছন্দ'। অন্ত্যমিলহীন এই ছন্দে চরণের শেষে জ্যোতির কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না; ভাব এক চরণ থেকে গড়িয়ে চলে যেত অন্য চরণে। তৎকালীন পণ্ডিত সমাজ এই নতুন ছন্দকে প্রথমে গ্রহণ করতে চায়নি, একে অসম্ভব মনে করেছিল।

১৮৬০ সালে প্রকাশিত 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য'-এ তিনি প্রথম সফলভাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করে দেন যে বাংলা ভাষাও অত্যন্ত তীব্র, প্রদীপ্ত ও গম্ভীর ভাব প্রকাশে সমান সক্ষম।

"রেখো মা, দাসেরে মনে, এ আরতি করি পদে।
সাধিতে মনের সাধ ঘটে যদি পরমাদ,
মদীন যেন গো তা বলে তা তব মনে।"

মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য': নবজাগরণের এক অমর দলিল

১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি 'মেঘনাদবধ কাব্য'। নয়টি স্বর্গে বিভক্ত এই মহাকাব্যটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। রামায়ণের সনাতন কাহিনীকে অবলম্বন করে রচিত হলেও, এই কাব্যে মধুসূদনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আধুনিক।

বাংলা রেনেসাঁসের মানবতাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি রামায়ণের চিরাচরিত ধারার বিপরীতে গিয়ে রাক্ষসরাজ রাবণ ও তাঁর বীর পুত্র মেঘনাদকে নায়কের মর্যাদা দেন। আর রাম ও লক্ষণকে দেখেন ছলনাময় ও দুর্বল চরিত্র হিসেবে। স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় মেঘনাদের আত্মত্যাগ, রাবণের পিতৃ হৃদয়যন্ত্রণা এবং প্রমিলা দেবীর বীরত্ব ও পতিপ্রেম মধুসূদনের তুলিতে এক মহাকাব্যিক রূপ লাভ করে।

'মেঘনাদবধ কাব্য' কোনো দেবদেবীর অন্ধ মহিমা নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, দেশপ্রেম ও ট্র্যাজিক বেদনার এক অমর মহাকাব্য। এই একটি কাব্যই মধুসূদনকে বাংলা সাহিত্যের শেক্সপিয়ার ও মিল্টনের পাশে স্থান করে দেয়।

চতুর্দশপদী কবিতাবলী: বাংলায় সনেটের জন্ম ও স্বদেশপ্রেম

ইউরোপীয় সাহিত্য দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে মধুসূদন ইতালীয় কবি পেত্রার্কের আদর্শে বাংলা সাহিত্যে প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতা প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালে তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত 'চতুর্দশপদী কবিতাবলী'।

এই কবিতাগুলির মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও জনপ্রিয় হলো 'কপোতাক্ষ নদ'। সুদূর ইউরোপে বসে, যখন দারিদ্র্য ও হতাশায় তাঁর জীবন বিপর্যস্ত, তখন শৈশবের নদীর কথা মনে করে কবি আকুল হয়ে লিখেছিলেন:

"सतत, हे नद, तुमि पड़ मोरे मने।
सतत तुमार कथा भावि ए विरले।"

এই কবিতায় কেবল অতীত স্মৃতি নয়, ফুটে উঠেছিল মাতৃভাষা ও জন্মভূমির প্রতি এক প্রগাঢ়, ব্যাকুল দেশপ্রেম। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বিলেতি হওয়ার যে মোহ তাঁকে তাড়া করেছিল, তা আসলে ছিল এক মরীচিকা।

ইউরোপ যাত্রা, চরম আর্থিক সংকট ও বিদ্যাসাগরের ঋণ

১৮৬২ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে মধুসূদন বিলেত পাড়ি জমান। পরবর্তীতে তিনি পরিবারকে ফ্রান্সে নিয়ে যান এবং ভার্সাই শহরে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। দেনার দায়ে তাঁর জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়, সন্তানদের আহার জোগানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সেই অন্ধকার দিনে ফ্রান্সে বসে মধুসূদন চিঠি লেখেন করুণাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে। বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজ উদ্যোগে বিপুল টাকা ঋণ করে এবং চাদা তুলে ইউরোপে মধুসূদনের কাছে পাঠান। বিদ্যাসাগরের এই মহানুভবতার কারণেই মধুসূদন ব্যারিস্টারি পাস করতে পেরেছিলেন। মধুসূদন পরম শ্রদ্ধায় বিদ্যাসাগর সম্পর্কে লিখেছিলেন—"যার জ্ঞান প্রাচীন ঋষির মতো, বিদ্যা ইংরেজের মতো এবং হৃদয় এক প্রকাণ্ড বাঙালি মায়ের মতো।"

অন্তিম দিনগুলো: করুণ ট্র্যাজেডি ও নীরব বিদায়

১৮৬৭ সালে ব্যারিস্টার হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন মধুসূদন। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে তিনি সফল হতে পারেননি। তাঁর অপরিনামদর্শী খরচ করার স্বভাব, বিলাসিতা এবং মদ্যপান তাঁকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। একই সাথে শারীরিক অসুস্থতা ও লিভারের রোগ তাঁকে গ্রাস করে।

জীবনের শেষভাগে মহাকবিকে আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে অত্যন্ত করুণ অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। মৃত্যু শয্যায় যখন কবি শায়িত, তার মাত্র তিন দিন আগে (১৮৭৩ সালের ২৬শে জুন) মারা যান তাঁর প্রিয়তমা পত্নী হেনরিয়েটা। এই শোক সহ্য করা কবির পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৮৭৩ সালের ২৯শে জুন (বাঙালি পঞ্জিকায় ১৫ই আষাঢ়, ১২৮০ বঙ্গাব্দ) মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই মহান কবি চিরবিদায় নেন।

কলকাতার সার্কুলার রোড নদীর ধারে খ্রিস্টান গোরস্থানে কবিকে সমাহিত করা হয়। নিজের সমাধিলিপির জন্য তিনি নিজেই লিখে গিয়েছিলেন সেই অমর পংক্তি:

"দাঁড়াও, পথিকের বর, যদি জন্ম তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিতলে
(জননীর কোলে শিশু সোবে যেমন্ত হে
নিরবধি) ঘুমাইছে শিশু তপোবনে..."

বাংলা সংস্কৃতিতে মধুসূদনের চিরন্তন প্রভাব

মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন বাংলা নবজাগরণের এক আলোকবর্তিকা। তিনি যা ছুয়েছেন, তাকেই আধুনিক রূপ দিয়েছেন।

প্রতি বছর ২৪শে জানুয়ারি ও পৌষ সংক্রান্তির উৎসবমুখর দিনগুলোতে যশোরের সাগরদাঁড়িতে মধুসূদন মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লক্ষ লক্ষ সাহিত্যপ্রেমী মানুষ কপোতাক্ষের তীরে সমবেত হয়ে এই মহাকবিকে শ্রদ্ধা জানান। বাংলা সনের পরিবর্তনের সাথে সাথে যুগ বদলালেও, বাংলা সাহিত্যের আকাশে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করবে।

সাধারণ প্রশ্ন

মাইকেল মধুসূদন দত্ত কেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ উদ্ভাবন করেছিলেন?

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন পয়ার ছন্দের একঘেয়ে অন্ত্যমিল ও মিলের সীমাবদ্ধতা মধুসূদনের মহাকাব্যিক চিন্তা প্রকাশের উপযুক্ত ছিল না। ইংরেজি কবি মিল্টনের 'ব্ল্যাঙ্ক ভার্স'-এর অনুসরণে বাংলা কবিতাকে মুক্ত গতি, গাম্ভীর্য ও ভাবের অবাধ প্রবাহ দিতে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের উদ্ভাবন করেন।

'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ও মূল ভাবনা কী?

'মেঘনাদবধ কাব্য' হলো বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক আধুনিক মহাকাব্য। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো রামায়ণের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে মানবতাবাদী রেনেসাঁসের প্রভাবে রাক্ষসরাজ রাবণ ও মেঘনাদকে ট্র্যাজিক নায়ক ও বীর দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করা এবং রাম-লক্ষণকে দুর্বল ও ছলনাময় চরিত্র হিসেবে দেখানো।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে মধুসূদনের সম্পর্ক কেমন ছিল?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে মধুসূদনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। ফ্রান্সে থাকাকালীন মধুসূদন যখন চরম আর্থিক কষ্টে দেনার দায়ে ডুবে গিয়েছিলেন, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে ফ্রান্সে পাঠিয়ে তাঁর জীবন ও সম্মান রক্ষা করেছিলেন। মধুসূদন বিদ্যাসাগরকে "বাঙালি মায়ের হৃদয়সম্পন্ন মানুষ" বলে অভিহিত করেছিলেন।

মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত কয়েকটি সাহিত্যকর্মের নাম কী?

মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য', কাব্যগ্রন্থ 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য', 'ব্রজাঙ্গনা কাব্য', 'বীরঙ্গনা কাব্য', 'চতুর্দশপদী কবিতাবলী' (সনেট), নাটক 'শর্মিষ্ঠা', 'পদ্মাবতী', 'কৃষ্ণকুমারী' এবং দুটি প্রহসন 'একেই কি বলে সভ্যতা?' ও 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ'।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার