← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

মাস্টারদা সূর্য সেন: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, রক্তঝরা বিপ্লব ও স্বাধীনতার অমর মহাকাব্য

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার

সাধারণ এক শান্তশিষ্ট স্কুলশিক্ষক কীভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন প্রতাপশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত? জানুন মাস্টারদা সূর্য সেন ও তাঁর ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও ঐতিহাসিক বিপ্লবী সংগ্রামের সম্পূর্ণ আখ্যান।

ভূমিকা: পরাধীনতার অন্ধকারে এক সূর্যোদয়

বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে, পরাধীন ভারতের পূর্ব সীমান্তে চট্টগ্রাম শহরের শান্ত পরিবেশের নেপথ্যে ফুটছিল এক অভূতপূর্ব অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার সাহস তৎকালীন সময়ে অনেকেই দেখাতেন, কিন্তু এক সম্পূর্ণ অঞ্চলকে কয়েক দিনের জন্য স্বাধীন করে সেখানে বিপ্লবীদের পতাকা ওড়ানোর কল্পনা ছিল এক অসমসাহসিক স্বপ্ন। আর এই দুঃসাহসিক রূপকথার রূপকার ছিলেন এক অতি সাধারণ চেহারার মানুষ—ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত, শান্ত স্বভাবের গণিতের শিক্ষক সূর্যকুমার সেন, যাঁকে সমগ্র বাংলা ও ভারত চেনে ‘মাস্টারদা’ নামে।

মাস্টারদা সূর্য সেন কেবল একজন বিপ্লবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ সংগঠক, সামরিক কৌশলী এবং এমন এক দূরদর্শী নেতা যিনি জানতেন কীভাবে পরাধীন দেশের যুবসমাজকে মাতৃভূমির বেদিমূলে হাসিমুখে আত্মাহুতি দিতে অনুপ্রাণিত করতে হয়। ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিলের ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কেবল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক লাল অক্ষরে লেখা তারিখ নয়, এটি ছিল ব্রিটিশদের মনে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দিন যে, তাঁদের সূর্য অস্তমিত হওয়ার সময় এসে গেছে।


প্রারম্ভিক জীবন ও বিপ্লবী ভাবধারায় দীক্ষা

১৮৯৪ সালের ২২শে মার্চ (বাংলা ৯ই চৈত্র ১৩০০ বঙ্গাব্দ) চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সূর্য সেন। তাঁর পিতা রাজমণি সেন ছিলেন এক নিম্নপদস্থ রাজকর্মচারী এবং মাতা শশীবালা দেবী। শৈশবেই পিতৃহীন হওয়ায় জেঠামহাশয় ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নবকুমার সেনের স্নেহে তিনি লালিত-পালিত হন।

চট্টগ্রামের দয়াল সিং হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সূর্য সেন ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি দেন বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে (বর্তমানে মুর্শিদাবাদে অবস্থিত)। ১৯১৬ সালে তিনি সেখান থেকে বিএ পাশ করেন। বহরমপুরেই তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ঘটে। সেখানে তিনি তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন, যিনি ছিলেন তত্कालीन যুগান্তর দলের সক্রিয় সদস্য। সতীশচন্দ্রের প্রেরণাতেই তরুণ সূর্য সেন বিপ্লববাদের মহান মন্ত্রে দীক্ষিত হন। দেশপ্রেমের যে আগুন বহরমপুরে তাঁর হৃদয়ে প্রজ্বলিত হয়েছিল, তা আর কোনোদিন নেভেনি।

বাংলায় ফিরে এসে পরিবারের চাপে ১৯১৯ সালে তিনি পুস্পকুন্তলা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু বিবাহিত জীবনের চিরাচরিত পথ তাঁর জন্য ছিল না। বিবাহের রাত্রেই তিনি স্ত্রীকে নিজের জীবনের লক্ষ্য ও বিপ্লবী পথের ব্রত সম্পর্কে জানিয়ে দেন এবং ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বিদায় জানিয়ে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সঁপে দেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।


শিক্ষকতা থেকে বিপ্লবের ‘মাস্টারদা’

চট্টগ্রামে ফিরে তিনি উমাতারা উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অত্যন্ত স্নেহশীল, সদাসলাপী ও আদর্শবান শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে দ্রুত প্রিয় হয়ে ওঠেন। ছাত্ররা ভালোবেসে তাঁকে ডাকতে শুরু করে ‘মাস্টারদা’। আর এই ‘মাস্টারদা’ নামটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিসংবাদিত প্রতীক।

শিক্ষকতার আড়ালেই মাস্টারদা শুরু করেন তাঁর আসল কাজ—তরুণদের সংঘটিত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল রাজনীতি বা বক্তৃতা দিয়ে স্বাধীনতা আসবে না; সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ব্রিটিশদের পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করতে হবে। তিনি চট্টগ্রামের কংগ্রেস কমিটিতে যোগ দেন এবং ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক পদেও তিনি নির্বাচিত হন। কিন্তু অহিংস আন্দোলনে স্বরাজ অর্জিত না হওয়ায় তিনি পুনঃপ্রবেশ করেন সশস্ত্র বিপ্লবের রক্তঝরা পথে।

মাস্টারদার এই বিপ্লবী দলে যুক্ত হন একঝাঁক দুঃসাহসী তরুণ ও যুবনেতা—অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, তারকেশ্বর দস্তিদার, নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, এবং পরবর্তীতে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের মতো মহীয়সী বীরকন্যারা।


ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি ও অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নীলক নকশা

১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে মাস্টারদা অনুধাবন করেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো ব্রিটিশ অফিসারকে হত্যা করার চেয়ে এক বিশাল ও পরিকল্পিত আঘাত হানা প্রয়োজন, যা সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দেবে। তিনি আইরিশ ইস্টার রাইজিং (Irish Easter Rising)-এর আদলে একটি বিপ্লবী সেনাবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এই বাহিনীর নাম দেওয়া হয় ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি (আইআরএ) — চট্টগ্রাম শাখা’ (Indian Republican Army, Chittagong Branch)।

বিপ্লবীদের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম শহরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক বিস্তৃত নিখুঁত নীলক নকশা। পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যগুলি ছিল:

১. চট্টগ্রামের দুটি প্রধান অস্ত্রাগার লুণ্ঠন: পুলিশ লাইনসের প্রধান অস্ত্রাগার এবং সহায়ক বাহিনী (Auxiliary Force)-এর অস্ত্রাগার দখল করা। ২. যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা: টেলিফোন, টেলিগ্রাফ লাইন কেটে দেওয়া এবং রেললাইন উপড়ে ফেলে চট্টগ্রামকে ভারত ও বার্মার রেঙ্গুনের যোগাযোগ থেকে একদম বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। ৩. ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ: ব্রিটিশ আধিকারিকদের বন্দী করা বা হত্যা করা।

পরিকল্পনার দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল—বাংলায় যা ছিল ৫ই বৈশাখ ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। দিনটি ছিল ‘গুড ফ্রাইডে’ (Good Friday), যা ইউরোপীয়দের জন্য ছুটির দিন হওয়ায় তাদের সতর্কতা কম থাকবে বলে হিসাব করেছিলেন মাস্টারদা।

"মাতৃভূমির মুক্তির জন্য আমাদের রক্ত দিতে হবে। আমরা যদি আজ মারাও যাই, আমাদের শহীদ হওয়ার এই ইতিহাস আগামীর বিপ্লবীদের পথ দেখাবে।" — মাস্টারদা সূর্য সেন

১৮ই এপ্রিল ১৯৩০: সেই ঐতিহাসিক রক্তঝরা রাত

১৮ই এপ্রিল রাত ১০টার দিকে মাস্টারদার নির্দেশে চট্টগ্রাম শহরজুড়ে একসাথে শুরু হয় সমন্বিত আক্রমণ।

অস্ত্রাগার দখল করে সমস্ত রাইফেল বাইরে বের করে আনা হলেও, বিপ্লবীরা একটি বড় প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন—অস্ত্র পেলেও কার্তুজ ও ভারী গোলাবারুদের ঘরটি তালাবদ্ধ ছিল এবং তা ভাঙার মতন সঠিক বিস্ফোরক তাঁদের কাছে ছিল না। তবু, রাতের মধ্যেই মাস্টারদা সূর্য সেনকে সেনাপতি হিসেবে বরণ করে আইআরএ-র বিপ্লবী বাহিনী চট্টগ্রামকে ‘স্বাধীন বিপ্লবীদের অস্থায়ী সরকার’ (Provisional Revolutionary Government) হিসেবে ঘোষণা করে। স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং মাস্টারদাকে প্রদান করা হয় ‘গার্ড অফ অনার’ (Guard of Honour)।

পরের কয়েক দিনের জন্য সমগ্র চট্টগ্রাম থেকে ব্রিটিশ শাসন কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু ব্রিটিশদের বিপুল গোলাবারুদের পাল্টা আক্রমণের মুখে দীর্ঘক্ষণ শহর ধরে রাখা অসম্ভব বুঝে মাস্টারদা বাহিনীকে শহরের কাছের পাহাড়ি এলাকায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।


জালালাবাদ পাহাড়ের অসম যুদ্ধ: এক মহাকাব্যিক লড়াই

অস্ত্রাগার আক্রমণের পর বিপ্লবীরা আশ্রয় নেন শহরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জালালাবাদ পাহাড়ে। ২২শে এপ্রিল ১৯৩০ (৯ই বৈশাখ ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ) বিকেলে ব্রিটিশ বাহিনীর ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস ও সুরমা ভ্যালি লাইট হর্স জালালাবাদ পাহাড় ঘেরাও করে বিপুল আধুনিক গোলাবারুদ ও মেশিনগান নিয়ে আক্রমণ চালায়।

পাহাড়ের ওপর সামান্য রাইফেল ও পিস্তল নিয়ে অবস্থান করছিলেন মাত্র ৫০-৬০ জন তরুণ বিপ্লবী। কিন্তু তাঁদের সাহসের সামনে নতিস্বীকার করতে হয় আধুনিক ব্রিটিশ সেনাকেও। লোকনাথ বলের দক্ষ সামরিক পরিচালনায় বিপ্লবীরা পাহাড়ের উপর থেকে ব্রিটিশদের ওপর ভয়াবহ পাল্টা আক্রমণ চালান।

এই অসম যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রায় ৭০-৮০ জন সৈন্য নিহত হয়। বিপরীতে, মাতৃভূমির স্বাধীনতার বেদিমূলে প্রাণ বিসর্জন দেন ১২ জন বীর বিপ্লবী—হরিকান্ত বৈশ্য, ত্রিপুরা সেন, প্রবাস বল, নরেশ রায়, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, মধুসূদন দত্ত, পুলিনচন্দ্র ঘোষ, মতিলাল কানুনগো, নির্মল লাহা, জীতেন্দ্র দাশগুপ্ত, ষষ্ঠীচরণ দত্ত এবং শশাঙ্কশেখর দত্ত।

জালালাবাদের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায়, যেখানে প্রমাণ হয়েছিল ভারতীয় যুবকরা ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি যুদ্ধে হারাত সক্ষম।


গেরিলা যুদ্ধ, প্রীতিলতার আত্মত্যাগ ও ধলঘাট সংঘর্ষ

জালালাবাদ যুদ্ধের পর রাতের অন্ধকারে মাস্টারদা বাহিনীকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে গেরিলা যুদ্ধের নির্দেশ দেন। বিপ্লবীরা ছড়িয়ে পড়েন চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকায়। সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ—হিন্দু ও মুসলিম নির্বিশেষে—নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মাস্টারদা ও তাঁর সঙ্গীদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার জুগিয়েছেন।

এই সময়েই মাস্টারদার দলে যুক্ত হন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত। প্রীতিলতা ছিলেন চট্টগ্রামের নন্দনকানন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। ১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতার নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী আক্রমণ চালান পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাবে, যার দরজায় লেখা থাকত "ডগস অ্যান্ড ইন্ডিয়ানস নট অ্যালাউড"। সফল আক্রমণের পর প্রীতিলতা সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন, যা বাংলায় নারী বিপ্লবীদের এক অভূতপূর্ব ইতিহাস রচনা করে।

এর আগে ১৯৩২ সালের ১৩ই জুন ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে গোপন আস্তানায় ব্রিটিশ ফৌজ ঘেরাও করলে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন মাস্টারদার ডানহাত নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। তবে মাস্টারদা নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।


বিশ্বাসঘাতকতা ও সূর্য সেনের গ্রেফতারি

ব্রিটিশ সরকার মাস্টারদাকে জীবিত বা মৃত ধরার জন্য ১০,০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল (তৎকালীন সময়ে যা ছিল এক বিপুল অর্থ)। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর আত্মগোপনে থেকে সূর্য সেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এক পরিচিত মানুষের লোভেই কাল হলো। ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি (৪ঠা ফাল্গুন ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) গৈরালা গ্রামে নেত্র সেন নামক এক চরম বিশ্বাসঘাতকের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মাস্টারদা ও কল্পনা দত্ত। নেত্র সেন পুরস্কারের টাকার লোভে গোপনে পুলিশকে খবর দেয়।

রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ মিলিটারির ক্যাপ্টেন গেটের নেতৃত্বে বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। সূর্য সেন ও ব্রজেন সেন গ্রেফতার হন, যদিও কল্পনা দত্ত ও মণি দত্ত অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে বিপ্লবী মহেশ বড়ুয়া বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনকে হত্যা করে মাস্টারদার গ্রেফতারির প্রতিশোধ নেন।


নিঃশংস নির্যাতন, প্রহসনের বিচার ও ফাঁসির মঞ্চে অমরত্ব

গ্রেফতারের পর মাস্টারদা সূর্য সেনকে রাখা হয় চট্টগ্রাম জেলে। ব্রিটিশ সরকার তাঁর ওপর চালায় মধ্যযুগীয় বরবর অত্যাচার। তাঁর শরীর থেকে নখ উপড়ে ফেলা হয়, পিটিয়ে দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়, হাত-পায়ের হাড় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে তিনি একটুও হাঁটাচলা করতে না পারেন। কিন্তু এই অমানুষিক যন্ত্রণার মধ্যেও মাস্টারদার মুখ থেকে ব্রিটিশরা একটিও গোপন তথ্য বের করতে পারেনি।

পরবর্তীতে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে এক প্রহসনের বিচারে মাস্টারদা সূর্য সেন এবং তাঁর সহযোদ্ধা তারকেশ্বর দস্তিদার-কে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি (২৮শে পৌষ ১৩৪০ বঙ্গাব্দ) মধ্যরাতে চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল জেলে কার্যকর করা হয় এই ঐতিহাসিক ফাঁসি। কিন্তু ফাঁসির পূর্বেও তাঁদের ওপর চালানো হয় নারকীয় অত্যাচার। নির্যাতনের চোটে মাস্টারদা অচেতন হয়ে পড়েছিলেন; অচৈতন্য অবস্থাতেই তাঁকে ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

ব্রিটিশদের ভয় এতটাই গভীর ছিল যে, ফাঁসির পর স্বজনদের হাতে তাঁদের মৃতদেহ তুলে দেওয়া হয়নি। লোহার খাঁচায় ভরে ভারী পাথর বেঁধে মাস্টারদা ও তারকেশ্বরের দেহ বঙ্গোপসাগরের গভীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাঁদের কোনো সমাধি ক্ষেত্র তৈরি না হয় এবং তা বিপ্লবের নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না হতে পারে।


মাস্টারদার শেষ চিঠি ও চিরন্তন বার্তা

ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে, ১১ই জানুয়ারি রাতে, মাস্টারদা তাঁর প্রিয় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লিখে যান এক অমর চিরকূট, যা আজও ভারতীয়দের হৃদয়ে অমলিন হয়ে রয়েছে:

"আমার শেষ প্রার্থনা—ভারতের স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে, তাদের ভুলো না। ১৮ই এপ্রিল ১৯৩০-এর চট্টগ্রাম বিপ্লবের কথা মনের মধ্যে জিইয়ে রেখো। আইআরএ-র বীর যোদ্ধাদের রক্তের ঋণ শুধতে হবে। আমার সপ্রমে ভালোবাসা ও আশীর্বাদ রইল। চিরদিনের জন্য বিদায়। জয় বাংলা, বন্দেমাতরম্।"

ইতিহাস ও বাঙালির সংস্কৃতিতে মাস্টারদা সূর্য সেনের গুরুত্ব

মাস্টারদা সূর্য সেন কেবল চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের মুক্তির এক রূপকার। তাঁর কর্মকাণ্ড অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল ভগৎ সিংহের সঙ্গীদের থেকে শুরু করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত। পরবর্তীতে নেতাজি তাঁর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠনের সময় সূর্য সেনের আইআরএ (IRA)-র সাংগঠনিক রূপরেখাকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাসে মাস্টারদার অবদান অপরিসীম। প্রতি বছর বাংলা পঞ্জিকার বিভিন্ন শুভ দিন ও উৎসবের মাঝে, বিশেষ করে ১৮ই এপ্রিল (অস্ত্রাগার লুণ্ঠন দিবস) ও ১২ই জানুয়ারি (মাস্টারদার প্রয়াণ দিবস) সাড়ম্বরে পালিত হয়। চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা—দুই বাংলার তরুণ সমাজ আজও মাস্টারদার আদর্শ থেকে দেশপ্রেমের দীক্ষা নেয়।

পঞ্জিকার পাতায় পৌষ মাসের শেষ লগ্নে (২৮শে পৌষ) তাঁর ফাঁসির দিনটি স্মরণ করার সময় প্রতিটি বাঙালির হৃদয় শ্রদ্ধায় অবনত হয়। মাস্টারদার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে, কিন্তু তাঁর আদর্শের সূর্য আজও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে কোটি বাঙালির হৃদয়ে।


সাধারণ প্রশ্ন

১. মাস্টারদা সূর্য সেন কে ছিলেন এবং কেন তিনি বিখ্যাত?

মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন বাংলা ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতা। তিনি ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনী (ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি)-র নেতৃত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেন এবং কয়েক দিনের জন্য চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করে স্বাধীন সরকার গঠন করেছিলেন।

২. চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কত সালে এবং কার নেতৃত্বে হয়েছিল?

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল (৫ই বৈশাখ ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ) মাস্টারদা সূর্য সেনের দূরদর্শী নেতৃত্বে এবং অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেনদের সরাসরি অংশগ্রহণে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সফলভাবে পরিচালিত হয়।

৩. মাস্টারদা সূর্য সেনকে কখন এবং কীভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল?

১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি (২৮শে পৌষ ১৩৪০ বঙ্গাব্দ) মধ্যরাতে চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল জেলে মাস্টারদা সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির পূর্বে তাঁদের ওপর নৃশংস শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং ফাঁসির পর দেহ দুটি বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

৪. প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের সাথে সূর্য সেনের সম্পর্ক কী ছিল?

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত ছিলেন সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠন 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'-র প্রধান নারী সদস্য। মাস্টারদার অনুপ্রেরণাতেই প্রীতিলতা ১৯৩২ সালে ঐতিহাসিক পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করেন এবং অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার