← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

জামাইষষ্ঠীর ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনি ও রীতিনীতি: বাঙালির মধুমাসের চিরন্তন পার্বণ

🎉 উৎসব  ·  ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার

জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে কেন জামাইকে রাজকীয় বরণ করা হয়? জানুন জামাইষষ্ঠীর পৌরাণিক গল্প, আচার-অনুষ্ঠান, বাঙালির ভোজনবিলাস ও সামাজিক ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ কাহিনি।

ভূমিকা: বাঙালির মধুমাস ও জামাইষষ্ঠীর আগমন

বাংলা পঞ্জিকার জ্যৈষ্ঠ মাসকে বলা হয় 'মধুমাস'। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু আর তরমুজের মৌ মৌ গন্ধে যখন বাংলার বাতাস ভারাক্রান্ত, ঠিক তখনই বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দ ও উৎসবের ডঙ্কা বাজায় এক অনন্য সামাজিক পার্বণ—জামাইষষ্ঠী। বিশ্বজুড়ে রকমারি উৎসব ও লোকাচার ছড়িয়ে থাকলেও জামাতা বা জামাইকে কেন্দ্র করে এমন মহোৎসব উদযাপনের নজির বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। জামাইষষ্ঠী কেবল এক পেটুক জামাইকে আপ্যায়ন করার আনুষ্ঠানিকতা নয়, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মাতৃতান্ত্রিক বাংলার গভীর সামাজিক ইতিহাস, পৌরাণিক বিশ্বাস, পারিবারিক বন্ধন এবং আবহমান বাংলার যৌথ পরিবারের গভীর আবেগ।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, এমনকি সুদূর প্রবাসী বাঙালির ড্রয়িংরুমেও জ্যৈষ্ঠের ষষ্ঠী তিথিতে জামাইষষ্ঠীর বিশেষ গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়। শুভ মুহূর্তের গণনায় শুদ্ধ পঞ্জিকা মেনে শাশুড়ি মায়েরা তাঁদের কন্যা ও জামাতার দীর্ঘায়ু, সুস্থতা ও সুখের কামনায় ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা করেন। আসুন, বাঙালির এই চিরন্তন উৎসবের পৌরাণিক উৎসমূল, ঐতিহাসিক বিবর্তন, বিস্তারিত আচার-অনুষ্ঠান এবং আধুনিক যুগের রূপান্তরের সবিস্তার ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক।


পৌরাণিক কাহিনি: ষষ্ঠী দেবী ও বিড়ালের গল্প

জামাইষষ্ঠীর মূল উৎপত্তি কিন্তু সরাসরি 'জামাই'-এর পুজো থেকে হয়নি; এর মূল ভিত্তি হলো দেবী ষষ্ঠী-র আরাধনা। সনাতন ও লৌকিক ধর্মীয় সংস্কৃতিতে দেবী ষষ্ঠী হলেন সন্তানদাত্রী ও সন্তানপালিকা দেবী। তিনি মাতৃত্বের রক্ষাকর্ত্রী এবং শিশুদের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষাকারী পৌরাণিক শক্তি। জামাইষষ্ঠীর পেছনের লোককাহিনিটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও শিক্ষণীয়।

বিড়াল ও গৃহবধূর উপাখ্যান

পৌরাণিক ও লোকগাথা অনুসারে, এক গৃহস্থের এক কৃপণ ও লোভী গৃহবধূ ছিল। সে ঘরের ক্ষীর, মাখন ও নানাবিধ সুস্বাদু খাবার একা একাই চুরি করে খেয়ে ফেলত। আর যখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জিজ্ঞেস করত, তখন সে দোষ চাপিয়ে দিত পরিবারের গৃহপালিত এক কালো বিড়ালের ওপর। কিন্তু বিড়াল হলো স্বয়ং দেবী ষষ্ঠীর বাহন। বারবার অন্যায়ভাবে মিথ্যা দোষারোপের শিকার হয়ে বিড়াল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয় এবং দেবী ষষ্ঠীর কাছে গিয়ে বিচার চায়।

দেবী ষষ্ঠী তাঁর বাহনের ওপর এই অবিচারে রুষ্ট হন। তিনি ওই গৃহবধূর অপরাধের শাস্তি হিসেবে তার সাতটি পুত্র ও এক কন্যাকে একে একে অদৃশ্য করে দেন। একের পর এক সন্তানকে হারিয়ে ওই বধূ শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং কান কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে বনে গিয়ে দেবী ষষ্ঠীর তীব্র তপস্যা ও আরাধনা শুরু করে।

দেবী ষষ্ঠী সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দর্শন দেন এবং বলেন যে, বাহন বিড়ালের প্রতি অন্যায় করার জন্যই তার এই দশা হয়েছে। দেবী তাকে নির্দেশ দেন জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে সমস্ত নিয়ম মেনে ষষ্ঠী পুজো করতে এবং বিড়ালকে সম্মান ও ভালো খাবার দান করতে। বধূটি ভক্তিসহকারে জ্যৈষ্ঠের ষষ্ঠীতে ব্রত পালন করে এবং দেবী ষষ্ঠী প্রসন্ন হয়ে তার সমস্ত হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে দেন। সেই থেকে শিশু ও পরিবারের সুরক্ষায় ষষ্ঠী ব্রত প্রচলিত হয়।

কীভাবে এটি 'জামাইষষ্ঠী' হয়ে উঠল?

প্রশ্ন উঠতে পারে, সন্তান রক্ষার এই ব্রত কীভাবে জামাই বরণের উৎসবে রূপান্তরিত হলো? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সামাজিক প্রেক্ষাপটে। তৎকালীন সমাজে বিবাহিত মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর পর তার ওপর কোনো অত্যাচার হচ্ছে কি না বা সে কেমন আছে, তা জানার সহজ কোনো মাধ্যম ছিল না। আবার অনেক সময় কড়া সামাজিক নিয়মের কারণে মেয়েদের ঘন ঘন বাপের বাড়িতে আসার অনুমতি দেওয়া হতো না।

লোকাচার অনুযায়ী, কোনো নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে বা সন্তানের মঙ্গলকামনায় ষষ্ঠী ব্রত পালন না করা পর্যন্ত বাপের বাড়িতে পা রাখতে পারত না। শাশুড়ি মায়েরা বুদ্ধি করে দেবী ষষ্ঠীর ব্রতের সাথে জামাইকে নিমন্ত্রণ জানানোর রীতি যোগ করেন। নিয়ম করা হয়, জামাই বাপের বাড়িতে না এলে মেয়ে আসতে পারবে না এবং জামাইকে দেবী ষষ্ঠীর প্রসাদ ও আশীর্বাদ গ্রহণ করতে হবে। ফলে জামাইকে সঙ্গে নিয়ে মেয়ে বাপের বাড়িতে আসার সুযোগ পেত। দেবীর আশীর্বাদে জামাই ও কন্যার দাম্পত্য জীবন দীর্ঘ ও সুখী হোক—এই কামনায় ষষ্ঠী পুজো রূপ নেয় 'জামাইষষ্ঠী'-তে।


সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন: প্রাচীন বাংলা থেকে মধ্যযুগ

জামাইষষ্ঠী শুধুই একটি ধর্মীয় কিংবা পারিবারিক আচার নয়, এর একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন রয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় সামাজিক কাঠামোটি কেমন ছিল, তার একটি সুন্দর প্রতিফলন পাওয়া যায় এই পার্বণে।

১. বাল্যবিবাহ ও কন্যাদের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা

আজ থেকে এক দেড়শ বছর আগেও বাংলায় বাল্যবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। আট বা দশ বছরের কম বয়সী কন্যারা বিয়ের পর বহু দূরের গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে চলে যেত। তখনকার দিনে যোগাযোগের মাধ্যম বলতে ছিল গরুর গাড়ি বা নৌকা। ফলে কন্যাসন্তানরা বাপের বাড়ি থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। মায়েদের মন ছটফট করত মেয়েকে এক নজর দেখার জন্য। জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে জামাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিমন্ত্রণ করার সামাজিক স্বীকৃতি শাশুড়িদের মেয়েকে চোখের সামনে দেখার পরম সুযোগ করে দিত।

২. মাতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সুবাতাস

যদিও বাংলা সমাজ প্রধানত পিতৃতান্ত্রিক, কিন্তু লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানে মাতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির গভীর প্রভাব স্পষ্ট। জামাইষষ্ঠীর দিনে জামাইকে সর্বোচ্চ সম্মান ও পরিবারের চালিকাশক্তি হিসেবে বরণ করা হয়। শাশুড়ি মা নিজ হাতে জামাইয়ের কপালে দই-হলুদের তিলক কেটে, তালপাখা দিয়ে বাতাস করে, আশীর্বাদী সুতো বেঁধে অভ্যর্থনা জানান। এটি প্রকৃতপক্ষে নতুন পরিবার প্রতিষ্ঠা করা তরুণ পুরুষের ওপর মা-সুলভ ভালোবাসার এক অদ্ভুত জয়গান।

৩. কৃষিভিত্তিক সমাজ ও জ্যৈষ্ঠের অবদান

জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু পাকাসংক্রান্ত কৃষি উৎসবের সময়। নবান্নের মতো জ্যৈষ্ঠেও গৃহস্থের ঘরে নতুন ফলমূলের ঢল নামত। এই প্রাক-বর্ষা মৌসুমে প্রকৃতির অকৃপণ দানকে পরিবারের নতুন সদস্য অর্থাৎ জামাইয়ের সামনে তুলে ধরা হতো। প্রকৃতির এই প্রাচুর্য ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবেই জামাইষষ্ঠীর অর্ঘ্যে ফলমূলের এত প্রাধান্য।


পঞ্জিকা, তিথি ও শুভ মুহূর্তের শাস্ত্রীয় তাৎপর্য

জামাইষষ্ঠী উদযাপনের আগে বাংলা পঞ্জিকার হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পঞ্জিকা ও জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়।


জামাইষষ্ঠীর বিস্তারিত আচার ও রীতিনীতি

জামাইষষ্ঠীর দিনটি সকাল থেকেই ব্যস্ততা ও আনন্দের আমেজে ভরা থাকে। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত ধাপে ধাপে নানাবিধ ঐতিহ্যবাহী আচার সম্পন্ন হয়।

১. ষষ্ঠী পূজার আয়োজন

সকালে শাশুড়ি মা উপবাস থেকে দেবী ষষ্ঠীর পুজো করেন। ঘরের এক কোণে বা আঙিনায় মাটির ঘট বসিয়ে তাতে পিটুলি (চালের গুঁড়োর আলপনা) দিয়ে সাজানো হয়। একটা বড় কাঁঠাল পাতার ওপর বা বাঁশের ডালায় ১০৮টি দুর্বা ঘাস, ১০৮টি অক্ষত চাল, নানা রকমের ফল ও বাঁশের পাতা রাখা হয়।

২. 'ষষ্ঠীর সুতো' ও বাটা জোড়া

পুজো শেষে শাশুড়ি মা একটি বিশেষ লাল বা হলুদ রঙের কার বা সুতো (যাতে ১০৮টি গিট দেওয়া থাকে অথবা ষষ্ঠীর প্রসাদী হলুদ মাখানো থাকে) জামাই এবং কন্যার কব্জিতে বেঁধে দেন। এই সুতোকে বলা হয় 'ষষ্ঠীর সুতো'। এটি পরিধান করলে যাবতীয় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করা হয়।

৩. জামাই বরণ ও পাখা দিয়ে বাতাস

জামাই নতুন পোশাক (সাধারণত ধুতি-পাঞ্জাবি বা কুর্তা) পরে শাশুড়ি মায়ের সামনে আসন পেতে বসেন। এরপর শাশুড়ি মা যে সমস্ত আচার পালন করেন:

"ষাট ষাট ষাট, ষষ্ঠীর আশীর্বাদ,
মাথায় থাক ধান-দুর্বা, মুখে থাক মিষ্টি,
জামাইয়ের হোক কল্যাণ, ঘুচুক সব অনিষ্ট।"

ভোজনরসিক বাঙালির জামাইষষ্ঠীর রাজকীয় ভোজ

জামাইষষ্ঠীর আচারের পরেই আসে আসল আকর্ষণ—বাঙালির চিরাচরিত রাজকীয় ভোজের পর্ব। বাঙালি খাবার ও ভোজনবিলাসিতা জামাইষষ্ঠীতে চরম রূপ ধারণ করে। থালা সাজিয়ে যেভাবে জামাইকে পরিবেশন করা হয়, তা এক অপূর্ব শিল্পকলা।

কাঁসার থালায় পঞ্চব্যঞ্জন

ঐতিহ্যবাহী জামাইষষ্ঠীর মধ্যাহ্নভোজে স্টিল বা প্ল্যাস্টিকের বাসন ব্যবহার করা হয় না; বরং চকচকে পরিষ্কার কাঁসার থালা ও কাঁসার বাটি-গ্লাসে খাবার সাজানো হয়। থালার চারধারে সারিবদ্ধভাবে বাটি সাজিয়ে বাটি ভর্তি নানা পদ দেওয়া হয়।

মেনুতে কী কী থাকে?

১. সূচনা (শাক ও ভাজা): গোবিন্দভোগ চালের সুগন্ধি গরম ভাত, সঙ্গে ঘি, কাঁচালঙ্কা ও লেবু। এর সাথে থাকে শাক ভাজা এবং পাঁচ রকমের ভাজা (বেগুন ভাজা, পটল ভাজা, আলু ভাজা, ঝিঙে ভাজা ও কুমড়ো ভাজা)।

২. মাছের বৈচিত্র্য (ঘটি ও বাঙাল মেলবন্ধন): জামাইষষ্ঠীতে মাছের রাজা ইলিশ এবং মাছের রানী রুই/কাতলা থাকবেই।

৩. মাংসের পদ: খাঁটি পাঠার মাংসের কষা (খাসির মাংস) বা দেশি মুরগির রাজকীয় ঝোল।

৪. মধুমাসের ফলমূল: দুপুরের খাবারের আগে বা পরে পরিবেশন করা হয় প্রাক-বর্ষার আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম ও তরমুজ।

৫. শেষ পাত (মিষ্টি ও দই): আমসত্ত্ব-খেজুরের চাটনি, মচমচে পাপড়, মিষ্টি দই, এবং অবশ্যই রসগোল্লা, সন্দেশ, রাজভোগ, কিংবা ল্যাংচা। জামাইকে নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি অত্যন্ত সুমধুর।


ঘটি ও বাঙাল ঐতিহ্যের পার্থক্য

জামাইষষ্ঠীর পালনে পশ্চিমবঙ্গের 'ঘটি' (মূল অধিবাসী) এবং বাংলাদেশের 'বাঙাল' (পূর্ববঙ্গের মূল অধিবাসী) পরিবারের মধ্যে বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় পার্থক্য দেখা যায়:

এই ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, দুই সংস্কৃতিতেই জামাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, আদর ও ভালোবাসার মূল সুরটি একই রকম।


আধুনিক যুগে জামাইষষ্ঠী: পরিবর্তন ও অভিযোজন

কালের নিয়মে বাঙালির সমাজ ব্যবস্থা বদলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে তৈরি হয়েছে একান্নবর্তী থেকে অণু পরিবার। প্রত্যন্ত গ্রামের বাপের বাড়ি থেকে শহরের ফ্ল্যাট সংস্কৃতির বিস্তারে জামাইষষ্ঠীর উদযাপন রূপ রূপান্তর গ্রহণ করেছে।

১. ডিজিটাল যুগ ও ব্যস্ত জীবন

আজকের দিনে অনেক জামাই বা শাশুড়ি চাকরি সূত্রে ভিন্ন শহরে কিংবা বিদেশে বসবাস করেন। ফলে জ্যৈষ্ঠের ষষ্ঠীর দিনে সশরীরে উপস্থিত থাকা সবসময় সম্ভব হয় না। তবে প্রযুক্তির দৌলতে ভিডিও কলে শাশুড়ি জামাইকে আশীর্বাদ করছেন, অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে রেস্তোরাঁ থেকে শাশুড়ির বাড়িতে কিংবা জামাইয়ের ঠিকানায় পৌঁছে যাচ্ছে স্পেশাল থালি।

২. রেস্তোরাঁ ও হোটেলের জামাইষষ্ঠী স্পেশাল থালি

আজকাল অনেক ব্যস্ত শাশুড়ি মা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নাঘরে না কাটিয়ে জামাই ও মেয়েকে নিয়ে শহরের কোনো ঐতিহ্যবাহী বাঙালি রেস্তোরাঁ বা পাঁচতারা হোটেলে চলে যান। রেস্তোরাঁগুলোও জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে 'রাজকীয় জামাই থালি' বা 'মহারাভোজ' নামে বিশেষ মেনু তৈরি করে, যেখানে প্রাচীন সমস্ত বিলুপ্তপ্রায় পদ পরিবেশন করা হয়।

৩. গিফটিং কালচার বা উপহারের ধারা

আগে যেখানে শাশুড়ি মায়েরা জামাইকে তাঁতের ধুতি ও সুতির পাঞ্জাবি উপহার দিতেন, এখন তার জায়গায় এসেছে ব্র্যান্ডেড পোশাক, ঘড়ি, স্মার্টফোন বা গ্যাজেট। আবার জামাইরাও শাশুড়ি ও শ্বশুরের জন্য শাড়ি, উপহার এবং প্রণামী নিয়ে আসেন। উৎসবটি এখন আদান-প্রদানের এক দারুণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।


উপসংহার: ঐতিহ্যের আলোয় সম্পর্কের মেলবন্ধন

জামাইষষ্ঠী কেবল অতীতে আটকে থাকা কোনো প্রাচীন কুসংস্কার বা লোকাচার নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতির এমন এক রূপ যা পারিবারিক সম্পর্ককে নতুন করে সঞ্জীবিত করে। শাশুড়ি ও জামাইয়ের মধ্যে যে সামাজিক দূরত্ব বা দ্বিধা থাকে, এই উৎসবের আতিথেয়তা ও মধুর পরিবেশ তা নিমেষেই দূর করে দেয়।

আজকের দ্রুতধাবমান জীবনে, যেখানে মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে জামাইষষ্ঠীর মতো উৎসব পরিবারকে এক ছাদের তলায় এনে একাত্ম হওয়ার সুযোগ করে দেয়। প্রকৃতির উপহার মিষ্টি ফল, স্বাদু মাছ আর আন্তরিক আশীর্বাদে মোড়ানো এই দিনটি বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যের এক পরম উজ্জ্বল দলিল হয়ে বেঁচে থাকুক প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে।


সাধারণ প্রশ্ন

জামাইষষ্ঠী সাধারণত কোন বাংলা মাসে পালিত হয় এবং পঞ্জিকার গুরুত্ব কী?

জামাইষষ্ঠী প্রতি বছর বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয়। পঞ্জিকা অনুসারে এই তিথিটি অত্যন্ত শুভ। তিথির সঠিক শুরু ও শেষ সময় মেনে শাশুড়িরা ব্রত পালন করেন এবং শুভ মুহূর্তে জামাইকে বরণ করেন। পঞ্জিকায় এই দিনটিকে 'অরণ্য ষষ্ঠী'-ও বলা হয়ে থাকে।

জামাইষষ্ঠীর পুজোয় পাখা দিয়ে বাতাস করা এবং সুতো বাঁধার কারণ কী?

জামাইষষ্ঠীতে নতুন সাজানো তালপাখা দিয়ে জামাইকে বাতাস করা হয় শাশুড়ি মায়ের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে, যাতে জামাইয়ের জীবনের যাবতীয় তাপ ও ক্লান্তি দূর হয়ে শান্তিময় হয়। আর হাতে বাঁধা 'ষষ্ঠীর সুতো' (১০৮ গিটযুক্ত বা হলুদ মাখানো সুতো) দেবী ষষ্ঠীর আশীর্বাদের প্রতীক, যা জামাই ও কন্যার দীর্ঘায়ু এবং অপায়-অমঙ্গল থেকে রক্ষা সুনিশ্চিত করে।

জামাইষষ্ঠী উৎসবের প্রধান পৌরাণিক কাহিনিটি কী?

জামাইষষ্ঠীর প্রধান পৌরাণিক গল্পটি দেবী ষষ্ঠী ও তাঁর বাহন কালো বিড়ালকে ঘিরে। এক লোভী গৃহবধূ ঘরের খাবার খেয়ে বিড়ালের ওপর দোষ চাপাত। বিড়ালের অভিযোগে রুষ্ট হয়ে দেবী ষষ্ঠী ওই গৃহবধূর সন্তানদের অদৃশ্য করে দেন। পরে বধূটি বনে গিয়ে ভুল স্বীকার করে দেবী ষষ্ঠীর ব্রত পালন করলে দেবী সন্তুষ্ট হয়ে সন্তান ফিরিয়ে দেন। এই সন্তান রক্ষা ও পরিবারের মঙ্গলের ব্রতই কালক্রমে জামাই বরণের সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়।

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে জামাইষষ্ঠী উদযাপনে কী কী পরিবর্তন এসেছে?

আধুনিক জীবনে সময় ও দূরত্বের কারণে অনেকেই বাড়িতে বিশাল ভোজের আয়োজন করতে পারেন না। ফলে অনেক পরিবার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় গিয়ে 'জামাইষষ্ঠী থালি' উপভোগ করেন। এছাড়াও ভিডিও কলের মাধ্যমে আশীর্বাদ করা, ডিজিটাল উপহার পাঠানো এবং ধুতি-পাঞ্জাবির পাশাপাশি আধুনিক ব্র্যান্ডেড পোশাক উপহার দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার