💡 অজানা তথ্য · ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার
বাঙালির শেষপাতের আনন্দ রসগোল্লা ও সন্দেশ কেবল মিষ্টি নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও পর্তুগিজ পরশের এক অনন্য ইতিহাস। কীভাবে ছানার জাদুতে বিশ্বজয় করল বাংলার মিষ্টি, জানুন বিস্তারিত গল্প।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ভোজনরসিকতার কথা উঠলেই যে দুটি বস্তুর নাম সবার আগে মুখে আসে, তা হলো রসগোল্লা এবং সন্দেশ। বাঙালির জীবনচক্রে—পয়লা বৈশাখের নতুন হালখাতা থেকে শুরু করে জামাইষষ্ঠীর ভোজ, বিজয়া দশমীর কোলাকুলি কিংবা শুভ বিবাহের তত্ত্ব—মিষ্টি ছাড়া কোনো আনন্দ অনুষ্ঠানই সম্পূর্ণ হয় না। শুভ পঞ্জিকা দেখে যেকোনো মাঙ্গলিক কাজের সূচনাতেই একটু মিষ্টিমুখ করানো বাঙালির বহু প্রাচীন নিয়ম।
কিন্তু আমরা আজ যে ছানার তৈরি তুলতুলে রসগোল্লা কিংবা জিভে জল আনা সন্দেশ উপভোগ করি, তার ইতিহাস কিন্তু সবসময় এমন ছিল না। একসময় সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যে দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করাকে চরম অশুভ ও অপবিত্র মনে করা হতো। সেখান থেকে কীভাবে ছানা বাঙালি ময়রাদের হাত ধরে বিশ্বখ্যাত মিষ্টান্ন শিল্পে রূপান্তরিত হলো? রসগোল্লা ও সন্দেশের পেছনের সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস, বিবর্তন এবং মজার সব অজানা কাহিনি নিয়েই এই নিবন্ধ।
বাংলার মিষ্টির আসল বিপ্লব ঘটেছিল 'ছানা' (Cottage Cheese) আবিষ্কারের মাধ্যমে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা যখন হুগলির ব্যান্ডেল ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে তোলে, তখন তারা সাথে করে নিয়ে এসেছিল দুগ্ধজাত দ্রব্য তৈরির কৌশল। পর্তুগিজরা দুধে অম্ল (ছাঁচ বা সাইট্রিক অ্যাসিড) মিশিয়ে দুধ কাটিয়ে পনির বা ছানা তৈরি করত।
এর আগে পর্যন্ত বাংলায় মিষ্টি বলতে ছিল ক্ষীর, চাঁছি, গুড়, তিল বা নারকেলের নাড়ু, মুড়কি, খাজা, গজা এবং ময়দা বা চালের গুঁড়োর তৈরি নানাবিধ পিঠেপুলি। বৈদিক ও হিন্দু ধর্মীয় বিধিতে দুধ ফেটে গেলে বা কেটে গেলে তা 'নষ্ট' বলে গণ্য হতো এবং দেবদেবীর পূজায় সেই ফেটে যাওয়া দুধ বা তার উপাদান দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল।
তবে ব্যান্ডেলের পর্তুগিজদের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে হুগলি ও শান্তিপুরের ময়রারা গোপনে দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তারা দেখলেন, ছানাকে সঠিক কৌশলে মাখলে তা অত্যন্ত সুস্বাদু ও তুলতুলে মিষ্টান্ন তৈরির উপযোগী উপাদান হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বৈদিক নিষেধের প্রাচীর ভেঙে বাংলায় শুভ্র, কোমল ছানার যুগে পদার্পণ ঘটে।
"পর্তুগিজরা যদি বাংলায় না আসত এবং দুধ কাটার বিদ্যা না শেখাত, তবে আজকের বাংলার বিখ্যাত ছানার মিষ্টির অস্তিত্বই থাকত না।"
'সন্দেশ' শব্দটির ব্যাকরণগত ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো 'বার্তা' বা 'সংবাদ'। প্রাচীনকালে কোনো শুভ সংবাদ বা ভালো খবর নিয়ে স্বজনদের বাড়িতে যাওয়ার সময় উপহার হিসেবে একধরনের মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হতো। সেই বার্তা বহনকারী মিষ্টিই কালের নিয়মে 'সন্দেশ' নামে পরিচিত হয়।
কিন্তু মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে—যেমন রামায়ণ অনুবাদক কৃত্তিবাস ওঝার লেখা বা 'চৈতন্যচরিতামৃত'-এ যে সন্দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা কিন্তু আজকের ছানার সন্দেশ ছিল না। সেই সন্দেশ তৈরি হতো মূলত শক্ত ক্ষীর, গুড় ও গমের আটা বা ময়দা দিয়ে।
আজকের যে ছানার সন্দেশ আমরা খাই, তার জন্ম ১৯ শতকের প্রথমার্ধে। হুগলির গুপ্তিপাড়া, শান্তিপুর এবং পরবর্তীতে কলকাতার ময়রারা প্রথম ছানাকে চিনির পাক দিয়ে ছাঁচে ফেলে আধুনিক সন্দেশের সূচনা করেন।
কলকাতা যখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হয়ে উঠল, তখন মিষ্টির বাজারেও এক নবজাগরণ ঘটল। ময়রারা নিজেদের সেরা প্রতিভা ফুটিয়ে তুলতে শুরু করলেন। সন্দেশের জগতে কয়েকজন অমর কারিগরের অবদান চিরস্মরণীয়:
সন্দেশের নামকরণের পেছনে রয়েছে চমৎকার সব ঐতিহাসিক গল্প:
১. জলভরা সন্দেশ (Jalbhara Sandesh): ১৮৪৩ সালে চন্দননগরের সূর্যকুমার মোদক প্রথম এই সন্দেশ আবিষ্কার করেন। গল্পটি বেশ চমকপ্রদ। তালপুকুরের এক জমিদার গিন্নি তাঁর জামাইকে বোকা বানানোর জন্য ময়রা সূর্য মোদককে এমন এক মিষ্টি বানাতে বলেন যা কামড় দিলেই জামাইয়ের গায়ে রস ছিটকে পড়বে। সূর্য মোদক ছানার তাল কেটে তার ভেতর গোলাপজল ও নলেন গুড়ের পাতলা রস পুরে উপরে সন্দেশের প্রলেপ দিয়ে তৈরি করলেন জলভরা সন্দেশ। জামাই কামড় দিতেই রসের ছিটকায় হাসির রোল উঠল পুরো রাজবাড়িতে! জন্ম হলো এক অমর মিষ্টির।
২. 'আবার খাবো' সন্দেশ: কাশিমবাজারের মহারানী স্বর্ণময়ী একবার নবদ্বীপের বিখ্যাত ময়রাকে নতুন ধরনের মিষ্টি বানাতে বলেন। ময়রা ছানা, পেস্তা ও ক্ষীরের এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে নরম এক সন্দেশ তৈরি করে মহারানীকে পরিবেশন করেন। সন্দেশটি খেয়ে তৃপ্ত মহারানী বলে ওঠেন, "বাঃ! আবার খাবো!" সেই থেকেই মিষ্টিটির নাম হয়ে যায় 'আবার খাবো সন্দেশ'।
৩. নলেন গুড়ের সন্দেশ: শীতকালের আগমন মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে নলেন গুড়ের আমেজ। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে খেজুরি গুড় সংগ্রহের পর সেই নতুন টাটকা গুড় (যাকে নলেন বা নতুন গুড় বলা হয়) দিয়ে তৈরি সন্দেশ আজও বাঙালির শীতকালীন পৌষ পার্বণ ও নবান্ন উৎসবের প্রধান আকর্ষণ।
রসগোল্লার উৎপত্তিস্থল নিয়ে বাংলা ও ওড়িশার মধ্যে দীর্ঘ বছরের বিতর্ক রয়েছে। ওড়িশার দাবি, পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার সমাপনী আচার 'নীলাদ্রি বিজে'-তে ভগবান জগন্নাথ দেবী লক্ষ্মীকে সন্তুষ্ট করতে যে মিষ্টি পরিবেশন করেন, তা-ই ছিল রসগোল্লার আদি রূপ বা 'ক্ষীরমোহন'।
তবে ঐতিহাসিক ও খাদ্যরসিকদের মতে, পুরীর ঐতিহ্যবাহী রসগোল্লা ছিল লালচে, শক্ত এবং ক্ষীর বা ছানার সাথে সুজি-ময়দা মিশিয়ে তৈরি করা। কিন্তু আমরা আজ যে সাদা, স্পঞ্জি, রসে টইটম্বুর রসগোল্লা চিনি—তার জন্ম সম্পূর্ণ আলাদাভাবে কলকাতায় ঘটেছিল।
কলকাতার বাগবাজারের বাসিন্দা নবীন চন্দ্র দাস (Nabin Chandra Das)-কে বলা হয় 'রসগোল্লার কলম্বাস'। ১৮৬৮ সালে তিনি এমন এক রসগোল্লা আবিষ্কার করেন, যা মিষ্টান্ন জগতের পুরো ইতিহাস বদলে দেয়।
নবীন দাস খাঁটি ছানাকে সুজি বা ময়দা ছাড়া হাত দিয়ে দীর্ঘক্ষণ মথে এক বিশেষ টেক্সচারে নিয়ে আসেন। কিন্তু গোল ছানার বলগুলোকে ফুটন্ত চিনির সিরায় দিলে সেগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত। বহু প্রচেষ্টার পর তিনি রীঠা ফলের জল চিনির সিরায় ব্যবহার করার কৌশল আবিষ্কার করেন, যা সিরায় ফেনা তৈরি করে এবং ছানার গোলকগুলোকে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করে সেগুলোকে তুলতুলে ও স্পঞ্জি রূপ দেয়।
"রসগোল্লা কেবল একটি মিষ্টি নয়, এটি বাঙালির বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ও রন্ধনশিল্পের মেলবন্ধনের এক পরম ফসল।"
নবীন চন্দ্র দাসের এই উদ্ভাবন নিমেষের মধ্যে কলকাতাবাসীকে মুগ্ধ করে। তৎকালীন ধনী ব্যবসায়ী ভগবানদাস বাগলা একবার বাগবাজারের পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর তৃষ্ণার্ত সন্তানকে নবীন দাসের দোকান থেকে জল খেতে দেন। সাথে নবীন দাস তাঁর নতুন মিষ্টি রসগোল্লা খেতে দেন। শিশুটি মিষ্টি খেয়ে এতটাই আনন্দিত হয় যে ভগবানদাস বাগলা বিপুল পরিমাণ রসগোল্লা কিনে নেন এবং তাঁর মাধ্যমেই কলকাতায় রসগোল্লার খ্যাতি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
নবীন চন্দ্র দাসের পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র দাস (কে.সি. দাস) বাবাকে অনুসরণ করে মিষ্টি ব্যবসায় আসেন এবং একজন উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত হন। ১৯৩০-এর দশকে কৃষ্ণচন্দ্র দাস ও তাঁর ছেলে সারদা চরণ দাস রসগোল্লাকে ভারতের বাইরে পাঠানোর চিন্তাভাবনা শুরু করেন।
তারা আবিষ্কার করেন 'ক্যানিং' (Canning) পদ্ধতি। ভ্যাকুয়াম প্যাক করা টিনের কৌটায় রসগোল্লা সংরক্ষণ করে বিশ্বজুড়ে রপ্তানি শুরু হয়। এর ফলেই রসগোল্লা সুদূর আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে যায় এবং বাংলা মিষ্টির বিশ্বায়ন ঘটে। এছাড়া রসমালাই মিষ্টির উদ্ভাবক হিসেবেও কে.সি. দাসের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
২০১৫ সাল থেকে রসগোল্লার ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (Geographical Indication) ট্যাগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার মধ্যে আইনি লড়াই শুরু হয়। অবশেষে ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গকে 'বাংলার রসগোল্লা' (Banglar Rosogolla) হিসেবে জিআই ট্যাগ প্রদান করে। আদালত ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয় যে, স্পঞ্জ রসগোল্লার নির্দিষ্ট রেসিপি ও শৈলী পশ্চিমবঙ্গেই জন্ম লাভ করেছে। এই স্মারক জয়কে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে 'রসগোল্লা দিবস' পালিত হয়।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণে রসগোল্লা ও সন্দেশের ভূমিকা অপরিহার্য। জ্যোতিষশাস্ত্র বা পঞ্জিকা মতে যেকোনো শুভ তিথি বা মাঙ্গলিক লগ্নে মিষ্টি মুখ করানো বাঙালির আবহমানকালের ঐতিহ্য।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমী কেক, পেস্ট্রি বা চকলেট বাজারে আসলেও, বাঙালির হৃদয়ে রসগোল্লা ও সন্দেশের স্থান অপূরণীয়। পর্তুগিজদের ছানার পরশ, হুগলি-শান্তিপুরের ময়রাদের সৃজনশীলতা এবং কলকাতার নবীন চন্দ্র দাস কিংবা ভীম নাগের মতো মিষ্টান্ন কারিগরদের নিরলস সাধনায় বাংলার মিষ্টি আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেছে।
রসগোল্লা ও সন্দেশ কেবল রসনার তৃপ্তি ঘটায় না, এরা বহন করে চলেছে বাংলার দুই শতকের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মহাকাব্যিক গল্প। তাই শেষপাতে একটি রসগোল্লা বা এক টুকরো সন্দেশ মুখে দেওয়ার সময় আমরা আসলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসেরই স্বাদ আস্বাদন করি।
উত্তর: আধুনিক স্পঞ্জ রসগোল্লা ১৮৬৮ সালে কলকাতার বাগবাজারের বিখ্যাত মিষ্টান্ন কারিগর নবীন চন্দ্র দাস প্রথম আবিষ্কার করেন। ছানাকে ফুটন্ত চিনির সিরায় ধরে রাখার কৌশল আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি এই তুলতুলে রসগোল্লা তৈরি করেন।
উত্তর: প্রাচীনকালে দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করাকে অশুভ মনে করা হতো। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজরা বাংলায় এসে দুধ কাটিয়ে পনির তৈরির কৌশল শেখায়। পরবর্তীতে ১৯ শতকের শুরুতে হুগলি ও শান্তিপুরের ময়রারা সেই ছানাকে চিনির সাথে পাক দিয়ে আধুনিক সন্দেশ তৈরি শুরু করেন।
উত্তর: দীর্ঘ আইনি ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ভারত সরকার ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গকে 'বাংলার রসগোল্লা' (Banglar Rosogolla) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই (GI) ট্যাগ প্রদান করে।
উত্তর: ১৮৪৩ সালে চন্দননগরের বিখ্যাত মিষ্টি প্রস্তুতকারক সূর্যকুমার মোদক প্রথম 'জলভরা সন্দেশ' তৈরি করেন। জামাইকে মজা করে বোকা বানানোর জন্য জমিদার গিন্নির বিশেষ অনুরোধে তিনি সন্দেশের ভেতরে গুড় বা গোলাপজলের রস পুরে এটি উদ্ভাবন করেছিলেন।