← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

গাজন উৎসব: চৈত্র সংক্রান্তির লোকঐতিহ্য, দেবাদিদেবের আরাধনা ও বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির মহাকাব্য

🎉 উৎসব  ·  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার

গাজন উৎসব বাংলার এক প্রাচীন লোকপর্ব। চৈত্র সংক্রান্তিতে কীভাবে দেবাদিদেব শিব ও ধর্মঠাকুরের এই আরাধনা গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও বর্ণহীন সাম্যবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল—জানুন তার সম্পূর্ণ ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনি ও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের সম্পূর্ণ গল্প।

সূচনা: চৈত্র সন্ধ্যার ঢাকের বাদ্যি ও গ্রামীণ বাংলার লোকমহাকাব্য

চৈত্র মাসের শেষ দিনগুলোতে বাংলার গ্রামবাংলাজুড়ে যখন তপ্ত রোদ নেমে আসে, মাঠের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়, ঠিক তখনই গোধূলির বাতাসে ভেসে আসে ঢাকের গমগমে আওয়াজ। কাঁসর-ঘণ্টা, পট বাদ্যের শব্দে কেঁপে ওঠে মাঠ-ঘাট-পাড়া। লাল কষা কাপড় পরা, গলায় উত্তরীয় এবং কপালে রক্তচন্দনের তিলক আঁকা একদল মানুষ 'বোম বোম ভোলানাথ' কিংবা 'জয় শিবের জয়' ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে আকাশ-বাতাস। এটিই বাংলার লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে আদিম, সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের উৎসব—'গাজন'।

গাজন কেবল একটি ধর্মীয় আচার বা পূজা নয়, এটি সামাজিক বৈষম্য ভুলে সাধারণ মানুষের এক মহামিলন ক্ষেত্র। অভিজাত বা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে বাংলার খেটে খাওয়া কৃষক, কারিগর এবং শোষিত প্রান্তিক মানুষ কীভাবে নিজের ইষ্টদেবতাকে আপন করে নিয়েছিল, গাজন তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ। চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী পূর্ণিমায় বাংলা পঞ্জিকার পাতায় যখন এক বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আবাহন লেখা হয়, তখন গাজনের মহিমান্বিত নাটকে মেতে ওঠে পুরো বাংলা।

‘গাজন’ শব্দের বুৎপত্তি ও লোকবিশ্বাসের গভীর শিকড়

'গাজন' শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ভাষাবিদ ও লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মধ্যে নানা মনোগ্রাহী মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। অধিকাংশ ভাষাবিদের মতে, 'গাজন' শব্দটি এসেছে 'গর্জন' শব্দ থেকে। উৎসবের দিনগুলোতে দেবাদিদেব শিবের ভক্তরা (যাঁদের স্থানীয় ভাষায় 'ভক্ত্যা' বা 'বাপ্তা' বলা হয়) পরম ভক্তি ও আবেগে যে হুঙ্কার বা নাম-গর্জন করেন, তা থেকেই এই উৎসবের নাম হয়েছে 'গাজন'।

অন্য একটি জনপ্রিয় ও অর্থবহ মতামত অনুযায়ী, 'গাজন' শব্দটি দুটি শব্দের সংমিশ্রণে গঠিত—'গাঁ' (অর্থাৎ গ্রাম) এবং 'জন' (অর্থাৎ সাধারণ মানুষ)। গ্রামজনের সমন্বয়ে যে লোকউৎসব গড়ে ওঠে, তা-ই হলো গাজন। অর্থাৎ, এটি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের নিজস্ব পার্বণ।

লোকসংস্কৃতিবিদদের মতে, গাজন মূলত একটি উর্বরতা বিষয়ক আচার (Fertility Ritual)। চৈত্র মাসের শেষে নতুন ফসল ওঠার পর এবং বৈশাখের তীব্র দাবদাহে নতুন চাষবাস শুরু করার আগে মেঘ, বৃষ্টি ও উর্বরতার দেবতাকে সন্তুষ্ট করাই ছিল এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। শিবের গাজনের পাশাপাশি রাঢ় বাংলায় প্রচলিত রয়েছে 'ধর্মের গাজন', যেখানে সুপ্রাচীন সূর্যদেবতা বা লোকদেবতা ধর্মঠাকুরের আরাধনা করা হয়।

গাজন উৎসবের ঐতিহাসিক পটভূমি: বৌদ্ধ তত্ত্ব, শৈবধর্ম ও প্রান্তিক মানুষের মেলবন্ধন

গাজন উৎসবের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে হাজার বছর আগের বাংলায়। পাল ও সেন যুগের সীমানা ছাড়িয়ে এর শিকড় বিস্তৃত রয়েছে বাংলার প্রাক-আর্য ও আদিবাসী সমাজে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় যখন বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটেছিল, তখন মহাযান ও বজ্রযানের নানা তান্ত্রিক আচার সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বাংলায় হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান এবং শৈবধর্মের ব্যাপক বিস্তারের সময় বৌদ্ধ তান্ত্রিক আচার ও প্রথাগুলো শিবের আরাধনার সাথে মিশে যায়। ধর্মঠাকুরের গাজন বা 'আদ্যা গাজন'-এর মধ্যে এই বৌদ্ধ প্রভাবে স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়। শূন্যপুরাণ বা ধর্মমঙ্গল কাব্যে গাজনের যে বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা বাংলার এই ধর্মীয় বিবর্তনেরই জলজ্যান্ত দলিল।

গাজন উৎসবের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—এটি কোনো একক উচ্চবর্ণের পুরোহিতের নির্দেশে পরিচালিত হয় না। এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করেন মূল ভক্ত্যা এবং সাধারণ সাধারণ মানুষ। বাংলায় যখন সামাজিক শ্রেণিভেদ ও জাতপাতের কঠোর নিয়ম ছিল, তখনও গাজন উৎসব সমাজে সাম্যের বার্তা নিয়ে আসত। গাজনের কটা দিন সমস্ত ভক্ত্যা সমস্ত সামাজিক পরিচিতি ভুলে গিয়ে একই ধর্মে দীক্ষিত হতেন।

শিবের গাজন, ধর্মের গাজন ও আদ্যা গাজন: বিচিত্র দেব-আরাধনার ধারা

বাংলায় প্রধানত তিন ধরনের গাজন দেখতে পাওয়া যায়, যেগুলোর মধ্যে আচার-অনুষ্ঠানে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও মূল ভাবধারা এক।

গাজনের সন্ন্যাসী বা ‘ভক্ত্যা’: সামাজিক বৈষম্য ভুলের এক অলৌকিক সাম্যবাদ

গাজন উৎসবের প্রাণকেন্দ্র হলেন 'ভক্ত্যা' বা সন্ন্যাসীরা। যেকোনো সাধারণ মানুষ—তিনি পেশায় কৃষক, দিনমজুর, উত্তর বা দক্ষিণবঙ্গের যেকোনো সাধারণ নাগরিক হতে পারেন—গাজনের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য উত্তরীয় ধারণ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।

সন্ন্যাস গ্রহণের পর সমস্ত সন্ন্যাসীর জাতপাত বা সামাজিক অবস্থান মুছে যায়। একজন তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষ এবং একজন নিম্নবর্ণের মানুষ একই গামছা পিন্ধে, একই সাথে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন এবং একে অপরকে 'উত্তরীয় ভাই' বা 'সন্ন্যাসী ভাই' বলে সম্বোধন করেন। সন্ন্যাস গ্রহণকাল পর্যন্ত তাঁদের গলায় পৈতাসদৃশ উত্তরীয় থাকে। এটি প্রমাণ করে যে, লোকউৎসবের মঞ্চে বাংলা কীভাবে শত শত বছর আগে জাতপাতের ভেদাভেদকে তুচ্ছ করতে পেরেছিল।

সন্ন্যাসীরা এই কয়দিন নিরামিষ বা হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন, খালি পায়ে হাঁটেন, মেঝেতে শোেন এবং কঠোর কায়িক ও মানসিক নিয়মকানুন মেনে চলেন। তাঁদের বিশ্বাস, দেহের এই কষ্ট ও কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে নিজের ভুলত্রুটির প্রাশ্চিত্ত হয় এবং ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা যায়।

গাজনের ধারাবাহিক রীতিনীতি ও কঠোর সাধনার পর্যায়

গাজন উৎসব একদিনের উৎসব নয়। চৈত্র সংক্রান্তির প্রায় সপ্তাহখানেক আগে থেকেই অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠার সাথে গাজনের আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। পঞ্জিকার নির্দিষ্ট তিথি ও শুভ মুহূর্ত মেনে গাজনের প্রতিটি ধাপ পালিত হয়।

সঙ্কল্প ও ব্রত গ্রহণ

গাজনের সূচনা হয় সন্ন্যাস গ্রহণ বা নিয়ম-সেবার মাধ্যমে। স্থানীয় শিবালয় বা গাজনের তলায় গিয়ে সন্ন্যাসীরা মূল সন্ন্যাসীর কাছ থেকে উত্তরীয় ধারণ করেন। একে বলা হয় 'নিয়ম পরা' বা 'ব্রত গ্রহণ'। এর পর থেকে শুরু হয় সন্ন্যাসীদের নিরামিষ আহার ও কঠোর ব্রত পালন।

হবিষ্যান্ন ও কৃচ্ছ্রসাধন

সন্ন্যাসীরা দিনে মাত্র একবার হবিষ্যান্ন বা ফলমূল গ্রহণ করেন। গাজনের প্রতিটি দিন সকালে ও সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট কিছু গান ও ছড়া কেটে নাচতে হয়। এই গানগুলোকে বলা হয় 'গাজনের গান' বা 'শিবের গাজন'। এই গানগুলোতে যেমন দেবাদিদেবের লীলা রূপ ফুটে ওঠে, তেমনি থাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের কথা।

পাট পূজা ও নীল পূজা

গাজনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো 'পাট পূজা'। কাষ্ঠনির্মিত এক বিশেষ পাট বা তক্তাকে শিবের প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। একে 'রাজপাট' বা 'শিবের পাট' বলা হয়। সন্ন্যাসীরা এই পাট কাঁধে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন এবং গৃহস্থদের বাড়ি থেকে চাল, ডাল, ফল ও অর্থ সংগ্রহ করেন।

চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পালিত হয় 'নীল পূজা' বা 'নীল ষষ্ঠী'। এই দিন বাংলার ঘরে ঘরে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় সারাদিন উপবাস রাখেন। সন্ধ্যায় শিবের মাথায় জল ও নীলকণ্ঠ ফুল ঢেলে, প্রদীপ জ্বালিয়ে ব্রত ভঙ্গ করেন। এই রাতে গাজনের সন্ন্যাসীরা 'নীলের বিয়ে' বা 'হর-পার্বতীর বিবাহ' উপলক্ষে বিশেষ আনন্দ-উৎসব ও গান পরিবেশন করেন।

কাঁটা ঝাঁপ, আগুন ঝাঁপ ও বাণ ফোঁড়া

গাজনের মূল আকর্ষণ ও রোমাঞ্চকর দিক হলো সন্ন্যাসীদের অতিমানবীয় কৃচ্ছ্রসাধন। ভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে ভক্ত্যারা নানা ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ আচার পালন করেন:

শ্মশান নৃত্য ও মাশান খেলা

উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং বীরভূমের কিছু অঞ্চলে গাজনের অন্যতম রহস্যময় রীতিনীতি হলো 'শ্মশান নৃত্য' বা 'মাশান খেলা'। চৈত্র সংক্রান্তির আগের গভীর রাতে সন্ন্যাসীরা শ্মশানে যান। অতীতে সেখানে আসল নরকঙ্কাল বা মানুষের কাটা মুণ্ডু নিয়ে নাচার রীতি ছিল। বর্তমানে আইনের কড়াকড়িতে মাটির তৈরি কঙ্কাল বা প্রতীকি মুণ্ডু ব্যবহার করে এই ভয়ঙ্কর অথচ অদ্ভুত লোকনৃত্য পরিবেশন করা হয়। এটি শিবের 'ভৈরব' বা 'শ্মশানবাসী' রূপের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন।

রাঢ় বাংলার গাজন: বাঁকুড়া, বীরভূম ও বর্ধমানের নিজস্ব রূপরেখা

বাংলার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের সাথে সাথে গাজনের রূপও বদলে যায়। তবে রাঢ় বাংলাই হলো গাজনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ কেন্দ্রভূমি।

তারকেশ্বরের গাজন: ভক্তির মহাসমুদ্র ও শ্রাবণ-চৈত্রের মেলবন্ধন

হুগলী জেলার বিখ্যাত তারকেশ্বর ধামে গাজন উৎসব লাভ করে এক অন্য মাত্রা। চৈত্র মাস জুড়েই তারকেশ্বরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটে। শ্যাওড়াফুলি গঙ্গার ঘাট থেকে পবিত্র জল তুলে পদব্রজে মাইলের পর মাইল হেঁটে তারকেশ্বরে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে আসেন সন্ন্যাসীরা।

তারকেশ্বরের গাজনে শিবের গাজনের জাঁকজমক সারা দেশের নজর কাড়ে। শেষ দিনে তারকেশ্বর মন্দিরের সামনে ভক্ত্যাদের কাঁটা ঝাঁপ ও বাণ ফোঁড়ার দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমান। পঞ্জিকার গণনা অনুযায়ী যখন চৈত্র সংক্রান্তির শুভ লগ্ন উপস্থিত হয়, তখন পুরো মন্দির চত্বর 'জয় বাবা তারকনাথ' ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে।

গাজনের গান, সং ও লোকসংস্কৃতির বৈচিত্র্য

গাজন কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার লোকশিল্প ও নাট্যধারার এক বিশাল উৎস। গাজনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ঐতিহ্যবাহী পরিবেশন শিল্প।

গাজনের গান ও বোলান

গাজনের সময় সন্ন্যাসী ও গ্রামের শিল্পীরা যে গান পরিবেশন করেন, তার সুর অত্যন্ত মৌলিক ও টানটান। এই গানে শিবকে কোনো দূরবর্তী ঈশ্বর হিসেবে দেখানো হয় না; বরং শিবকে দেখানো হয় এক সাধারণ কৃষকের রূপে—যিনি চাষবাস করেন, যার সাথে দেবী পার্বতীর নিত্য সংসারিক ঝগড়া হয়, যিনি তামাক খান এবং গাঁজা সেবন করেন। ঈশ্বরের এই 'মানবায়ন' (Humanization) কেবল বাংলা লোকসাহিত্যেই সম্ভব হয়েছে।

গাজনের সং (Gajan Farce)

কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চলে, বিশেষ করে পুরোনো কলকাতায় চৈত্র সংক্রান্তির দিনে 'গাজনের সং' বের করার এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। জেলিয়াপাড়া, ধ জেলেপাড়ার সং তৎকালীন সমাজ, ব্রিটিশ শাসন এবং ধনকুবেরদের ভণ্ডামী নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ছড়া কাটত। আজও মেদিনীপুর, হাওড়া ও ২৪ পরগনায় গাজনের দিন নানা পৌরাণিক ও সামাজিক রূপ সেজে সং বের করার রীতি জীবন্ত রয়েছে।

কৃষি সমাজ ও প্রকৃতির উর্বরতা বৃদ্ধির প্রতীক গাজন

লোকবিজ্ঞানীদের মতে, গাজনের মূল দর্শনের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে কৃষি ও প্রকৃতির চক্র। চৈত্র মাস মানেই বছরের শেষ, শুষ্কতা ও জীর্ণতার প্রতীক। আর বৈশাখ মানেই নতুন সৃষ্টি, নতুন ফসল ও বৃষ্টি।

গাজনের সময় মাটি, জল ও আগুনের সাথে সন্ন্যাসীদের যে নিবিড় শারীরিক সম্পর্ক ঘটে, তা মূলত বসুন্ধরা বা মা মাটিকে উর্বর করার এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। শিব এখানে 'জল ও মেধা'র প্রতীক এবং দুর্গা বা আদ্যাশক্তি হলেন 'ধরিত্রী'। শিব ও শক্তির এই মিলনের মাধ্যমেই যেন শুষ্ক মাটিতে নতুন শস্যের বীজ রোপণের উপযোগী বৃষ্টি নেমে আসে। তাই গাজনের শেষে যখন কালবৈশাখীর মেঘ আকাশে ঘনিয়ে আসে, গ্রামবাংলা বিশ্বাস করে—শিবের গাজন সফল হয়েছে, দেবাদিদেব তুষ্ট হয়েছেন।

আধুনিকতার আলোয় প্রাচীন গাজন: ঐতিহ্য রক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

একবিংশ শতকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়েও গাজন উৎসব তার নিজস্ব আকর্ষণ ও আবেদন হারায়নি। গ্রামীণ জীবনের যান্ত্রিকীকরণ সত্ত্বেও বাঁকুড়া, বীরভূম, হুগলী কিংবা বাংলাদেশের খুলনা, যশোর ও ফরিদপুরের নানা প্রান্তে চৈত্র সংক্রান্তির গাজন আজও পূর্ণ মর্যাদায় পালিত হয়।

তবে আধুনিক সময়ের সাথে সাথে কিছু পরিবর্তনও এসেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং মানবাধিকারের দিক বিবেচনা করে অনেক জায়গায় বাণ ফোঁড়া বা অত্যাধিক কষ্টদায়ক দৈহিক আচারের তীব্রতা কমানো হয়েছে। কঙ্কালের বদলে কৃত্রিম উপাদানের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু গাজনের অন্তর্নিহিত সাম্যবাদ, ভক্তি এবং আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কোনো ভাটা পড়েনি।

আজকের বিশ্বায়নের যুগেও যখন মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়ছে, তখন গাজনের মতো লোকউৎসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ভক্তি, ত্যাগ এবং সাম্যের চেয়ে বড় কোনো সংস্কৃতি হতে পারে না। চৈত্র সংক্রান্তির গোধূলিতে গাজনের সন্ন্যাসীর কণ্ঠে যখন বাজে 'শিবের মহিমা', তখন তা কেবল এক পুরানো ধর্মীয় আচার থাকে না, হয়ে ওঠে হাজার বছরের বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের এক জীবন্ত রূপকথা।

সাধারণ প্রশ্ন

গাজন উৎসব প্রধানত কোন দেবতাকে কেন্দ্র করে পালিত হয়?

গাজন উৎসব প্রধানত দেবাদিদেব মহাদেব বা শিবকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। তবে রাঢ় বাংলায় চৈত্র ও বৈশাখ মাসে লোকদেবতা ধর্মঠাকুরের উদ্দেশ্যেও 'ধর্মের গাজন' এবং দেবী আদ্যাশক্তির উদ্দেশ্যে 'আদ্যা গাজন' আয়োজন করা হয়।

গাজন এবং চড়ক পূজার মধ্যে পার্থক্য কী?

গাজন হলো চৈত্র মাসের শেষ ৭ থেকে ১০ দিন ধরে চলা সমগ্র লোকউৎসব, যার মধ্যে সন্ন্যাস গ্রহণ, নীল পূজা, নিরামিষ ব্রত ও নানা কৃচ্ছ্রসাধন অন্তর্ভুক্ত। আর চড়ক পূজা হলো চৈত্র সংক্রান্তির শেষ দিনে গাজন উৎসবের চূড়ান্ত সমাপ্তি পর্ব, যেখানে চড়ক গাছে সন্ন্যাসীদের ঘুরিয়ে বিশেষ আরাধনা করা হয়।

গাজনের সন্ন্যাসী বা ‘ভক্ত্যা’ কারা হতে পারেন?

যেকোনো সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় বা সামাজিক শ্রেণিভেদ ভুলে গাজনের কয়েক দিনের জন্য সন্ন্যাস গ্রহণ করতে পারেন। এতে জাতপাত বা বর্ণপ্রথার কোনো বাধা নেই। ব্রত পালনকালে সকল সন্ন্যাসীকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয় এবং তাঁরা একত্রিত হয়ে সমস্ত রীতিনীতি সম্পন্ন করেন।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার