← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ: ত্যাগের মহাকাব্য, স্বরাজ আন্দোলন ও বাংলার রাজকীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার

পেশার রাজকীয় বিলাসিতা ও অঢেল সম্পদ তুচ্ছ করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এক মহানায়ক দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আলিপুর বোমা মামলা থেকে স্বরাজ দল এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে তাঁর অবিস্মরণীয় জীবনের সম্পূর্ণ ইতিহাস।

পরাধীন ভারতের রাজনীতি ও সামাজিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল, যাঁদের জীবনকথা কোনো পৌরাণিক মহাকাব্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। বিপুল ধন-সম্পদ, সমাজে ঈর্ষণীয় প্রতিপত্তি এবং রাজকীয় পেশাগত সাফল্যকে হেলায় ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ইতিহাস ক'জন লিখতে পেরেছেন? বাংলায় সেই অনন্য মহাকাব্যের নায়ক ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

তিনি কেবল একজন প্রখ্যাত আইকন বা আইনজীবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় রাজনীতিবিদ্, উঁচুদরের কবি, অনন্য দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক এবং সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মহান পথিকৃৎ। তরুণ সুভাষচন্দ্র বসু যাঁকে মানতেন নিজের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে, আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাঁর প্রয়াণে অশ্রুসজল চোখে লিখেছিলেন— "এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ / মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।" চলুন, আজ জেনে নেওয়া যাক বাংলার সেই অমর সূর্যসন্তান দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বর্ণময় ও ত্যাগদীপ্ত জীবনের আদ্যোপান্ত।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিকড়ের সন্ধান

১৮৭০ সালের ৫ই নভেম্বর কলকাতার পটলডাঙার (বর্তমান সূর্য সেন স্ট্রিট) এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁদের পৈতৃক ভিটে ছিল তৎকালীন ঢাকার বিক্রমপুরের টেলিপাড়া গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলা)। বিক্রমপুরের সেই উর্বর মাটি যুগে যুগে বহু মনীষীর জন্ম দিয়েছে, চিত্তরঞ্জন ছিলেন তাঁদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কুঁড়ি।

তাঁর পিতা ভুবনমোহন দাশ ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের একজন সফল অ্যাটর্নি এবং উদারচেতা ব্রাহ্মসমাজভুক্ত ব্যক্তিত্ব। ভুবনমোহন কেবল আইনি পেশাতেই যুক্ত ছিলেন না, তিনি সাপ্তাহিক 'ব্রাহ্ম পাবলিক মতামত' পত্রিকার সম্পাদনা করতেন এবং নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করতেন। মা নিস্তারিণী দেবী ছিলেন পরম করুণাময়ী ও ধর্মপ্রাণ নারী। পারিবারিক এই উদার ও সাহিত্যমুখী পরিবেশই ছোটবেলা থেকে চিত্তরঞ্জনের মননে স্বদেশপ্রেম ও ন্যায়বিচারের বীজ বুনে দিয়েছিল।

শিক্ষা ও বিলেত যাত্রা

চিত্তরঞ্জনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতার ভবানীপুরের লন্ডন মিশনারি সোসাইটি ইনস্টিটিউশনে। এরপর ১৮৯০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় বসার উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ড গমন করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেবল পড়াশোনাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং বিলেতে ভারতীয় ছাত্রদের অধিকার আদায় এবং ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে বিভিন্ন সভায় বক্তব্য রাখতে শুরু করেন।

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে দাদাভাই নওরোজির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় চিত্তরঞ্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিলেতের মাটিতে ভারতবিরোধী এক বক্তৃতার কড়া প্রতিবাদ করে বক্তব্য দেওয়ার কারণে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অপ্রীতিকর নজরে পড়েন তিনি। ফলে আইসিএস পরীক্ষায় ভালো ফল করা সত্ত্বেও তাঁকে সরকারি চাকরিতে নেওয়া হয়নি। তবে এই ঘটনা তাঁর জন্য শাপে বর হয়েছিল। তিনি লন্ডনের 'মিডল টেম্পল' থেকে বার-অ্যাট-ল (Bar-at-Law) ডিগ্রি অর্জন করে ১৮৯৩ সালে ভারতে ফিরে আসেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন।

আইনি পেশা ও ইতিহাস সৃষ্টি: 'আলিপুর বোমা মামলা'

ভারতে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে যখন চিত্তরঞ্জন ওকালতি শুরু করেন, তখন শুরুতেই সাফল্য পাননি। বাবার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তাঁকে কঠিন দিন পার করতে হয়েছিল। কিন্তু নিজের আত্মমর্যাদা ও সততা থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। কঠোর পরিশ্রমের পর আস্তে আস্তে তিনি হাইকোর্টের শীর্ষস্থানীয় ব্যরিস্টারদের তালিকায় স্থান করে নেন। পনেরো-ষোলো বছরের মধ্যে তাঁর মাসিক আয় তৎকালীন সময়ে কয়েক হাজারে গিয়ে পৌঁছায়— যা ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।

কিন্তু অর্থ বা খ্যাতি অর্জনের চেয়েও চিত্তরঞ্জনের কাছে প্রধান হয়ে উঠেছিল স্বদেশের মর্যাদা। তাঁর আইনি জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অধ্যায় হলো ১৯০৮ সালের 'আলিপুর বোমা মামলা'।

"He will be looked upon as the poet of patriotism, as the prophet of nationalism and the lover of humanity..."
— আলিপুর বোমা মামলায় শ্রী অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বিখ্যাত ভবিষ্যৎবাণী।

অরবিন্দ ঘোষ (যিনি পরবর্তীতে শ্রী অরবিন্দ নামে খ্যাত হন) সহ একঝাঁক তরুণ বিপ্লবীকে কিংসফোর্ড হত্যা চেষ্টা ও ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। অরবিন্দ ঘোষকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। সেই মুহূর্তে চিত্তরঞ্জন দাশ নিজের কোটি টাকার প্র্যাকটিস ও ব্যক্তিগত সমস্ত কাজ সরিয়ে রেখে টানা ১২-১৩ মাস এক পয়সা ফি না নিয়ে অরবিন্দের পক্ষে আইনি লড়াই চালান।

আদালতে তাঁর সেই আবেগঘন, যুক্তিপূর্ণ ও অসাধারণ সমাপনী বক্তব্য আজও ভারতীয় বিচারালয়ের ইতিহাসে সুবর্ণ অক্ষরে লেখা রয়েছে। চিত্তরঞ্জন বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, অরবিন্দ যখন বিচারমঞ্চের সামনে থাকবেন না, তখনো তিনি হবেন স্বদেশপ্রেমের কবি, জাতীয়তাবাদের পয়গম্বর এবং মানবতার প্রেমিক। চিত্তরঞ্জনের সেই মহাকাব্যিক সওয়ালের জোরেই অরবিন্দ ঘোষ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পান। এই একটি মামলাই চিত্তরঞ্জনকে রাতারাতি ভারতের সেরা আইনজীবীদের শীর্ষে বসিয়ে দেয়।

এরপর তিনি একে একে ঢাকায় বিখ্যাত ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা, ডুমরাও মামলা এবং অনুশীলা সমিতির একাধিক স্বাধীনতা সংগ্রামীর পক্ষে নিখরচায় সওয়াল করে একের পর এক মামলায় বিজয়ী হন।

বিলাসিতা ত্যাগ ও রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গ আত্মনিয়োগ

আইনি পেশায় যখন চিত্তরঞ্জন সাফল্যের চূড়ায়, ঠিক তখনই ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে নিখিল ভারত কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে 'অসহযোগ আন্দোলন'-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়। ভারতীয় রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই মুহূর্তে চিত্তরঞ্জন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।

একদিনেই তিনি রাজকীয় বিলাসিতাপূর্ণ আইনি পেশা চিরতরে বর্জন করেন। যে হাতে প্রতিদিন রাজকীয় পোশাক আর হাজার হাজার টাকার ফি আসত, সেই হাত পরিধান করল খদ্দরের মোটা ধুতি আর কুর্তা। তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী এবং বোন উর্মिला দেবীও স্বামীর এই ত্যাগ ও সংগ্রামে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেমে পড়েন। রাজকীয় ভবানীপুরের রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি ছেড়ে সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেন তিনি।

দেশবাসীকে বিলিয়ে দেওয়া এই অসামান্য ত্যাগের কারণেই ভারতবাসী ভালোবেসে ও শ্রদ্ধায় তাঁকে 'দেশবন্ধু' (দেশের বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত করে।

অসহযোগ আন্দোলন ও কারাবরণ

১৯২১ সালে কলকাতায় রাজপরিবারের প্রিন্স অব ওয়েলসের আগমন বয়কটের ডাক দেওয়া হয় দেশবন্ধুর নেতৃত্বে। তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী এবং বোন রাস্তায় খদ্দরের কাপড় বিক্রি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। এতে সমগ্র বাংলাজুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। হাজার হাজার বাঙালি যুবক রাজপথে নেমে আসে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকেও গ্রেপ্তার করে ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

কারাগারে যাওয়ার আগে দেশবন্ধু বাঙালি যুবসমাজকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন, "আমার কাজ শেষ হয়েছে, এখন দায়িত্ব তোমাদের। বাংলা যেন তার ঐতিহ্য না ভোলে।"

স্বরাজ দল ও 'বেঙ্গল প্যাক্ট': দূরদর্শী জাতীয়তাবাদ

১৯২২ সালে চৌরীচৌরা হিংসাত্মক ঘটনার পর মহাত্মা গান্ধী হঠাৎ অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে দেশবন্ধু মারাত্মকভাবে হতাশ হন। তিনি মনে করেছিলেন, কংগ্রেসের উচিত ব্রিটিশ সরকারের আইনসভায় (Legislative Council) প্রবেশ করে সরকারের ভেতর থেকে শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া। গান্ধীজি ও তাঁর অনুগামীরা (যাঁরা 'No-changers' নামে পরিচিত ছিলেন) এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন।

এই মতভেদের কারণে ১৯২২ সালের গয়া কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতি থাকা সত্ত্বেও দেশবন্ধু পদত্যাগ করেন এবং ১৯২৩ সালের ১লা জানুয়ারি পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুকে সাথে নিয়ে গঠন করেন 'স্বরাজ্য পার্টি' বা 'স্বরাজ দল'।

বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩): অসাম্প্রদায়িক দূরদৃষ্টি

বাংলার রাজনীতিতে চিত্তরঞ্জন দাশের সবচেয়ে বড় দূরদর্শী পদক্ষেপ ছিল ১৯২৩ সালের 'বেঙ্গল প্যাক্ট' (Bengal Pact)। চিত্তরঞ্জন খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেছিলেন, বাংলাকে এবং সমগ্র ভারতকে যদি স্বাধীন করতে হয়, তবে হিন্দু ও মুসলিম এই দুই বৃহৎ সম্প্রদায়কে একসাথে আসতে হবে। সংখ্যাগুরু ও লঘুর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব মেটাতে তিনি আইনসভা, সরকারি চাকরি এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের চুক্তি করেন।

যদিও তৎকালীন কংগ্রেসের অনেক রক্ষণশীল নেতা এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু দেশবন্ধু তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অটল ছিলেন। এই চুক্তির ফলে বাংলায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে বাংলার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।

কলকাতা পৌরসংস্থার প্রথম মেয়র ও সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক

১৯২৪ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট পাস করে কলকাতা পৌরসংস্থাকে নতুন রূপ দেয়, তখন নতুন এই পৌরসংস্থার প্রথম বাঙালি মেয়র নির্বাচিত হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আর তিনি তাঁর অনুগামী, পরম স্নেহভাজন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণ তরুণ নেতা সুভাষচন্দ্র বসু-কে নির্বাচন করেন কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (CEO) হিসেবে।

মেয়র হিসেবে দেশবন্ধু কলকাতাকে নতুনভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন: ১. শহরের দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের জন্য নিখরচায় চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা। ২. করপোরেশনের কাজে স্বজনপ্রীতি বন্ধ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ (যেখানে মুসলিম যুবকদের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়)। ৩. রাজপথ ও পার্কগুলোর নামকরণ ভারতীয় মনীষীদের নামে করা। ৪. শহরের সুপেয় পানীয় জল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।

দেশবন্ধু ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মানস গুরু। সুভাষচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, দেশবন্ধুর সান্নিধ্যে এসেই তিনি বুঝেছিলেন দেশপ্রেম কাকে বলে। দেশবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, ত্যাগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা সুভাষচন্দ্রের পরবর্তী জীবনের আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

সাহিত্য সাধনা, পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক চেতনা

অনেকেই হয়তো জানেন না, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কেবল একজন দুর্ধর্ষ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক সুকোমল অনুভূতিসম্পন্ন কবি ও সাংবাদিক। তৎকালীন পঞ্জিকা ও সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতো।

বাঙালিয়ানার ঐতিহ্য, দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে নববর্ষের মতো বাঙালি উৎসবগুলোকে দেশবন্ধু সর্বদা সম্প্রীতি ও জাতীয়তাবাদী জাগরণের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। শুভ মুহূর্ত ও তিথি গণনার প্রথাগত সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি আত্মশুদ্ধি ও স্বদেশ সেবাকেই জীবনের পরম ধর্ম বলে মনে করতেন।

চরম ত্যাগ ও সর্বস্ব দান: 'দেশবন্ধু' নামের সার্থকতা

চিত্তরঞ্জনের ত্যাগের মহিমা কেবল আইনি পেশা ছাড়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি নিজের সহায়-সম্পত্তির একবিন্দুও নিজের বা পরিবারের জন্য রাখেননি।

তিনি ভবানীপুরের নিজের সুবিশাল বাসভবন, বাগানবাড়ি ও সম্পত্তি ট্রাস্টের মাধ্যমে জনকল্যাণে দান করে যান। তাঁর দান করা সেই স্থানেই গড়ে ওঠে আজকের বিখ্যাত 'চিত্তরঞ্জন সেবা সদন' (Chittaranjan Seva Sadan) হাসপাতাল, যা যুগের পর যুগ ধরে বাংলার অগুনতি নারী ও শিশুর চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে। এছাড়া মহিলাদের শিক্ষার প্রসারেও তাঁর সম্পত্তি ব্যবহার করা হয়।

নিজের জীবনের অর্জিত কোটি কোটি টাকা দেশের দরিদ্র মানুষের সেবায় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের তহবিলে দান করে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এমন ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

মহাপ্রস্থান: শোকাকুল বাংলা ও মহাত্মা গান্ধীর অশ্রুপাত

অমানুষিক পরিশ্রম, অবিরাম রাজনৈতিক দৌড়ঝাঁপ এবং কারাবাসের শারীরিক নির্যাতনে দেশবন্ধুর স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। চিকিৎসকদের পরামর্শে ১৯২৫ সালের মে মাসের দিকে তিনি একটু বিশ্রামের জন্য দার্জিলিং-এর 'স্টেপ অ্যাসাইড' (Step Aside) ভবনে যান।

সেখানে মহাত্মা গান্ধীও তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং বেশ কিছুদিন একসাথে কাটান। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম। ১৯২৫ সালের ১৬ই জুন মাত্র ৫৪ বছর বয়সে দার্জিলিং-এ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান জাতীয় নেতা।

কলকাতার ঐতিহাসিক অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া

দেশবন্ধুর মৃত্যুর সংবাদে সমগ্র ভারত স্তব্ধ হয়ে যায়। দার্জিলিং থেকে তাঁর মরদেহ যখন ট্রেনযোগে শিয়ালদহ স্টেশনে আনা হয়, তখন স্টেশন থেকে কেওড়াতলা মহাশ্মশান পর্যন্ত পুরো কলকাতা শহর যেন এক মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ শোকার্ত মানুষ প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নেমে আসেন।

মহাত্মা গান্ধী নিজে দেশবন্ধুর শবমিছিলে নেতৃত্ব দেন এবং অশ্রুসজল চোখে লেখেন, "চিত্তরঞ্জন ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি কোনো সম্প্রদায় বা দলের ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র ভারতের।"

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রিয় চিত্তরঞ্জনের স্মরণে রচনা করেন সেই অমর দুটি চরণ:

"এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।"

আধুনিক বাংলায় দেশবন্ধুর উত্তরাধিকার

আজকের আধুনিক সমাজেও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রাসঙ্গিকতা ও শিক্ষণীয় দিকগুলো এতটুকু ম্লান হয়নি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়— ১. রাজনীতি ও ত্যাগের আদর্শ: ক্ষমতা বা পদের লোভে নয়, ত্যাগ ও সেবার মানসিকতাই একজন জননেতার মূল শক্তি। ২. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: বিভাজনের রাজনীতির ভিড়ে 'বেঙ্গল প্যাক্ট'-এর মতো অসাম্প্রদায়িক চিন্তা আজও জাতীয় ঐক্যের দিশারী। ৩. তরুণদের দিকনির্দেশনা: নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মতো উদীয়মান প্রতিভাকে চিনতে পারা এবং সঠিক পথপ্রদর্শন করা একজন মহান অভিভাবকের কাজ।

তাঁর স্মরণে দক্ষিণ কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ (CR Avenue), আসানসোলের শিল্পনগরী চিত্তরঞ্জন (CLW), কলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং নয়াদিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্ক (CR Park) আজও এই মহান দেশপ্রেমিকের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কেবল ইতিহাসের একটি চরিত্র নন; তিনি বাঙালির আবেগ, আত্মত্যাগ ও অদম্য স্বভিমানের এক চিরন্তন প্রতীক।

সাধারণ প্রশ্ন

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কে ছিলেন?

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন পরাধীন ভারতের একজন প্রখ্যাত ব্যরিস্টার, স্বাধীনতা সংগ্রামী, কবি এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতা। তিনি স্বরাজ দলের প্রতিষ্ঠাতা, কলকাতা পৌরসংস্থার প্রথম বাঙালি মেয়র এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন।

চিত্তরঞ্জন দাশকে কেন 'দেশবন্ধু' বলা হয়?

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের কোটি টাকার রাজকীয় আইনি পেশা ও বিশাল বিলাসিতা ত্যাগ করে তিনি সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবন ও সমস্ত সম্পত্তি জনগণের চিকিৎসার জন্য দান করেন। দেশ ও জনগণের প্রতি তাঁর এই অনন্য ভালোবাসা ও মহীয়সী ত্যাগের কারণে ভারতবাসী তাঁকে 'দেশবন্ধু' (দেশের বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত করে।

আলিপুর বোমা মামলায় চিত্তরঞ্জন দাশের ভূমিকা কী ছিল?

১৯০৮ সালের ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলায় ব্রিটিশ সরকার অরবিন্দ ঘোষকে ফাঁসি দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। চিত্তরঞ্জন দাশ টানা এক বছর এক পয়সা ফি না নিয়ে পরম নিষ্ঠা ও অসাধারণ যুক্তি দিয়ে আদালতে অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে সওয়াল করেন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করে জেল থেকে মুক্ত করেন।

বেঙ্গল প্যাক্ট (Bengal Pact) কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে গঠিত 'বেঙ্গল প্যাক্ট' ছিল বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক দূরদর্শী রাজনৈতিক সমঝোতা। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারি চাকরি, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও রাজনীতিতে মুসলমান সম্প্রদায়ের সঠিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলা।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার