🏛️ ইতিহাস · ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার
ভাগীরথী-হুগলি নদীর তীরে গড়ে ওঠা ফরাসি চন্দননগর ও দিনেমার শ্রীরামপুরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস, সংস্কৃতি, ছাপাখানা বিপ্লব এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনবদ্য আখ্যান।
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার ভাগীরথী-হুগলি নদীর তীরবর্তী অঞ্চল রূপ নিয়েছিল এক অদ্ভুত আন্তর্জাতিক মানচিত্রে। কলকাতা থেকে ব্যান্ডেল পর্যন্ত নদীর পশ্চিম পাড় ধরে তাকালে মনে হতো, ইউরোপের মানচিত্রটাই যেন এসে বসেছে গাঙ্গেয় পলিমাটিতে। ইংরেজদের কলকাতা, পর্তুগিজদের ব্যান্ডেল, ওলন্দাজদের চুঁচুড়া, ফরাসিদের চন্দননগর এবং দিনেমারদের (ডেনমার্ক) শ্রীরামপুর — ইতিহাসবিদরা নদীর এই পঁচিশ-ত্রিশ কিলোমিটারের প্রসারিত অঞ্চলকে অভিহিত করেছেন ‘ক্ষুদ্র ইউরোপ’ (Little Europe on the Hooghly) নামে।
এই ইউরোপীয় শক্তির ভিড়ে চন্দননগর ও শ্রীরামপুরের ইতিহাস অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও মহিমাময়। একটি দিকে ফরাসি সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও স্বাধীনতার অনন্য স্বাদ; অন্যদিকে দিনেমারদের বাণিজ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ছাপাখানা ও শিক্ষা বিপ্লবের জন্মভূমি শ্রীরামপুর। কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণে এই দুই শহরের অবদান চিরস্মরণীয়।
১৬৭৩ সালে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (French East India Company) প্রতিনিধি বুয়ো (Boureau) বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানের কাছ থেকে ভাগীরথীর তীরে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার অনুমতি পান। ১৬৮৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসিরা ‘ফারডাঙা’ নামে এক গ্রামীণ বসতি অধিকার করে, যা পরবর্তীতে চন্দননগর বা ফরাসি উচ্চারণে চান্দেরনাগোর (Chandernagore) নামে পরিচিতি লাভ করে।
চন্দননগরের প্রকৃত উন্নতি ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি ঘটে ১৭৩১ সালে, যখন ফরাসি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জোসেফ ফ্রাঁসোয়া দুপ্লে (Joseph François Dupleix)। দুপ্লে-র শাসনামলে চন্দননগর কেবল একটি বাণিজ্য কুঠি থেকে রূপান্তরিত হয় পূর্বভারতের অন্যতম প্রধান ফরাসি প্রশাসনিক কেন্দ্রে। তাঁর সময়েই চন্দননগরে প্রায় দুই হাজার সুসজ্জিত আবাসন গড়ে ওঠে, গঙ্গার তীরে বিস্তৃত হয় সুন্দর বন্দর, এবং ইউরোপীয় ও এশীয় দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের পরিমাণ হু-হু করে বেড়ে যায়। তৎকালীন কলকাতা যখন ইংরেজদের হাতে হাঁটি হাঁটি পা পা করছে, চন্দননগর তখন ইউরোপীয় আভিজাত্য ও সৌন্দর্যে কলকাতাকেও টেক্কা দিচ্ছিল।
"চন্দননগর কেবল বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল না; তা ছিল গঙ্গার তীরে এক টুকরো প্যারিস। স্থাপত্য, শৃঙ্গলা ও নন্দনতত্ত্বের এমন মেলবন্ধন পুরো বাংলায় দ্বিতীয়টি ছিল না।"
চন্দননগরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তার 'স্ট্র্যান্ড রোড' (The Strand)। গঙ্গার গা ঘেঁষে তৈরি এই মনোরম বাঁধানো রাস্তা এবং সারি সারি গাছ আজও সেই ফরাসি নান্দনিকতার সাক্ষ্য বহন করে। ফরাসি স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি গভর্নমেন্ট হাউস (যা বর্তমানে দুপ্লে মিউজিয়াম), ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য আর্চবিশপস হাউস’ বা ঐতিহাসিক ‘সেক্রেড হার্ট চার্চ’ — এসবই চন্দননগরকে দিয়েছিল এক আলাদা পরিচিতি।
ফরাসিরা স্থানীয় বাঙালি ধনাঢ্য পরিবারের সাথেও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। হরিহর শেঠের মতো স্থানীয় ফরাসি-ভাষী বাঙালি পণ্ডিত ও সমাজসেবীরা চন্দননগরের সংস্কৃতিতে এক অপূর্ব ফরাসি-বাংলা সংমিশ্রণ ঘটান।
চন্দননগরের কিছুটা দক্ষিণে অবস্থিত শ্রীরামপুর ছিল ডেনমার্কের দিনেমারদের ঘাঁটি। ১৭৫৫ সালে দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নবাব আলীবর্দী খানের কাছ থেকে শ্রীরামপুরে একটি বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপনের সনদ লাভ করে। রাজা পঞ্চম ফ্রেডেরিকের নামানুসারে এই শহরের নতুন নামকরণ করা হয় ‘ফ্রেডেরিকসনগর’ (Frederiksnagore)।
১৭৭৭ থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত দিনেমার গভর্নর ওলে বিয়োর্ন-এর (Ole Bie) সময়কালকে শ্রীরামপুরের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ওলে বিয়োর্ন শহরের সৌন্দর্যবৃদ্ধি, প্রশাসনিক শৃঙ্গলা এবং সেন্ট ওলাফ চার্চ (St. Olav's Church) নির্মাণের মাধ্যমে শ্রীরামপুরকে একটি আদর্শ ঔপনিবেশিক শহরে পরিণত করেন। তবে বাণিজ্য অপেক্ষা শ্রীরামপুরের মূল ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত বিপ্লবে।
শ্রীরামপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় রচিত হয় ১৮০০ সালে, যখন এখানে আগমন ঘটে তিন ইংরেজ মিশনারির — উইলিয়াম কেরি (William Carey), জশুয়া মার্সম্যান (Joshua Marshman) এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড (William Ward)। ইতিহাসে এঁরা যৌথভাবে ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ (Serampore Trio) নামে পরিচিত।
তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের এলাকায় ধর্মপ্রচার ও ছাপাখানা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু দিনেমার গভর্নর ওলে বিয়োর্ন উদার চিত্তে কেরি ও তাঁর সহযোগীদের শ্রীরামপুরে আশ্রয় ও পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। এর ফলে শ্রীরামপুর হয়ে ওঠে বাংলার আধুনিক মুদ্রণশিল্প ও গদ্য সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র।
শ্রীরামপুরের এই ছাপাখানা থেকেই ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় (যেমন হিন্দি, অসমীয়া, ওড়িয়া, মারাঠি) বাইবেল ও অন্যান্য গ্রন্থ অনূদিত ও মুদ্রিত হতে শুরু করে, যা গোটা উপমহাদেশে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়।
চন্দননগরের ইতিহাস কেবল ফরাসি আভিজাত্যের নয়, এটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অত্যন্ত রোমাঞ্চকর অধ্যায়। যেহেতু চন্দননগর ছিল ফরাসি অঞ্চল, তাই ব্রিটিশ পুলিশের বা ব্রিটিশ আইনের সরাসরি কোনো একচ্ছত্র অধিকার সেখানে ছিল না। এই আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে চন্দননগর হয়ে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী বাঙালি বিপ্লবীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল।
১৯১০ সালে আলিপুর বোমা মামলার পর মহর্ষি অরবিন্দ ঘোষ ব্রিটিশদের নজর এড়িয়ে গোপনে চন্দননগরে এসে আশ্রয় নেন। স্থানীয় ফরাসি নাগরিক ও انقلابی মতিলাল রায়ের বাড়িতেই তিনি বেশ কিছু দিন আত্মগোপন করে থাকেন। মতিলাল রায় পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত 'প্রবর্তক সংঘ', যা চন্দননগরের বিপ্লবী ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
চন্দননগরের সন্তান কানাইলাল দত্ত আলিপুর বোমার মামলায় কারারুদ্ধ অবস্থায় জেলে বসে বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে হত্যা করে ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে প্রাণ দেন। আবার লর্ড হার্ডিঞ্জকে বোমা মারার মাস্টারমাইন্ড রাসবিহারী বসু চন্দননগর থেকেই তাঁর বৈপ্লবিক ছক কষতেন এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখের সামনে দিয়ে ছদ্মবেশে জাপানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
ফরাসি সরকারের নিরপেক্ষ নীতি এবং স্থানীয় অধিবাসীদের গভীর দেশপ্রেমের কারণে ব্রিটিশ পুলিশ প্রায়ই চন্দননগরের সীমান্তে এসে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হতো।
দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যে মন্দা এবং ইউরোপীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে একসময় আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। ১৮৪৫ সালে ডেনমার্কের রাজা শ্রীরামপুর এবং তামিলনাড়ুর তারাঙ্গমবাড়ি (ট্র্যাঙ্কুয়েবার) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে মাত্র ১২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দেন। এর মাধ্যমে শ্রীরামপুরে প্রায় ৯০ বছরের দিনেমার শাসনের অবসান ঘটে এবং শহরটি সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও চন্দননগর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়নি! কারণ চন্দননগর ছিল ফরাসি উপনিবেশ। ভারতের স্বাধীনতার পর চন্দননগরের মানুষ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের দাবিতে প্রবল গণআন্দোলন শুরু করেন।
১৯৪৯ সালের ১৮ জুন চন্দননগরে এক ঐতিহাসিক গণভোট (Plebiscite) অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে, চন্দননগরের ৯৭ শতাংশেরও বেশি মানুষ ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দেন। অবশেষে ১৯৫০ সালের ২ মে ফরাসি সরকার চন্দননগরের বাস্তব শাসনভার ভারত সরকারের হাতে তুলে দেয় এবং ১৯৫৪ সালের ২ অক্টোবর চন্দননগর আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের একটি শহর হিসেবে মর্যাদা পায়।
আজও চন্দননগর ও শ্রীরামপুরের গলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ালে ঔপনিবেশিক অতীতের সুবাস পাওয়া যায়। শ্রীরামপুরের দিনেমার টাউন হল, সেন্ট ওলাফ চার্চ, দক্ষিণ রাজবাড়ি এবং ক্যানাল এভিনিউ দিনেমার ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। রাজ্য সরকার ও ডেনমার্কের ন্যাশনাল মিউজিয়াম যৌথভাবে সম্প্রতি শ্রীরামপুরের অনেক ঐতিহাসিক দিনেমার ভবন পুনরুদ্ধার করেছে।
অন্যদিকে চন্দননগরে আজও ফরাসি ভাষার চর্চা টিকে রয়েছে কিছু প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। গঙ্গার পাড়ে আলো ঝলমলে সান্ধ্যকালীন আড্ডা, ফরাসি ধাঁচের রেস্তোরাঁ ও বিশাল অট্টালিকাগুলো চন্দননগরকে দিয়েছে এক রোমান্টিক আবহ। আর প্রতি বছর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার আলোকসজ্জা ও বিশালাকার মণ্ডপপ্যান্ডেল আজও পুরো বিশ্বকে চমকে দেয়। স্থানীয় উৎসবের এই ঐতিহ্যময় দিনগুলিতে পঞ্জিকার শুভ তিথি মেনে যে বিপুল লোকসমাগম হয়, তার মূলে রয়েছে এই শহরের সমৃদ্ধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক শেকড়।
চন্দননগর ও শ্রীরামপুর কেবল দুটি ভৌগোলিক শহর নয়; এরা ইতিহাসের দুটি জীবন্ত দলিল। গঙ্গা নদী বহু যুগ ধরে কত রাজ্য, কত সম্রাজ্যের উত্থান-পতন দেখেছে। কিন্তু এই দুই শহরে ইউরোপীয় শিল্প ও সংস্কৃতির সাথে বাঙালির যে শিক্ষা, প্রগতি ও বিপ্লবের মেলবন্ধন ঘটেছিল, তা ভারত তথা সমগ্র এশিয়ার ইতিহাসে বিরল। আজও যখন আমরা শ্রীরামপুরের পুরনো কলেজের সিঁড়ি দিয়ে হাঁটি কিংবা চন্দননগরের স্ট্র্যান্ড রোডে সূর্যাস্ত দেখি, তখন ভাগীরথীর হাওয়া যেন ফিসফিস করে বলে যায় সেই দুই পরাশক্তি ও বাঙালির যৌথ পথচলার রূপকথা।
১৭৫৫ সালে ডেনমার্কের দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাব আলীবর্দী খানের কাছ থেকে এখানে বাণিজ্যিক কেন্দ্র খোলার অনুমতি পায়। তৎকালীন ডেনমার্কের রাজা পঞ্চম ফ্রেডেরিকের (King Frederick V) সম্মানার্থে শহরটির নাম রাখা হয়েছিল 'ফ্রেডেরিকসনগর'।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও চন্দননগর ছিল ফরাসি নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৯ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত একটি গণভোটে চন্দননগরের ৯৭% মানুষ ভারতের সাথে যোগদানের পক্ষে মত দেন। ১৯৫০ সালে ফরাসিরা চন্দননগরের প্রশাসনিক ক্ষমতা ভারতের হাতে দেয় এবং ১৯৫৪ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়।
উইলিয়াম কেরি, জশুয়া মার্সম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড — এই তিন ইংরেজ মিশনারি 'শ্রীরামপুর ত্রয়ী' নামে পরিচিত। তাঁদের মূল অবদান ছিল প্রথম বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা, প্রথম বাংলা সংবাদপত্র (সমাচার দর্পণ) প্রকাশ এবং ১৮১৮ সালে ঐতিহ্যবাহী শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা করা।