← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন: অন্ধকার থেকে আলোর অভিসার, নারী শিক্ষা ও সামাজিক বিপ্লবের ইতিহাস

🌟 ব্যক্তিত্ব  ·  ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার

উনিশ শতকের অবরুদ্ধ প্রথার অন্ধকার ভেদ করে বাঙালি নারী সমাজকে শিক্ষার আলো দেখিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া। জেনে নিন তাঁর জীবন, সংগ্রাম, সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের এক মহাকাব্যিক ইতিহাস।

ভূমিকা: অবরুদ্ধ সমাজ ও এক প্রদীপ্ত নক্ষত্রের আবির্ভাব

উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের সূচনা পর্ব ছিল অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে এক চরম সামাজিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। একদিকে হিন্দু সমাজে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে নবজাগরণের হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিল; অন্যদিকে মুসলিম সমাজে সংস্কারের গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর। বিশেষ করে সে যুগের সমাজব্যবস্থায় নারী জাতির অবস্থা ছিল করুণ ও শোচনীয়। চার দেয়ালের বন্দিদশা, অশিক্ষা, 'অবরোধ প্রথা' বা কঠোর পর্দা প্রথার নামে কুসংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে নারীদের জীবন হয়ে উঠেছিল থমকে যাওয়া এক জলাশয়ের মতো।

ঠিক এই ঘোর অন্ধকারের বুকে আলোর মশাল হাতে আবির্ভূত হয়েছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। কেবল একজন লেখিকা বা শিক্ষাবিদ হিসেবে নয়, তিনি ছিলেন বাঙালি নারী মুক্তির প্রথম সংগঠিত অগ্রদূত। নিজের জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি বাঙালি মুসলিম নারী সমাজকে দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার পথ, শিক্ষার স্বপ্ন এবং আত্মপরিচয়ের অধিকার। আজ বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বেগম রোকেয়া এক অবিস্মরণীয় নাম, যার অবদান ছাড়া আধুনিক বঙ্গীয় সমাজের পুনর্গঠনের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

শৈশব ও শিক্ষার কণ্টকাকীর্ণ পথ: পায়রাবন্দের দিনগুলি

১৮৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রোকেয়া খাতুন। তাঁর পিতা জহীরুদ্দিন মুহাম্মদ আবু আলী হায়দার ছাবের ছিলেন এক অভিজাত ও রক্ষণশীল জমিদার। মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানীও ছিলেন চিরাচরিত পারিবারিক ঐতিহ্যের অনুসারী।

অভিজাত জমিদার পরিবারের কন্যা হওয়ায় রোকেয়ার শৈশব কেটেছিল চরম পর্দা প্রথার কঠোর শাসনের মধ্যে। তখন মেয়েদের বাংলা বা ইংরেজি শেখা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধারণা করা হতো, এসব ভাষা শিখলে মেয়েরা 'অধর্মের' দিকে চালিত হবে কিংবা পারিবারিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। কেবল কোরআন পাঠ এবং কিছুটা উর্দু শেখার অনুমতি ছিল, যাতে গৃহস্থালির কাজ পরিচালনা করা যায়।

কিন্তু রোকেয়ার ভেতরে ছিল শিক্ষার তীব্র তৃষ্ণা। সেই যুগে তাঁর বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের এবং জ্যেষ্ঠ ভগিনী করিমুন্নেসা খানম ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। করিমুন্নেসা নিজে বাংলা অনুরাগী ছিলেন এবং তিনি রোকেয়াকে উৎসাহিত করতেন। আর ভাই ইব্রাহিম সাবের রাতের আঁধারে, মোমবাতির আলোয় রোকেয়াকে গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখাতেন। যখন পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন নিঝুম রাতে মোমের আলোয় লুকিয়ে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করতেন বালিকা রোকেয়া। এই গোপন বিদ্যাচর্চাই পরবর্তীকালে বঙ্গীয় নারী সমাজের মুক্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

বিবাহ, ভাগলপুর ও এক দূরদর্শী পথপ্রদর্শক

১৮৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রোকেয়ার বিবাহ হয় বিহারের ভাগলপুরের বাসিন্দা বিপত্নীক খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেনের সাথে। সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, উচ্চশিক্ষিত, প্রগতিশীল এবং একজন উদারমনা মানুষ। তিনি রোকেয়ার মধ্যকার সুপ্ত মেধা ও দূরদৃষ্টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

স্বামীর সাহচর্য রোকেয়ার জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। সাখাওয়াত হোসেন রোকেয়াকে কেবল পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেননি, বরং লেখালিখি এবং সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করতে ব্যাকুলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। রোকেয়া তাঁর স্বামীর সহায়তায় ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং বিশ্ব সাহিত্য ও তৎকালীন সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন।

কষ্টের বিষয় হলো, রোকেয়ার এই দাম্পত্য সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেন পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্ত্রী রোকেয়াকে নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করার জন্য ১০,০০০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন, যা তৎকালীন যুগে ছিল এক বিশাল অর্থ। স্বামীর এই ইচ্ছাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে রোকেয়া নেমে পড়েন এক নতুন সংগ্রামে।

সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল: রক্তঘাম ঝরানো লড়াই

স্বামীর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এবং নারী শিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে ১৯০৯ সালের ১লা অক্টোবর বিহারের ভাগলপুরে রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল'। তবে পারিবারিক কলহ ও স্থানীয় রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতার কারণে তিনি ভাগলপুরে স্কুলটি বেশিদিন চালাতে পারেননি।

১৯১০ সালে তিনি কোলকাতায় চলে আসেন এবং ১৯১১ সালের ১৬ই মার্চ কোলকাতার ১৩ নম্বর ওয়ালীউল্লাহ লেনের একটি ভাড়া বাড়িতে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে নতুন করে 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' পুনরায় চালু করেন।

কোলকাতায় এই স্কুল চালানো সহজ ছিল না। রক্ষণশীল সমাজপতিরা তাঁর এই উদ্যোগকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে বয়কটের ডাক দেয়। কিন্তু রোকেয়া পিছু হঠেননি। তিনি পর্দাঘেরা ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের হাত-জোড় করে বুঝাতেন, যাতে তারা নিজেদের মেয়েদের স্কুলে পাঠান। তিনি আশ্বস্ত করতেন যে, স্কুলে সম্পূর্ণ পর্দা মেনে ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেই মেয়েদের আধুনিক শিক্ষা প্রদান করা হবে।

তাঁর এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আস্তে আস্তে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলে সেলাই, রান্না, নার্সিং, শরীরচর্চা ও হাতের কাজ শেখানো হতো, যাতে নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারে। আজ কোলকাতার ঐতিহ্যবাহী সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুল রোকেয়ার সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের নীরব সাক্ষী।

আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম: নারী শক্তির প্রথম সংগঠন

কেবল শিক্ষার আলো ছড়িয়েই ক্ষান্ত হননি বেগম রোকেয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংগঠিত না করতে পারলে প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। এই উদ্দেশ্যে ১৯১৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম' (মুসলিম মহিলা সমিতি)।

এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল:

এই সমিতির মাধ্যমে রোকেয়া প্রমাণ করেছিলেন যে, চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি থাকা নারীরাও যদি একত্রিত হয়, তবে তারা সামাজিক পরিবর্তনের এক বিশাল শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

সাহিত্য সাধনা: ধারালো লেখনী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

বেগম রোকেয়া কেবল একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও তীক্ষ্ণ লেখনীর অধিকারী। তাঁর সাহিত্য ছিল সমাজিক ব্যাধি ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এক শানিত অস্ত্র।

১. সুলতানার স্বপ্ন (Sultana's Dream)

১৯০৫ সালে ইংরেজি ভাষায় লিখিত 'Sultana's Dream' বেগম রোকেয়ার এক কালজয়ী সৃষ্টি। পরবর্তীকালে তিনি নিজেই এটি বাংলা অনুবাদ করেন 'সুলতানার স্বপ্ন' নামে। এটি বিশ্ব নারীবাদী কল্পসাহিত্যের (Utopian Feminist Fiction) অন্যতম প্রাচীন ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। গল্পে 'লাডিল্যান্ড' (Ladyland) নামের এক কাল্পনিক জগতের চিত্র আঁকা হয়েছে, যেখানে সমাজ পরিচালনা করে নারীরা এবং পুরুষরা সেখানে চার দেয়ালে বন্দি থাকে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেখানে যুদ্ধহীন, পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এই গল্পের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সমাজব্যবস্থাকে এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন।

২. অবরোধ-বাসিনী

১৯৩১ সালে প্রকাশিত 'অবরোধ-বাসিনী' রোকেয়ার একটি অত্যন্ত সাহসী গ্রন্থ। পর্দা প্রথার নামে তৎকালীন সময়ে নারীদের ওপর যে চরম অবমাননা ও অন্ধ কুসংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হতো, তার ৪৭টি বাস্তব ঘটনা এই গ্রন্থে অত্যন্ত রসাত্মক কিন্তু মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। বাস আগুনে পুড়ে গেলেও পর্দার খাতিরে গাড়ি থেকে না নামা কিংবা ট্রেনে কাটা পড়ার উপক্রম হলেও কুলির স্পর্শ এড়াতে ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে থাকার মতো মর্মান্তিক ও অদ্ভুত ঘটনার বর্ণনা এতে রয়েছে।

৩. মতিচূর (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)

১৯০৪ এবং ১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ সংকলন 'মতিচূর'-এ তিনি নারী-পুরুষের সমঅধিকার, শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং ধর্মের নামে নারী নির্যাতনের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন:

"আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পতিত থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোনো পুরুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না করিয়াও যে নারী শিক্ষা লাভ করিতে পারে, তাহা আমরা দেখাইয়া দিতে চাই।"

৪. পদ্মরাগ

১৯২৪ সালে রচিত 'পদ্মরাগ' উপন্যাসে রোকেয়া 'তারিণী ভবন' নামের একটি কাল্পনিক সেবা প্রতিষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে সব ধর্মের, সব বর্ণের নির্যাতিত ও পরিত্যক্ত নারীরা একত্রে বাস করে এবং নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলে। এটি ছিল তাঁর সামাজিক বিপ্লবের এক সাহিত্যিক রূপরেখা।

চিন্তাধারা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ছিল তাঁর যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারের কঠোর বিরোধী ছিলেন, তবে তিনি কখনোই ধর্মের নৈতিক ভিত্তির বিরুদ্ধে ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম নারীদের যে মর্যাদা দিয়েছে, পুরুষশাসিত সমাজ তা বিকৃত করে নারীদের পরাধীন করে রেখেছে।

তিনি বলতেন, কন্যা সন্তানকে কেবল বিয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলাই জীবনের মূল লক্ষ্য হতে পারে না। তাকে একজন স্বাবলম্বী, বুদ্ধিমান ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি নারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন:

"ভগিনীগণ! চোখ মেলিয়া দেখুন, উঠুন, অগ্রসর হউন। নিজেদের অধিকার বুঝে নিন।"

বাংলার নবজাগরণে যেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করেছিলেন এবং রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ করেছিলেন, সেখানে বেগম রোকেয়ার সংগ্রাম ছিল আরও গভীর ও বিস্তৃত। তিনি নারীর ভেতরের মানসিক পরাধীনতাকে ভেঙে ফেলার ডাক দিয়েছিলেন।

সামাজিক সম্প্রীতি ও বাঙালি পরিচয়

বেগম রোকেয়া কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা আঞ্চলিক গণ্ডির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বয়বাদী চিন্তার বাহক। তাঁর স্কুলে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল।

তিনি বিশ্বাস করতেন, বাঙালি জাতির সার্বিক উন্নতির জন্য হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নারীর প্রগতি সমানভাবে জরুরি। বাংলা ভাষাকে তিনি নিজের প্রাণের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং উর্দুর প্রভার সত্ত্বেও তিনি মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্য চর্চাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয়ের চেতনা তাঁর মধ্যে অত্যন্ত প্রবল ছিল।

প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার: ৯ই ডিসেম্বর ও রোকেয়া দিবস

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষার কাজেই আত্মনিয়োগ করে গেছেন। ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর কোলকাতায় এই মহান মহীয়সী নারী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। কাকতালীয়ভাবে ৯ই ডিসেম্বরই ছিল তাঁর জন্মদিন। অর্থাৎ, জন্ম ও মৃত্যু একই তারিখে হওয়ায় এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে 'রোকেয়া দিবস' পালন করা হয়। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য প্রতি বছর সম্মানজনক 'বেগম রোকেয়া পদক' প্রদান করা হয়। রংপুর জেলার পায়রাবন্দে তৈরি হয়েছে 'বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র' এবং তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়'।

বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা: আজ কেন রোকেয়া গুরুত্বপূর্ণ?

একুশ শতকে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নারী ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা ও নারী শিক্ষার কথা বলি, তখন বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আজকের আধুনিক সমাজে নারীরা বিজ্ঞানে, রাজনীতিতে, মহাকাশ গবেষণায় কিংবা অর্থনীতিতে যে সাফল্য অর্জন করছে, তার বীজ বোনা হয়েছিল রোকেয়ার মতো অগ্রদূতদের ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে।

আজকের দিনে যখন পঞ্জিকার পাতায় নতুন বছর বা শুভ মুহূর্ত আসে, উৎসবের আলোয় আমরা মেতে উঠি, তখন আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—সমাজের অর্ধেক অংশকে অন্ধকারে রেখে কোনো উৎসব বা জাতির অগ্রগতি পূর্ণতা পেতে পারে না। বেগম রোকেয়া আমাদের শিখিয়েছেন কেবল নিজের অধিকার দাবি করা নয়, বরং শিক্ষার আলো দিয়ে অন্ধকার সমাজকে আলোকিত করা।

উপসংহার

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কেবল অতীতের একজন ঐতিহাসিক চরিত্র নন; তিনি এক চিরন্তন প্রেরণার নাম। শত বাধা, সামাজিক লাঞ্ছনা, অর্থনৈতিক সংকট ও একাকীত্বকে জয় করে তিনি যে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি বাঙালি নারীর হৃদয়ে প্রজ্বলিত।

অবরুদ্ধ প্রথার শৃঙ্খল ভেঙে তিনি বাঙালি নারীকে শিখিয়েছেন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত শিক্ষা ও আত্মমর্যাদাই হলো নারীর সর্বশ্রেষ্ঠ অলঙ্কার। বাংলার মাটি ও মানুষের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার নাম এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা প্রগতির মহাকাব্য হিসেবে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

সাধারণ প্রশ্ন

বেগম রোকেয়া কেন বিখ্যাত?

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত লেখিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে মুসলিম সমাজের অবরুদ্ধ ও শিক্ষাবঞ্চিত নারীদের মুক্তির জন্য তিনি 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।

'সুলতানার স্বপ্ন' গ্রন্থটির মূল বিষয়বস্তু কী?

'সুলতানার স্বপ্ন' (Sultana's Dream) হলো বেগম রোকেয়া রচিত একটি বিখ্যাত কাল্পনিক ও ব্যঙ্গাত্মক নারীবাদী বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী। এতে 'লাডিল্যান্ড' নামে এমন এক সমাজের কল্পনা করা হয়েছে যেখানে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রযুক্তির পরিচালনায় থাকে নারীরা, আর পুরুষেরা চার দেয়ালের ভেতরে অবস্থান করে। এটি নারীদের মেধা ও প্রশাসনিক দক্ষতার এক কালজয়ী সাহিত্যিক বহিপ্রকাশ।

রোকেয়া দিবস কবে এবং কেন পালন করা হয়?

প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর 'রোকেয়া দিবস' পালিত হয়। ১৮৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৩২ সালের একই তারিখে (৯ই ডিসেম্বর) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবসকে স্মরণ করে এবং নারী জাগরণে তাঁর অবদানকে সম্মান জানাতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র বিশ্বে এই দিনটি উদযাপিত হয়।

বেগম রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলো কী কী?

বেগম রোকেয়ার বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে 'অবরোধ-বাসিনী' (পর্দা প্রথার কুফল নিয়ে লেখা), 'মতিচূর' (দুই খণ্ডে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন), 'সুলতানার স্বপ্ন' (কল্পসাহিত্য) এবং 'পদ্মরাগ' (উপন্যাস)।

← বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস  |  সঠিক বাংলা ক্যালেন্ডার