🌟 ব্যক্তিত্ব · ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন আধুনিক ভারত ও বিশ্ববিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত। বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার থেকে উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা প্রমাণ—তাঁর জীবন, সংগ্রাম, সাহিত্যিক অবদান ও 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
উনিশ শতকের শেষার্ধ ও বিশ শতকের সূচনা পর্ব—বাংলা নবজাগরণের (Bengal Renaissance) এক স্বর্ণযুগ। সাহিত্য, দর্শন, সমাজ সংস্কার ও রাজনৈতিক চেতনার দাবানলে যখন তদানিন্তন অবিভক্ত বাংলা উত্তাল, ঠিক সেই সময়ে বিশ্ববিজ্ঞান দরবারে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এক বাঙালি সন্তান। তিনি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। পশ্চিমা বিশ্ব যখন ধারণা করত যে ভারতীয়দের কাজ কেবল আধ্যাত্মিকতা ও দর্শনের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ, সেখানে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিদ্যার সবচেয়ে জটিল গবেষণাগারে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি।
বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে দূরবর্তী বার্তা পাঠানো থেকে শুরু করে উদ্ভিদের প্রাণ ও সংবেদনশীলতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ—জগদীশচন্দ্র বসুর আবিষ্কার মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। তবে তাঁর এই যাত্রা সহজ ছিল না। পরাধীন ভারতের বর্ণ বৈষম্য, ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির আর্থিক অবহেলা এবং গবেষণার অপ্রতুল সরঞ্জামের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাঁকে নিজের স্থান প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। আজ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশ—সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন বিজ্ঞানী নন, আত্মমর্যাদা ও স্বদেশি চেতনার এক অমর প্রতীক।
১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর (বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৪ অগ্রহায়ণ ১২৬৫ বঙ্গাব্দ) অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর পৈতৃক ভিটা ছিল মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর অঞ্চলের রাঢ়িখাল গ্রামে। পিতা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ইংরেজ শাসনামলে বহু উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা যেখানে নিজেদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাতেন, সেখানে ভগবানচন্দ্র বসু তাঁর পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন গ্রামের একটি সাধারণ বাংলা পাঠশালায়।
এই সিদ্ধান্তটি জগদীশচন্দ্রের জীবনে এক গভীর ও বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলেছিল। গ্রামীণ পাঠশালায় তাঁর সহপাঠী ছিলেন কৃষক, জেলে ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সন্তানেরা। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে শেখেন, গাছপালা, নদী ও কীটপতঙ্গের রহস্যময় জগৎকে ভালোবাসতে শেখেন। পরবর্তীতে জগদীশচন্দ্র স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, শৈশবের এই শিক্ষা তাঁকে সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল করেছিল এবং প্রকৃতির নীরব ভাষাকে শোনার ক্ষমতা দান করেছিল।
পাঠশালার শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতায় আসেন এবং সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তীতে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে তিনি পদার্থবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। এই সময়েই তিনি ফাদার ইউজিন লাফোঁ (Father Eugene Lafont)-এর সংস্পর্শে আসেন। ফাদার লাফোঁর প্রাঞ্জল প্রায়োগিক বিজ্ঞান শিক্ষা তরুণ জগদীশচন্দ্রের মনে বিজ্ঞানের প্রতি অগাধ অনুরাগের জন্ম দেয়।
১৮৮০ সালে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেতে পাড়ি জমান। তবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্রমাগত কালাজ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি চিকিৎসাবিদ্যা ছেড়ে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (Natural Sciences) নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজ থেকে ট্রাইপস পাস করে এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করে ১৮৮৫ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন।
বিলেত থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভারতে ফেরার পর জগদীশচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে তিনি মুখোমুখি হন চরম বর্ণবৈষম্যের। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার নীতি নির্ধারণ করেছিল যে, একই যোগ্যতাসম্পন্ন একজন ভারতীয় শিক্ষক একজন ইউরোপীয় শিক্ষকের তিন ভাগের দুই ভাগ বেতন পাবেন। শুধু তাই নয়, জগদীশচন্দ্রকে প্রথমে অস্থায়ী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই চরম অপমান ও বৈষম্য মেনে নেননি তরুণ বিজ্ঞানী। তিনি তাঁর ভারতীয় জাতীয়তাবোধ ও আত্মমর্যাদায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কাজ তিনি সমপরিমাণেই করবেন, কিন্তু প্রতিবাদস্বরূপ কোনো বেতন গ্রহণ করবেন না। একটানা তিনটি বছর তিনি কোনো বেতন না নিয়েই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা করে যান। নিজের ব্যক্তিগত গহনা বিক্রি করে ও চরম আর্থিক কষ্টে দিন কাটিয়েও তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েননি।
অবশেষে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নত স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তিন বছর পর তাঁর নিয়োগ স্থায়ী হয় এবং তাঁকে বকেয়া সম্পূর্ণ বেতন এককালীন পরিশোধ করা হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে জগদীশচন্দ্র কেবল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক আপসহীন চরিত্র।
অধ্যাপনায় সফলতার পাশাপাশি প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি ক্ষুদ্র ও অন্ধকার ঘরে নিজস্ব অর্থায়নে ছোট এক ল্যাবরেটরি তৈরি করেন জগদীশচন্দ্র। সেখানে শুরু হয় অণুতরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ (Microwave) এবং মিলিমিটার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা।
১৮৯৫ সালে কলকাতার টাউন হলে তৎকালীন বাংলার গভর্নরের উপস্থিতিতে জগদীশচন্দ্র বসু এক ঐতিহাসিক মহড়া প্রদর্শন করেন। তিনি কোনো তারের সাহায্য ছাড়াই অদৃশ্য তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে দূরত্ব অতিক্রম করে একটি ঘরে রাখা ঘণ্টা বাজিয়ে দেন এবং অন্য ঘরের বারুদ বিস্ফোরিত করেন। এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সফল ওয়্যারলেস বা বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ।
ইতালীয় বিজ্ঞানী গুগলিয়েলমো মার্কোনি ১৯০১ সালে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরে বেতার সংকেত পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে, মার্কোনির বহু আগেই জগদীশচন্দ্র বসু মিলিমিটার ওয়েভ প্রসেসিং, কোহেরার (Coherer) এবং সেমিকন্ডাক্টর জংশনের নীতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজকের যুগের ওয়াই-ফাই (Wi-Fi), ব্লুটুথ এবং ফাইভ-জি (5G) প্রযুক্তির ভিত্তিপ্রস্তর।
"বিজ্ঞানের সত্য কোনো একক ব্যক্তি বা জাতির সম্পত্তি হতে পারে না। জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত।"
জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞানভাবনা ছিল গভীর নৈতিকতায় সমৃদ্ধ। তিনি তাঁর আবিষ্কারের কোনো পেটেন্ট (Patent) গ্রহণ করতে চাননি। তৎকালীন অনেক পাশ্চাত্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে তাঁর পেটেন্ট বিক্রি করার বিনিময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞান ব্যবসায়িক বিক্রয়ের বস্তু নয়। এই উদার মনভাবের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন তাঁকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত রেখেছিল। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ইতিহাসবিদরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, অণুতরঙ্গ ও বেতার বিজ্ঞানের প্রকৃত রূপকার ছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র।
১৯০০ সালের পর জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর গবেষণার মোড় ঘোরান। পদার্থবিজ্ঞান থেকে তিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন জীববিজ্ঞানের রাজ্যে। তিনি লক্ষ্য করেন, নির্জীব পদার্থ (যেমন ধাতু) এবং সজীব কলা (যেমন উদ্ভিদ বা প্রাণী)-র মধ্যে উদ্দীপনার (Stimuli) প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত সমতা রয়েছে।
উদ্ভিদ যে কেবল একটি জড় বস্তু নয়, তারও যে চেতনা আছে, আনন্দ ও বেদনার অনুভূতি আছে—তা প্রমাণ করার জন্য তিনি নিজেই তৈরি করেন অতি সূক্ষ্ম পরিমাপক যন্ত্র 'ক্রেসকোগ্রাফ' (Crescograph)। এই যন্ত্রটি উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে লক্ষ গুণ বর্ধিত করে পর্দায় প্রতিফলিত করতে পারত।
ক্রেসকোগ্রাফের মাধ্যমে তিনি দেখান:
লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে এক প্রদর্শনীর সময় জগদীশচন্দ্র একটি উদ্ভিদে বিষ প্রয়োগ করেন, কিন্তু উদ্ভিদটি ম্লান হলো না। সভার গবেষকরা যখন মন্তব্য করতে শুরু করলেন যে তাঁর তত্ত্ব ভুল, তখন জগদীশচন্দ্র শান্তভাবে বলেন, "যদি এই তরল উদ্ভিদটিকে বিষাক্ত করতে না পারে, তবে এটি মানুষের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে না।" তিনি নিজেই সেই বিষ পান করতে উদ্যত হন! ঠিক তখনই পরীক্ষার সহকারী স্বীকার করেন যে তিনি বিষের বোতলটি বদলে সাধারণ জল রেখেছিলেন। সঠিক বিষ প্রয়োগ করার পর মুহূর্তের মধ্যে উদ্ভিদটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এবং রয়্যাল সোসাইটির বিজ্ঞানীরা দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
এই গবেষণার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় দর্শনের সেই সনাতন সত্যকে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে প্রমাণ করলেন—"একমেবাদ্বিতীয়ম্" অর্থাৎ সৃষ্টির সবকিছুর মধ্যেই এক অখণ্ড চেতনার অস্তিত্ব বিরাজমান।
জগদীশচন্দ্র বসু কেবল ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় বাংলা গদ্যের রচয়িতা। তাঁর লেখা 'অব্যক্ত' গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক অমূল্য রত্ন। বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল, লালিত্যময় ও দার্শনিক দৃষ্টিতে তিনি বাংলা ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
তাঁর রচিত 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' গল্পটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন (Science Fiction) হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গল্পটিতে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে এক বোতল মাথার তেল (কুন্তলীন) দিয়ে বঙ্গোপসাগরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়কে শান্ত করা সম্ভব হয়েছিল!
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে জগদীশচন্দ্র বসুর বন্ধুত্ব ছিল বাংলা নবজাগরণের অন্যতম সুন্দর অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁকে 'ভারতের বিজ্ঞানের রাজপুত্র' বলে ডাকতেন। বিলেতে যখন জগদীশচন্দ্র বসু বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং তাঁকে উৎসাহিত করার জন্য কবিতা লিখেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে উদ্ধৃত:
"ভারতের কোনো এক নিভৃত আশ্রমে
বসে আছ একা তুমি বিজ্ঞান-সংগ্রামে;
ভারতের জয়বার্তা করিছ ঘোষণা,
জয় তব হউক জয়, হে সাধক সোনা!"
এই দুইজন মহামানবের চিঠি আদান-প্রদান পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, তাদের মধ্যে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছিল। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব কিংবা পৌষ মেলার আবহেও জগদীশচন্দ্র প্রায়শই রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ছুটে যেতেন।
বিজ্ঞান সাধনাকে ভারতে স্থায়ী রূপ দিতে এবং ভারতীয় তরুণদের বিজ্ঞানের নতুন গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর (১৪ অগ্রহায়ণ ১৩২৪ বঙ্গাব্দ, জগদীশচন্দ্রের ৫৯তম জন্মদিনে) প্রতিষ্ঠিত হয় 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' বা 'Bose Institute'। এটি কেবল একটি গবেষণাগার ছিল না, এটি ছিল ভারতের জাতীয় স্বাবলম্বিতার এক মহান মন্দির।
প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে জগদীশচন্দ্র ঘোষণা করেছিলেন যে এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতের সম্পদ এবং এটি বিশ্বের যেকোনো দেশের গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
বাঙালির ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকায় ১৪ অগ্রহায়ণ তারিখটি একটি বিশেষ দিন। প্রতি বছর ৩০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে বাঙালিরা জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী উদযাপন করে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ—দুই বাংলাতেই বিভিন্ন বিজ্ঞান মেলা, আলোচনা সভা এবং বসু বিজ্ঞান মন্দিরে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে এই দিনটি পালিত হয়।
শুভ মুহূর্ত বা কোনো নতুন কাজ শুরুর ক্ষেত্রে বাঙালি পঞ্জিকার গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি বাংলা বছরের বিভিন্ন ঋতু ও উৎসবের মাঝে আচার্য জগদীশচন্দ্রের মতো মহীয়ান ব্যক্তিত্বদের স্মরণ বাঙালির সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে। নবান্ন উৎসবের অগ্রহায়ণ মাসে যখন নতুন ধানের সুবাসে গ্রামবাংলা মেতে ওঠে, ঠিক সেই অগ্রহায়ণ মাসেই জন্মেছিলেন উদ্ভিদের জীবনের বার্তা বহনকারী এই বিজ্ঞানী।
আজকের দিনে যখন আমরা বাংলা সনের বিভিন্ন তিথি ও পার্বণ পালন করি, তখন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি শিখিয়েছিলেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হলে এবং তাকে বুঝতে হলে কেবল যন্ত্রের চোখ দিয়ে দেখলে চলবে না, হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে দেখতে হবে।
তাঁর জীবনের প্রধান মাইলফলক ও অবদানসমূহ সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:
জীবনের শেষভাগে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ঝাড়খণ্ডের গিরিডিতে শান্ত পরিবেশ কাটাতে ভালোবাসতেন। সেখানেই ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর (৭ অগ্রহায়ণ ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) এই মহান বিজ্ঞানী মহাপ্রস্থান করেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞান ও ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে গেছেন।
আজকে ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার্স (IEEE) জগদীশচন্দ্র বসুকে 'ফাদার অফ মাইক্রোওয়েভ সায়েন্স' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চাঁদের একটি আগ্নেয়গিরির গহ্বরের (Crater) নাম রাখা হয়েছে 'বসু ক্রেটার' (Bose Crater)। কিন্তু এসব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেয়েও বড় কথা হলো, তিনি তৎকালীন পরাধীন ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও কোটি কোটি ভারতীয় ও বাঙালি গবেষককে অনুপ্রাণিত করে।
আজ যখন আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে চালিত করছে, তখন মনে রাখা প্রয়োজন যে এই ডিজিটাল ও বেতার বিপ্লবের মূলে রক্ত-মাংসের যে কজন পথপ্রদর্শক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছেন এক বাঙালি—আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।
জগদীশচন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের সত্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। এটি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। বাণিজ্যিকভাবে অর্থ উপার্জনের চেয়ে বিজ্ঞানের প্রসারই তাঁর কাছে মুখ্য ছিল। তাই একাধিক বিদেশি সংস্থা স্বত্ব কেনার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা ফিরিয়ে দেন।
ক্রেসকোগ্রাফ হলো জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভাবিত একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপক যন্ত্র। এটি উদ্ভিদের অতি সূক্ষ্ম বৃদ্ধিকে লক্ষ গুণ বর্ধিত করে প্রদর্শন করতে পারত। এই যন্ত্রের সাহায্যেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে আলো, তাপ, রাসায়নিক বিষ বা বিদ্যুতের স্পর্শে উদ্ভিদও প্রাণীদের মতোই সাড়া দেয় ও প্রতিক্রিয়া জানায়।
জগদীশচন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব ও আত্মিক সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিজ্ঞানের সাধক হিসেবে অত্যন্ত উচ্চ আসনে বসিয়েছিলেন। বিলেতে জগদীশচন্দ্র যখন আর্থিক ও মানসিক চাপে ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সাহচর্যে উৎসাহিত করেছিলেন। জগদীশচন্দ্রের লেখা 'অব্যক্ত' গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও প্রকাশনায় রবীন্দ্রনাথের বিশেষ উৎসাহ ছিল।
বসু বিজ্ঞান মন্দির ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর (১৪ অগ্রহায়ণ ১৩২৪ বঙ্গাব্দ) জগদীশচন্দ্র বসুর ৫৯তম জন্মদিনে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল পৌরাণিক মহর্ষি দধীচির 'বজ্র', যা সত্য ও মানব কল্যাণে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বার্তা বহন করে।